৫০ বছর পর কোথায় আছেন ‘আয় খুকু আয়’-এর সেই খুকু
১৯৭৬ সালে রেকর্ড হয় ‘আয় খুকু আয়’। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নতুন এক কণ্ঠ। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি, ধীরে ধীরে দুই বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে এই গান। বাংলাদেশেও পরে ‘দ্য ফাদার’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করা হয়। এ বছর সে গানেরই বয়স হলো ৫০। গানটির অন্যতম শিল্পী শ্রাবন্তী মজুমদারের জন্মদিন ছিল ৩ জানুয়ারি। ‘আয় খুকু আয়’ গানের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে হোয়াটসঅ্যাপে গায়িকার সঙ্গে আড্ডা দিলেন মাসুম অপু
আইরিশ সাগরের ছোট্ট দ্বীপ আইল অব ম্যান থেকে ফোনে ভেসে এল চেনা মিষ্টি গলা, ‘হ্যালো, শ্রাবন্তী বলছি...বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছেন? দারুণ লাগছে!’
কত চেনা কণ্ঠ! অডিও, সিডি থেকে আজকের ইউটিউব, ফেসবুক দুনিয়ার শ্রোতাদের কাছে তিনি শুধু এক নাম নন, এক নস্টালজিয়া। এখনো ইউটিউবে শুনতে পাওয়া যায় তাঁর গাওয়া পুরোনো জিঙ্গেল; বোরোলিনের ক্রিম থেকে হেয়ার অয়েল—বিরক্তিকর বিজ্ঞাপনও যার গলায় হয়ে উঠত শ্রুতিমধুর। তাঁর কণ্ঠ এক বিজ্ঞাপিত পণ্যের ট্যাগলাইনের মতোই যেন হয়ে উঠেছিল ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’!
আলাপের শুরুতেই তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, পঞ্চাশ বছরের পুরোনো বহুবার শোনা সেই গানটির গল্প। গানটির কথা লিখেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর দিয়েছেন ভি বালসারা। ‘অনেকেভাবে এটা হেমন্তদার গান—আসলে ঠিক তা নয়। গানটা করা হয়েছিল আমার পূজার অ্যালবামের জন্যই। একদিন পুলকদা আমাকে বললেন, “এই গানটা পড়ো তো, কেমন লাগে।” আমি একবার নয়, বারবার পড়লাম কথাগুলো। পড়তে পড়তেই চোখে জল এসে গেল। তখনই বললাম, “পুলকদা, শুধু করবই না—এই গানটা আমি হেমন্তদার সঙ্গেই গাইব।” পুলকদা খুব খুশি হলেন। পরে আমি, পুলকদা আর বালসারাজি মিলে হেমন্তদার বাসায় গেলাম। তিনি গানটা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই হ্যাঁ বলে দিলেন। শুধু বললেন, সুরটা শুনতে চান। অথচ তখনো সুর বাঁধা হয়নি!’
স্মৃতি হাতড়ে একনিশ্বাসে কথাগুলো বললেন শ্রাবন্তী।
এরপর গানে সুর দিলেন ভি বালসারা। অবশেষে এল সেই মুহূর্ত—মাইকের সামনে হেমন্তর পাশে দাঁড়ালেন শ্রাবন্তী। দুজন গাইলেন, ‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতেই, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না...।’ বাবাদের বুকের নরম স্নেহ আর সন্তানের নস্টালজিয়া যেন জীবন পেল ‘আয় খুকু আয়’-এ। একটি গানই বদলে দিল শ্রাবন্তীর পরিচয়।
অথচ শুরুতে গানটি খুব একটা বাজত না। শ্রাবন্তীর ভাষায়, ‘গান বেরোনোর দুই বছর পরও মানুষ গানটি শুনতে চাইতেন না! আমার খুব মন খারাপ হতো, পরে মঞ্চে একাই গাইতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে দেখলাম, সবাই শুধু “আয় খুকু আয়”-ই শুনতে চাইছেন।’
বাংলাদেশেও ‘দ্য ফাদার’-এ ব্যবহারের পর অনেক শিল্পী নতুন করে গেয়েছেন। যদিও সিনেমায় ব্যবহারের আগে তাঁর অনুমতি নেননি কেউ। পরে শুনেছিলেন আসাদুজ্জামান নূরের কাছে, গানটি সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে। শ্রাবন্তীর গলায় আবেগ জড়িয়ে এল, ‘অনেকে বলেন, গান শুনতে শুনতে কেঁদে ফেলেন। আগে বুঝতাম না, বাবা-মেয়ের এত সুন্দর সম্পর্কের গান শুনে মানুষ কাঁদবে কেন! পরে বাবাকে হারালাম, বিদেশে এলাম, তারপর গাইতে গাইতে নিজেই বহুবার কেঁদেছি। কবে যে গানটার ৫০ বছর হয়ে গেল, টেরই পাইনি!’
