ভোটের গানের কোটি টাকার বাজার
শহরের অলিগলি থেকে গ্রামগঞ্জের হাট–মাঠ—সর্বত্র বাজছে ভোটের গান। বেশির ভাগ গানের সুরই জনপ্রিয় বাংলা গানের নকল। কোটি টাকার ভোটের গানের বাজারের খোঁজখবর করলেন মকফুল হোসেন
ফার্মগেট মোড়ে গানটা বাজছে; সুরটা চেনা, ‘দুষ্টু কোকিল’। তবে গানের কথা বদলে গেছে, ‘আছেন যাঁরা আশেপাশে/নির্বাচনেরই আবেশে।’ দুষ্টু কোকিলের সুরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে প্রার্থীর গুণকীর্তন।
গত তিন দিন ঢাকার শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও, মহাখালী, খিলক্ষেতসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যবহৃত বেশির ভাগ গানের সুরই নকল।
‘মরার কোকিলে’, ‘বুক চিন চিন করছে’, ‘টিকাটুলীর মোড়ে একটা হল রয়েছে’, ‘আম্মাজান’, ‘খাইরুন লো’, ‘রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া’, ‘বিয়াইন সাব’, ‘দেওরা’, ‘নয়া দামান’, ‘দুষ্টু কোকিল’, ‘লাগে উরাধুরা’, ‘ও বন্ধু লাল গোলাপী’র মতো জনপ্রিয় গানের সুরে ভোটের গান বেশি শোনা যাচ্ছে।
খিলক্ষেতে ভ্রাম্যমাণ প্রচার মাইকে বাজছে, ‘আইলো সংসদ নির্বাচন/শোনেন, সকল ভোটারগণ।’ সুরটা ‘বুক চিন চিন করছে’ গান থেকে নেওয়া; আলী আকরাম শুভর সুরে বাস্তব সিনেমায় মূল গানটি গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর ও ডলি সায়ন্তনী।
‘মরার কোকিলে’, ‘বুক চিন চিন করছে’, ‘টিকাটুলীর মোড়ে একটা হল রয়েছে’, ‘আম্মাজান’, ‘খাইরুন লো’, ‘রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া’, ‘বিয়াইন সাব’, ‘দেওরা’, ‘নয়া দামান’, ‘দুষ্টু কোকিল’, ‘লাগে উরাধুরা’, ‘ও বন্ধু লাল গোলাপী’র মতো জনপ্রিয় গানের সুরে ভোটের গান বেশি শোনা যাচ্ছে।
একইভাবে আইয়ুব বাচ্চু, খালিদ হাসান মিলু, কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, মমতাজ, আসিফ, মিলা, কনা, প্রীতম হাসানের মতো শিল্পীদের জনপ্রিয় গানের সুরে নানা কথা বসিয়ে নির্বাচনী গান তৈরি করিয়েছেন প্রার্থীরা।
সংগীত বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভোটারদের মন গলাতে দশকের পর দশক ধরেই গানের ব্যবহার দেখা গেছে। তবে প্রযুক্তির প্রসারের ফলে পাঁচ-সাত বছর ধরে ভোটের গান বেড়েছে।
ভোটের গানের কারখানা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মগবাজার, বিজয়নগর ও উত্তরার বেশ কয়েকটি স্টুডিওতে নির্বাচনী গান রেকর্ড করা হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তরার রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছে দুই শতাধিক গান।
স্টুডিওটির কর্ণধার রায়হান মিয়া প্রথম আলোকে জানান, ‘বুক চিন চিন করছে’, ‘নয়া দামান’, ‘লাগে উরাধুরা’সহ প্রার্থীদের পছন্দের যেকোনো গানের সুরের ওপর ভোটের গান করছেন তাঁরা।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রার্থীকে ডেমো (নমুনা) পাঠিয়ে বলি, কোন সুরে গান চাইছেন? প্রার্থীর পছন্দের সুরের ওপর গান লিখে ফেলি। সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের দিয়ে গান রেকর্ড করি।’
আমরা প্রার্থীকে ডেমো (নমুনা) পাঠিয়ে বলি, কোন সুরে গান চাইছেন? প্রার্থীর পছন্দের সুরের ওপর গান লিখে ফেলি। সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের দিয়ে গান রেকর্ড করি।রায়হান মিয়া, রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিও
প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ঢাকার বাইরেও রেকর্ডিং স্টুডিও ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদপুরের রাজ অ্যাড মিডিয়ায় দিন-রাত মিলিয়ে তিন শিফটে ভোটের গান তৈরি হচ্ছে।
গানের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করলে স্টুডিওটির কর্ণধার রাব্বী রাজ প্রথম আলোকে জানান, প্রার্থীরা তো ১টা গান করেন না, অনেক প্রার্থীর জন্য ১০–১২টার বেশি গান করা হয়। প্রচারের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী ও কর্মীরা এসব গান প্রার্থীকে ‘উপহার’ দেন। সব মিলিয়ে দেড় মাসে রেকর্ড হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার গান। বেশির ভাগ গানের কথা প্রায় একই রকম। শুধু প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও আসনের নাম আলাদা।
রাব্বী রাজ জানান, ‘মরার কোকিলে’, ‘বুক চিন চিন করছে’, ‘টিকাটুলীর মোড়ে একটা হল রয়েছে’, ‘আম্মাজান’, ‘খাইরুন লো’সহ বেশ কয়েকটি গানের সুরে বেশি গান করছেন তাঁরা।
এই গানগুলোর সুরের প্রতি কেন এত আগ্রহ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো জনপ্রিয় গান। এই গানগুলোর সুরের সঙ্গে ভোটাররা সহজেই কানেক্ট করতে পারে। ফলে ক্লায়েন্টদের চাহিদা বেশি থাকে।’
আমরা লিরিকের ওপর ভয়েস দিই। ভয়েসটা অটো এডিট হয়ে যায়। একটা গান করতে আমাদের সময় লাগে পাঁচ মিনিট।রাব্বী রাজ, রাজ অ্যাড মিডিয়া
এক গান করতে লাগে পাঁচ মিনিট
