সিডনিতে গানপোকার আসরে এহসান আহমেদের অনবদ্য পরিবেশনা

সিডনির ‘দ্য থিয়েটার’ মিলনায়তনে শনিবার সন্ধ্যায় গান শোনান এহসান আহমেদতুমন আহসান

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের ব্যাংকসটাউন স্পোর্টস ক্লাবের ‘দ্য থিয়েটার’ মিলনায়তনে শনিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়েছে একক সংগীতসন্ধ্যা ‘উড নাইট’। প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠন ‘গানপোকা’র আয়োজনে অনুষ্ঠানের মূল শিল্পী ছিলেন সিডনির জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এহসান আহমেদ। প্রায় পাঁচ শ দর্শকের উপস্থিতিতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই এহসান আহমেদ গেয়ে শোনান ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’। সংযত ও আবেগময় কণ্ঠে পরিবেশিত গানটি মিলনায়তনে তৈরি করে নীরবতা। এরপর তিনি পরিবেশন করেন ‘লাগ যা গালে’, যা দর্শকদের অন্য এক আবহে নিয়ে যায়। বাংলা ও উপমহাদেশীয় সংগীতের পরিচিত গান দিয়ে সাজানো এ পরিবেশনা শুরু থেকেই দর্শকদের সম্পৃক্ত করে।

কনসার্টজুড়ে ছিল বিভিন্ন সময়ের জনপ্রিয় গানের সমন্বয়। একে একে শোনা যায় ‘আছেন আমার মুক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘গাঙ্গে ঢেউ খেলে যায়’ ও ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’। প্রতিটি গানের আগে-পরেই শিল্পী সংক্ষেপে তুলে ধরেন গানের পটভূমি, ব্যক্তিগত স্মৃতি কিংবা সময়ের প্রেক্ষাপট। এতে দর্শকদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব কমে আসে, অনুষ্ঠান পায় আলাপচারিতার আবহ।

অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
আয়োজকদের সৌজন্যে

অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশনা ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’। দরাজ কণ্ঠে এই গান পরিবেশনের সময় মিলনায়তনে তৈরি হয় ভিন্ন মাত্রার আবেগ। গান শেষে দীর্ঘ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো হল।

এ ছাড়া তিনি গেয়ে শোনান ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’ এবং ‘একদিন ছুটি হবে’।

অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। পরিচিত গানগুলো গাওয়ার সময় অনেকেই শিল্পীর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। কেউ নিচু স্বরে গেয়েছেন, কেউ করতালিতে সঙ্গ দিয়েছেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশনের সময় মিলনায়তনে তৈরি হয় সম্মিলিত গানের আবহ।

মঞ্চের পেছনের বড় পর্দায় ভেসে উঠছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের ছবি। প্রয়াত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের ছবিসহ আরও কয়েকজন খ্যাতিমান শিল্পীর স্থিরচিত্র দর্শকদের ফিরিয়ে নেয় ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিতে। অনেকের মুখে তখন স্মৃতির ছাপ স্পষ্ট—দেশ, পরিবার ও শৈশবের কথা যেন ফিরে আসে গানের সুরে সুরে।

শুরুতেই এহসান আহমেদ গেয়ে শোনান ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’
তুমন আহসান

যন্ত্রসংগীতে ছিলেন ড্রাম ও পারকিউসনে সৈকত পল, লিড গিটারে সোহেল খান এবং বেজ গিটারে সোহেল আমিন। শব্দ নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন আত্তাবুর রহমান। তাঁদের সমন্বয়ে প্রতিটি গান ছিল ছন্দোবদ্ধ ও পরিষ্কার। সাউন্ড মিক্সিংয়ে ছিল ভারসাম্য; কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতের সামঞ্জস্য বজায় ছিল পুরো সময়ে।

আয়োজক কানিজ আহমেদের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি ছিল ছিমছাম ও গোছানো। সময়ানুবর্তিতা, মঞ্চসজ্জা ও আলোক ব্যবস্থাপনায় ছিল পেশাদারত্বের ছাপ। অতিরিক্ত আড়ম্বরের পরিবর্তে সংগীতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পুরো আয়োজনে।

অনুষ্ঠান শেষে দর্শকসারিতে থাকা সিডনিপ্রবাসী জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, ‘পুরোনো দিনের গানগুলো শুনে মনে হচ্ছিল যেন শৈশবে ফিরে গেছি। এহসানের গায়কি ও মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি অসাধারণ। এমন গোছানো অনুষ্ঠান অনেক দিন দেখিনি।’

প্রবাসের মাটিতে এমন আয়োজন শুধু বিনোদনের পরিসর তৈরি করে না, বরং সাংস্কৃতিক বন্ধনও দৃঢ় করে—এমনটাই মনে করছেন আয়োজকেরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলা গান ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত রাখাই এ ধরনের অনুষ্ঠানের বড় উদ্দেশ্য।