শুরুতে গানটি খুব একটা বাজত না। শ্রাবন্তীর ভাষায়, ‘গান বেরোনোর দুই বছর পরও মানুষ গানটি শুনতে চাইতেন না! আমার খুব মন খারাপ হতো, পরে মঞ্চে একাই গাইতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে দেখলাম, সবাই শুধু “আয় খুকু আয়”-ই শুনতে চাইছেন।’
প্রথাভাঙা কণ্ঠ
মেয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী হোক, চেয়েছিলেন শ্রাবন্তীর বাবা। বাড়িতে ছিল উস্তাদ-পণ্ডিতদের আনাগোনা, গুরু সুধীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে চলত তালিম। কিন্তু কিশোরী শ্রাবন্তীর মন টানত আধুনিক গান—হেমন্ত, সন্ধ্যা, শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমার; একই সঙ্গে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বন্ধুদের টানে ইংরেজি পপও। সে সময় ‘ভদ্রঘরের’ মেয়েদের কণ্ঠ মানেই ছিল রবীন্দ্রসংগীত বা ধ্রুপদি সুর।
সেখানে প্রসাধনী বা হেয়ার অয়েলের বিজ্ঞাপনে গাওয়া—অনেকের চোখেই ছিল ‘লঘু’ কাজ। কিন্তু শ্রাবন্তীর কণ্ঠ সেই ধারণা ভেঙে দিল।
তিনি বললেন, ‘জিঙ্গেল গাইতে অডিশন দিতে গিয়েছিলাম বাড়িতে লুকিয়ে। খালি গলায় দুটো গান গেয়েছিলাম। স্টুডিওর মালিক আমার উচ্চারণ আর গলার টেক্সচার শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। জিঙ্গেল তো গাইয়ে নিলেনই, চারটা গানও রেকর্ড করিয়ে এইচএমভিতে শোনালেন।’ ভারী গলার জন্য ছোটবেলায় ঠাট্টাতামাশা, ‘ন্যাকা’ বলা—সবই আজ তাঁর কাছে মায়াভরা স্মৃতি। যেমনটি কিংবদন্তি গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথা আজও কানে বাজে, ‘তুমি নিজের সময়ের থেকে ১০ বছর এগিয়ে আছ!’
‘আয় খুকু আয়’-এর পর গ্রামোফোন কোম্পানি ঠিক করল, আরেকটি গানে মা-মেয়ের গল্প বলবে। এবার লিখলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। মায়ের ভূমিকায় এলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মেয়ের ভূমিকায় শ্রাবন্তী। সন্ধ্যার মায়াভরা আর শ্রাবন্তীর আবেগঘন কণ্ঠ মিলিয়ে সাড়া ফেলল ‘তুমি আমার মা...আমি তোমার মেয়ে’।
অনেক রোমান্টিক গানও করেছেন শ্রাবন্তী। এর মধ্যে স্মরণীয় কাজ ‘নাম বোলো না’। ল্যান্ডফোন টেলিফোনের ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দে শুরু, তারপর ভূপিন্দর সিংয়ের গাম্ভীর্যের সঙ্গে শ্রাবন্তীর মখমলে হাস্কি স্বরের জাদু। লোকগানেও তাঁর কণ্ঠে পাওয়া যায় অদ্ভুত এক মিশ্রণ—পশ্চিমি হাওয়া আর মাটির গন্ধ।
সমালোচকদের মতে, তাঁর গলায় ‘ফিউশন’ যেন স্বভাবসিদ্ধ। ‘দোহাই হাইস্যো না গো তোমরা/ বুড়ায় মারিছে’, ‘কলকাতার বউ, ঢাকার জামাই’, ‘বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা’, ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি’—সব ধারার গানে তিনি স্বচ্ছন্দ। প্রেম আর কৈশোরের নরম অভিমানও ধরা পড়েছে তাঁর কণ্ঠে। এক গানে যেমন কিশোরীর আবেগমাখা স্বীকারোক্তি ‘আমার চার বছরের বড় দিদির আঁচলে তুমি অজস্র ফুল দিতে দেখতাম’, আরেক গানে মধুপুরের বাগানে বসে দূর থেকে দেখা প্রথম প্রেম ধরা দেয়—‘মধুপুরে...পাশের বাড়িতে তুমি থাকতে, রোদঝরা বাগানে, সারা দিন একমনে, তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে…।’
দূরদ্বীপেও বাঙালি হৃদয়
