কীভাবে ১৪ হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন রিয়ানা
আজ ২০ ফেব্রুয়ারি। এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি শুধু গানের চার্টের শীর্ষে ওঠেননি, বরং বিনোদন, ফ্যাশন ও ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই নিজের আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তিনি রিয়ানা—পূর্ণনাম রবিন রিয়ানা ফেন্টি। ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ বার্বাডোজের সেন্ট মাইকেল থেকে যাত্রা শুরু করে আজ তিনি বৈশ্বিক সংস্কৃতির এক প্রভাবশালী মুখ, সংগীত তারকা, উদ্যোক্তা এবং বিলিয়নিয়ার নারী। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর ক্যারিয়ার, প্রেম, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার গল্প।
শৈশব: অস্থিরতার ভেতর স্বপ্ন দেখা
১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া রিহানার শৈশব সহজ ছিল না। বাবা রোনাল্ড ফেন্টির মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক টানাপোড়েন তাঁর শৈশবে গভীর প্রভাব ফেলে। ছোটবেলায় তিনি তীব্র মাথাব্যথায় ভুগতেন; চিকিৎসকেরা প্রথমে গুরুতর অসুখের আশঙ্কা করেছিলেন। পরে বোঝা যায়, মানসিক চাপই ছিল বড় কারণ। যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪, তখন বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে।
এই অস্থিরতার মধ্যেই সংগীত হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয়। স্কুলজীবনে বন্ধুদের নিয়ে একটি গানের দল গড়েন। স্থানীয় প্রতিযোগিতায় গান গেয়ে নজরে পড়েন এক মার্কিন প্রযোজকের। সেখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অডিশনের সুযোগ। ছোট দ্বীপ থেকে বড় স্বপ্ন—রিহানার জীবন যেন সেখান থেকেই নতুন মোড় নেয়।
উত্থান: ডেফ জ্যাম থেকে বিশ্বমঞ্চ
২০০৫ সালে নিউইয়র্কে অডিশনের সময় তাঁর গান পৌঁছে যায় র্যাপার ও প্রযোজক জে–জেডের হাতে। অডিশনের পরপরই রিহানাকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়। প্রথম গান ‘পন দে রিপ্লে’ তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। কিন্তু ২০০৭ সালে ‘আমব্রেলা’ প্রকাশের পর বদলে যায় সবকিছু। গানটি বৈশ্বিক সাফল্য পায়, আর রিহানা হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক পপ তারকা। এরপর ‘ডিস্টার্বিয়া’, ‘অনলি গার্ল’, ‘উই ফাউন্ড লাভ’, ‘ডায়মন্ডস’—একটির পর একটি হিট।
তাঁর কণ্ঠে ক্যারিবীয় ছোঁয়া, নাচে আত্মবিশ্বাস আর ফ্যাশনে সাহসী উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের আইকন।
২০১৬ সালে ‘অ্যান্টি’ অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন। আগের ফর্মুলা ভেঙে আরও গভীর, পরীক্ষামূলক সংগীতে ঝোঁকেন। এরপর কিছুদিন সংগীতে বিরতি নিলেও ২০২২ সালে ‘লিফট মি আপ’ দিয়ে আবারও আলোচনায় ফেরেন।
রিহানা এখন পর্যন্ত ২৫ কোটির বেশি রেকর্ড বিক্রি করেছেন। জিতেছেন একাধিক গ্র্যামি পুরস্কার। গত এক দশকে তাঁর নতুন গান প্রকাশ মানেই বৈশ্বিক ঘটনা। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘অ্যান্টি’ অ্যালবাম ছিল তুলনামূলকভাবে মিনিমাল ও পরীক্ষাধর্মী। তারপর দীর্ঘ বিরতি। তবু তাঁর প্রভাব কমেনি। চলতি বছর আসতে পারে তাঁর নতুন অ্যালবাম।
প্রেম ও ব্যক্তিগত জীবন: আলো-আঁধারের গল্প
রিহানার ব্যক্তিগত জীবনও বরাবরই আলোচনায়। ২০০৯ সালে গায়ক ক্রিস ব্রাউনের সঙ্গে সম্পর্কের সহিংস ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। সেই ঘটনার পর তিনি প্রকাশ্যে নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। ব্যক্তিগত আঘাত তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও শক্ত করেছে।