কীভাবে গান তৈরি হয়, তার ধারণাও দিলেন রাব্বী, ‘অনেকে মৌলিক গান পাঠিয়ে বলেন, এটাকে নির্বাচনী গানে রূপান্তর করে দেন। গানের সুর, তাল একই থাকবে, শুধু কথাটা নির্বাচনী করে দেন। আমরা লিরিকের ওপর ভয়েস দিই। ভয়েসটা অটো এডিট হয়ে যায়। একটা গান করতে আমাদের সময় লাগে পাঁচ মিনিট।’
গানে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য রাজ অ্যাড মিডিয়া ও রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওতে বেশ কয়েকজন অপেশাদার শিল্পী রয়েছেন।
শিল্পীদের বাইরে এআই দিয়েও গান তৈরি হচ্ছে। উত্তরার রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওর কর্ণধার রায়হান মিয়া জানান, তাঁর স্টুডিওতে রেকর্ড করা দুই শতাধিক গানের মধ্যে ৩০টির মতো গান এআইয়ে তৈরি। এই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো এআইয়ে গান বাঁধছেন তাঁরা।
এআইয়ে কীভাবে গান তৈরি হয়? রায়হান মিয়ার ভাষ্য, ‘লিরিক লিখে এআইকে দিলেই গান করে দেবে। একটা গান চারটা ভার্সনে করে, সেখান থেকে যেই ভার্সনের উচ্চারণটা ভালো, সেটা ক্লায়েন্টকে দিই।’
এই নির্বাচনে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের গান তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারটা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
কোটি টাকার বাজার
সংগীত বিশ্লেষকেরা বলছেন, নকল সুরে ভোটের গানের ওপর কোটি টাকার বাজার দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনী প্রচারকে সামনে রেখে শতাধিক স্টুডিওতে হাজার হাজার গান তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে পাঁচ–ছয় হাজারের বেশি ব্যক্তি যুক্ত।
প্রতিটি গান তৈরিতে স্টুডিওগুলো দু–তিন হাজার টাকা নেয়। শুধু রাজ অ্যাড মিডিয়া ও রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওতেই ২ হাজার ৭০০ গান রেকর্ড হয়েছে। গানপ্রতি গড়ে দুই হাজার টাকা ধরলেও অঙ্কটা অর্ধকোটির বেশি।
এই ভোটের মৌসুমে কত হাজার গান তৈরি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই নির্বাচনে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের গান তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারটা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
অনুমতি ছাড়া কারও সুর হুবহু ব্যবহার করা যাবে না। ভোটের কাজে হোক আর যে কাজেই হোক। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।জাফর রাজা চৌধুরী, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সাবেক রেজিস্ট্রার
সুর নকলে আইনে শাস্তি আছে
‘মরার কোকিলে’ গায়িকা বেবী নাজনীনসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী ও সুরকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল গানের সুর ব্যবহারের জন্য কারও কাছ থেকে অনুমতি নেয়নি এসব স্টুডিও। কয়েকটি স্টুডিও বিষয়টি স্বীকার করেছে।
বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সাবেক রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনুমতি ছাড়া কারও সুর হুবহু ব্যবহার করা যাবে না। ভোটের কাজে হোক আর যে কাজেই হোক। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।’
স্বত্বাধিকারীর (সুরকার, গীতিকার) অনুমতি ছাড়া কোনো গানের সুর নকল কিংবা কথা পরিবর্তন করে গান তৈরি করা কপিরাইট আইন, ২০২৩-এর ৬৯ ধারার লঙ্ঘন।
দেশের গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীদের কপিরাইটসহ অন্যান্য স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কাজ করা বাংলাদেশ লিরিসিস্টস, কম্পোজারস অ্যান্ড পারফরমারস সোসাইটি (বিএলসিপিএস) বলছে, বিষয়টি তাদেরও নজরে এসেছে।
অধিকাংশই গানের সুর অনুমতি ছাড়া অপব্যবহার করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া গানের সুর ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।হামিন আহমেদ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিএলসিপিএস
বিএলসিপিএসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হামিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অধিকাংশই গানের সুর অনুমতি ছাড়া অপব্যবহার করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া গানের সুর ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।’
স্টুডিওগুলোর দিকে আঙুল তুলে হামিন আহমেদ বলেন, ‘গানগুলো কোনো না কোনো স্টুডিওতে হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
কপিরাইট আইনে অনুমতি ছাড়া সুর ব্যবহারে চার বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে আইনটি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে এখনো সচেতনতা তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আইন ভাঙার বিষয়ে অবহিত করা হলে রায়হান রেকর্ডিং স্টুডিওর কর্ণধার রায়হান মিয়া বলেন, আইনের বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না।