২৫ বছর আগে কলকাতা ছেড়ে আইল অব ম্যানের রাজধানী ডগলাসে স্থায়ী হন শ্রাবন্তী মজুমদার। ছোট্ট দ্বীপ, মাত্র ৮৪ হাজার মানুষের বাস। কিন্তু সাংস্কৃতিক কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। ‘এখানে নাটক, নাচ, গান, বইমেলা, ক্লাব—সবই আছে। পুরোনো ক্যাসল, ঘোড়ায় টানা ট্রাম, স্টিম রেল—সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগে। তবু মিস করি কলকাতা, মনে পড়ে তোমাদের ঢাকার কথা।’ বিদেশে এত বছর থাকলেও তাঁর বাংলা ঝরঝরে।
ফেরদৌসী রহমান খুব প্রিয় শিল্পী, ‘বহু বছর আগে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। আমার মনে হয়, উনি প্রথম বাংলাদেশি শিল্পী, যাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছি। জানি না ওনার মনে আছে কি না। ওনাকে বলবেন, এখনো ওনার গান আমি খুব শুনি। খুব দেখা করতে ইচ্ছা করে। প্লিজ, ওনাকে বলবেন আমার কথা।’
ফেসবুকে দেখলাম, আপনাকে ‘মেমসাহেব’ বলে, বলতেই হেসে জবাব দিলেন, ‘এ কথাটা আগেও আমি বিভিন্ন ইন্টারভিউতে বলেছি। আমি প্রথমত আমি বাঙালি, দ্বিতীয়তও আমি বাঙালি, শেষ পর্যন্তও আমি বাঙালি। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছি বাংলা মাধ্যমে পড়ে। কোনো দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও কথা বলতে পারব, আবার মাটির মানুষের সঙ্গে মেঝেতে বসেও খেতে পারব।’
আলোচনায় একসময় উঠে এল বাংলাদেশের নাম। স্মৃতির অ্যালবাম থেকে উঠে এলেন আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, ফকির আলমগীর, আরও কত মুখ; ‘ফকির আলমগীরের ফোকগানের অ্যালবামে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দারুণ ব্যবহার মুগ্ধ করেছিল। আলম খান, আলাউদ্দিন আলী, মনিরুজ্জামানের মতো সংগীত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কাজ করেছি। রুনা লায়লা আর আমি এক মঞ্চে অনেকবার গান করেছি।’
বললেন, ‘আলী যাকেরকে খুব মিস করি। ফকির আলমগীরের গান খুব ভালো লাগত। তাঁর অনুমতি নিয়ে বেশ কিছু গান গেয়েছি বিভিন্ন জায়গায়। তাঁর কথাও মনে পড়ে খুব।’
ফেরদৌসী রহমান খুব প্রিয় শিল্পী, ‘বহু বছর আগে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। আমার মনে হয়, উনি প্রথম বাংলাদেশি শিল্পী, যাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছি। জানি না ওনার মনে আছে কি না। ওনাকে বলবেন, এখনো ওনার গান আমি খুব শুনি। খুব দেখা করতে ইচ্ছা করে। প্লিজ, ওনাকে বলবেন আমার কথা।’
চট্টগ্রামে গান গাওয়ার স্মৃতিটা এখনো চোখে-মনে জ্বলজ্বল করে। পুরো দলবল নিয়ে গিয়েছিলেন। সোলসের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ গানটি গেয়েছেন দেশ-বিদেশে।
চট্টগ্রামে গান গাওয়ার স্মৃতিটা এখনো চোখে-মনে জ্বলজ্বল করে। পুরো দলবল নিয়ে গিয়েছিলেন। সোলসের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ গানটি গেয়েছেন দেশ-বিদেশে। তপন চৌধুরীর কথা মনে আছে খুব। আইয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গে উঠতেই তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল, ‘ওর মৃত্যু আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। “সেই তুমি” গানটা যেমন ও গেয়েছে, মন ছুঁয়ে যায়। আমিও কাভার করেছি গানটা। আমার পেজে গেলে শুনতে পাবেন।’
ঢাকার অনুষ্ঠান, মানুষের ভালোবাসা—সবই আজও টাটকা স্মৃতি। ঢাকায় অনেক অনুষ্ঠানে, বিজ্ঞাপনে গান করেছেন। কণ্ঠে আকুতি, ‘বাংলাদেশে আবার যেতে চাই খুব।’