নুসরাত ফতেহ আলী খানের শেষ দিনগুলো
কাওয়ালির সুরে মুগ্ধ করেছিলেন বিশ্বের শ্রোতাদের। তাঁর কণ্ঠে সুফি সংগীত পেয়েছিল নতুন মাত্রা। পাকিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর গান ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। পশ্চিমা সংগীতশিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করছিলেন সমানতালে। কিন্তু মাত্র ৪৮ বছর বয়সে থেমে যায় নুসরাত ফতেহ আলী খানের জীবন।
১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনের একটি হাসপাতালে মারা যান এই কিংবদন্তি শিল্পী। মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন তিনি। তবু সংগীতের কাজ থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাননি।
আজ ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন, এই দিনে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে আলো ফেলা যাক।
অসুস্থ শরীরেও সংগীত চর্চা
দীর্ঘ সময় ধরে কাওয়ালি পরিবেশন করতে পারতেন তিনি। তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা, তালের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশনার তীব্রতা শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। কিন্তু জীবনের শেষ দিকে শরীর তাঁকে আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছিল না। কিডনির সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা চলছিল। নিয়মিত ডায়ালাইসিসও করাতে হচ্ছিল। কিন্তু সংগীতের ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেননি নুসরাত ফতেহ আলী খান।
মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী সালমান আহমেদের। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমান আহমেদ জানান, সেদিন নুসরাতকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, শিল্পী ভালো নেই। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলেন।
সালমানের মনে হয়েছিল, নুসরাতের কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়া দরকার। কিন্তু সেই বিরতি আর নেওয়া হয়নি তাঁর। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন শিল্পী। চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ক্রমওয়েল হাসপাতালে মারা যান তিনি।
চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা
১৯৯৭ সালের আগস্টে নুসরাতের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। কিডনির সমস্যার চিকিৎসা করাতে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তাঁর কিডনি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
পথে লন্ডনে যাত্রাবিরতির সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। ৯ আগস্ট তাঁকে লন্ডনের ক্রমওয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তাঁর চিকিৎসা চলছিল কিডনির জটিলতা নিয়ে। লিভারের সমস্যার কথাও জানান চিকিৎসকেরা। পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও হেপাটাইটিসও ছিল।
ভোরে অবস্থার অবনতি, সকালে মৃত্যু
১৬ আগস্ট সকালে নুসরাতের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট পাকিস্তানি সংবাদপত্র ডনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই দিন ভোর চারটার দিকে তাঁর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। পরে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসকদের চেষ্টা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন সকাল ১১টা ৫৭ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়। কিডনি ও লিভারের জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর সময় নুসরাতের পাশে ছিলেন তাঁর ব্যবস্থাপক হাজি ইকবাল নকভি, সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদসহ কয়েকজন পরিচিতজন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
মৃত্যুর আগেও কাজের চিন্তা
নুসরাতের শেষ সময় নিয়ে আরেকটি স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর ভাতিজা ও সংগীতশিল্পী রাহাত ফতেহ আলী খান। ২০২৫ সালে প্রকাশিত দ্য নেশন-এর একটি প্রতিবেদনে রাহাতের স্মৃতির উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার সময় গাড়িতে নুসরাতকে বিষণ্ন ও চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তবে নতুন একটি অ্যালবাম প্রকাশের কথা ভেবে তিনি গাড়িতে সেই অ্যালবামের রেকর্ডিং চালিয়েছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও কাজের চিন্তা করেছিলেন তিনি।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, আল–জাজিরা অবলম্বনে