আমি সব সময় ভয় পেতাম কতটা আসল আমি আর কতটা আমার প্রভাবিত। আমি কিশোর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলাম, আমার পরিবার, বন্ধু—আমার সবকিছু ছেড়ে আসতে হয়েছিল। আর আমি একটি বড় শহরে একা এসেছি, একমাত্র বিকল্প ছিল, জয় করা। আমি জানতাম আমাকে জিততেই হবে। যে কষ্ট আমি অনুভব করেছিলাম, আমার পরিবারের জন্যও, আমার পরিবারও আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। তাই আমি নিজেকে বলেছিলাম, অবশ্যই সফল হতে হবে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর নাম জড়ায় একাধিক সম্পর্কে। তবে স্থিতি আসে যখন তিনি সম্পর্কে জড়ান র্যাপার অ্যাসাপ রকিরর সঙ্গে।
২০২০ সাল থেকে প্রেম করেছেন সংগীত দুনিয়ার দুই তারকা এসাপ রকি ও রিয়ানা। ২০২১ সালে সম্পর্কের কথা নিশ্চিত করেন ক্যারিবিয়ান গায়িকা। জানিয়েছিলেন, তিনি মা হতে চান। ২০২২ সালে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন রিয়ানা, ২০২৩ সালে আসে দ্বিতীয় সন্তান। দ্বিতীয় সন্তান জন্মদানের আগে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সুপার বৌলে পারফর্ম করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন রিয়ানা। তৃতীয় সন্তান গর্ভে নিয়ে হাজির হন মেট গালায়। মাতৃত্ব তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। তিনি বলেছেন, সন্তানদের জন্ম তাঁর জীবনের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে।
বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্প: ফেন্টি সাম্রাজ্য
সংগীত তাঁকে খ্যাতি দিয়েছে, কিন্তু ব্যবসা তাঁকে বিলিয়নিয়ার বানিয়েছে। ২০১৭ সালে তিনি চালু করেন কসমেটিকস ব্র্যান্ড ফেন্টি বিউটি। শুরু থেকেই নানা ত্বকের রঙের জন্য বিস্তৃত শেড বাজারে এনে তিনি সৌন্দর্যশিল্পে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন। অল্প সময়েই ব্র্যান্ডটি বৈশ্বিক সাফল্য পায়।
বয়স বেড়ে যাওয়া খারাপ, কিন্তু এটা একধরনের আশীর্বাদও।
এরপর আসে অন্তর্বাস ব্র্যান্ড স্যাভেজ এক্স ফেন্টি। ফ্যাশন শোতেও তিনি বৈচিত্র্য ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা দেন।
আন্তর্জাতিক সাময়িকী ফোর্বস জানিয়েছে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ একসময় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্বের ধনীতম নারী সংগীতশিল্পীদের একজন তিনি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর আয়ের বড় অংশ এসেছে ব্যবসা থেকে।
মানবিক উদ্যোগ ও প্রভাব
২০১২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ক্লারা লায়নেল ফাউন্ডেশন—নিজের দাদা-দাদির নামে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ-সহায়তায় এই ফাউন্ডেশন কাজ করছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় তাঁর সহায়তা প্রশংসিত হয়।
ফ্যাশন আইকন হিসেবেও তিনি অনন্য। মাতৃত্বকালীন ফ্যাশনে বেবি বাম্প গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে তিনি নতুন বার্তা দেন—নারীর শরীর লুকানোর নয়, উদ্যাপনের।
আমি মনে করি, সংগীত আমার স্বাধীনতা। আমি এই উপলব্ধি তৈরি করেছি। আমি জানি, আমার পরবর্তী কাজের জন্য কী চাই। পরবর্তী কাজটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে। আমি দর্শকদের অপেক্ষার মূল্য দিতে চাই। আট বছর অপেক্ষা করার পর, আরও ভালো কিছুর জন্য কিছুটা অপেক্ষা করাই ভালো।
কেন রিহানা আলাদা
রিহানার সাফল্য কেবল হিট গানের সংখ্যা নয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পী মানেই শুধু মঞ্চের মানুষ নয়—তিনি উদ্যোক্তা, সমাজসচেতন কণ্ঠ, সংস্কৃতির নির্মাতা। ক্যারিবীয় এক কিশোরী থেকে বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ার—এই পথচলা সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের গল্প।
ভোগ অস্ট্রেলিয়া, ফোর্বস ও হার্পার বাজার অবলম্বনে