জেমস বললেন, ‘পরিবারের একজনকে হারিয়েছি’

জেমস ও ফারুক কবির বাদলছবি: কোলাজ

সম্পর্কটা শিল্পী আর প্রযোজকের ছিল না। সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের, ভরসার। এক পাতে খাওয়া, রাতের পর রাত আড্ডা, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা। বলছি নগরবাউল জেমস ও ‘সারগাম’ স্টুডিওর কর্ণধার ফারুক কবির বাদলের কথা। গত ২ মে মারা যান বাদল। এ মৃত্যুতে পরিবারের একজনকে হারিয়েছেন বলে জানান জেমস। সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে এক ফোনকলে সে সময়ের স্মৃতিচারণা করেছেন জেমস। কথার মাঝখানে আবেগাপ্লুত হয়ে যান তিনি। বাদলের কথা বলতে গিয়ে ধরে এসেছিল জেমসের কণ্ঠ।

জেমস
মীর হোসেন

দুজনের পথচলা, সংগ্রাম একই সময়ের। তাই তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কটা ছিল বেশ গাঢ়। ১৯৮৯ সালে সারগাম স্টুডিও থেকে প্রকাশ পেয়েছিল জেমসের প্রথম একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ আর ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘জেল থেকে বলছি’। দুটি অ্যালবাম জেমসকে এনে দিয়েছিল ব্যাপক জনপ্রিয়তা, সঙ্গে অ্যালবাম দুটির ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্যও ছিল ঈর্ষণীয়। তবে এখানে ব্যবসায়িক বিষয়টি অতি ক্ষুদ্র জেমসের কাছে। তাঁর কাছে বাদলের সঙ্গে সম্পর্কটা মুখ্য। জেমস বলেন, ‘হিট, ব্যবসা এসব নিয়ে কে ভাবত। বাদল ভাইয়ের বিষয় এলে অ্যালবামের কথা মাথায় আসে না। সে সময়ের আড্ডা, গল্প, রাগ-অভিমানই মাথায় আসে। সম্পর্কটা শুধু সংগীতের ছিল না। একসঙ্গে শুরু করেছিলাম, বাদল ভাই তো আমার পথের সাথি।’

আরও পড়ুন

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে সংগীতের বাজারে পরিবর্তন আসতে শুরু করলে বাদল ধীরে ধীরে নিজেকে প্রযোজনার মূল স্রোত থেকে সরিয়ে নেন। একসময় তিনি প্রবাসে চলে যান। টানা ২৭ বছর সেখানে থেকে তিন বছর আগে দেশে ফেরেন। তবে কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট গীতিকার বাপ্পী খানের সঙ্গে বাদলের দেখা হয় কাকতালীয়ভাবে। বন্ধুর মায়ের মৃত্যুতে উত্তরায় গিয়েছিলেন বাপ্পী। তাঁর সেই বন্ধু আনিস আবার বাদলের আপন ভাগনে। সেখানে বাপ্পীকে দেখে ডাক দেন বাদল। কিন্তু বাদলকে চিনতে পারেননি বাপ্পী। বাদল তখন বলেন, ‘আমাকে চিনতে পারোনি বাপ্পী? আমি বাদল...’ স্তব্ধ হয়ে যান বাপ্পী। বুকে জড়িয়ে বলেন, ‘বাদল ভাই!’

বাদলের সঙ্গে বাপ্পী খান
ছবি: বাপ্পী খানের সৌজন্যে

এরপর তাঁর অনুমতি নিয়ে ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন বাপ্পী খান। তবে কাউকে ফোন নম্বর না দেওয়ার প্রমিজ করেন বাদলকে। জেমস তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে, দুবাই বিমানবন্দরে পোস্টটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে বাপ্পীকে কল করেন। বলেন, ‘বাপ্পী, তুই বাদল ভাইরে কই পাইছস?’ বাপ্পীর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কল করেন জেমস।

জেমস আর বাদলের কথা হয় মিনিট দশেকের বেশি। হাসাহাসি, ঠাট্টায় যেন তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন তিন যুগ আগে। জেমসের কাছে অনেক বন্ধুর খবর নেন বাদল। সেদিন ফোনকলে কী কথা হয়েছিল তা প্রকাশ করতে চাননি জেমস। তবে এ যোগাযোগকে আশ্চর্যজনক বলেছেন তিনি। জেমস বলেন, ‘দুই যুগের বেশি সময় বাদল ভাই কোথাও নেই। যতবার শো করতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছি, তাঁর কথা মনে হয়েছে। ফান্টির সঙ্গে ভাইকে (বাদল) নিয়ে প্রায়ই কথা হতো। তাঁকে হারিয়ে ফেলার একটা আক্ষেপ ছিল। সেদিন কথা বলে অনেক ভালো লেগেছিল।’

ফারুক কবির বাদল
ছবি: বাদলের পরিবারের সৌজন্যে

ঢাকায় এসে খিলক্ষেতের একটি অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকতেন বাদল। আশপাশের বাসিন্দারা ২৮ এপ্রিল সবশেষ বাদলকে দেখতে পান। আর তাঁর মরদেহ সেই ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় ২ মে। ৩ মে বনানী কবরস্থানে তাঁর দাফন হয়। ২ তারিখ মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই খবর পান জেমস। খবরটিতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বাদলের মৃত্যু নিয়ে জেমস বলেন, ‘কিছু কাছের মানুষ থাকে না, খুব কাছের। আমরা দুজনেই দুজনের তেমন কাছের ছিলাম। উনি তো শুধু আমার ভাই, বন্ধু ছিলেন না, পরিবারের একজন ছিলেন। শুধু কাছের একজন বন্ধু হারাইনি, পুরো ইন্ডাস্ট্রি একজন বাদলকে হারিয়েছে। তাঁর হাত ধরে বাংলা সংগীত নতুন এক যাত্রায় প্রবেশ করেছিল, সে যাত্রা যেন থেমে গেল। বাদল ভাই পরপারে ভালো থাকুক।’