সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে গেল

আশা ভোসলে ও লেখক গীতিকার কবির বকুলছবি: কবির বকুলের ফেসবুক

প্রত্যেক মানুষের জীবনে দুর্লভ কিছু মুহূর্ত আসে—স্মৃতিতে, স্মরণে যা সব সময় জ্বলজ্বলে। কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন। খবরটা শুনেই হাতের কাজ থেমে গেল। চুপচাপ বসে রইলাম। স্মৃতিতে ভেসে উঠল এই মহান শিল্পীর সান্নিধ্যে আসার, সঙ্গে বসে একটা বিকেল কাটানোর দুর্লভ সেই মুহূর্তটুকু।

আশা ভোসলে
খালেদ সরকার

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো একদিন। আমাদের বরেণ্য শিল্পী রুনা লায়লা আমাকে ফোনে বললেন, সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে যেতে পারব কি না। আমি বললাম, পারব। কী, কেন ডেকেছেন, কিছুই বললেন না। সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গেলাম। তিনি বললেন, একটা গান লিখতে হবে। তিনি সুর করে রেখেছেন। সুরের ওপর লিখতে হবে। রুনা লায়লার সুরে এর আগে আমি একটি গান লিখেছিলাম। গানটি (ফেরাতে পারিনি আর, তোমাকে এ ভালোবাসায়) তিনিই গেয়েছিলেন। এবারও ভাবলাম, হয়তো তাঁর নিজের জন্য। কিন্তু সুর শোনানোর আগে তিনি যাঁর কথা বললেন, তাঁর নামটি শোনামাত্রই আমার গুজবাম হতে লাগল। যে শিল্পী আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, স্বপ্নে এবং ঘোরে, যাঁর গান শুনে শুনেই বেড়ে ওঠা—সেই কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোসলের জন্য গানটি লিখতে হবে। যাহোক, আমি সুরের ওপর তখনই গানটি লিখে ফেললাম। ‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি, ভেঙে যাওয়া মন আর ভালোবাসেনি’।

আশা ভোসলে ও রুনা লায়লার সঙ্গে লেখক কবির বকুল
ছবি: কবির বকুলের ফেসবুক

গানটির ভয়েস রেকর্ড হবে মুম্বাইয়ে। আমি রুনা আপাকে বললাম, আশাজি যেদিন ভয়েস দেবেন, সেদিন আমিও রেকর্ডিংয়ে থাকতে চাই। তারপর দিনক্ষণ ঠিক হলো, আমি ৩০ অক্টোবর রাতের ফ্লাইট ধরে কলকাতায়। তারপর ভোরের ফ্লাইট ধরে ৩১ অক্টোবর মুম্বাই। সেখান থেকে সোজা জুহু রোড ধরে এ জে ভাসান স্টুডিওতে চলে গেলাম। এই গানের সংগীতায়োজন করেছিলেন রাজা কাশেফ, তাঁর সঙ্গে। একটু পর এলেন আলমগীর ও রুনা লায়লা। আমাদের অপেক্ষার শুরু—মহান শিল্পী আশা ভোসলের জন্য। শেষ বিকেলে তিনি এলেন। আমি দ্রুত গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। রুনা লায়লা পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘আপনি যে গানটি গাইবেন, সেটি ওরই লেখা।’ সঙ্গে জুড়ে দিলেন, ‘শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই আজই বাংলাদেশ থেকে ও এসেছে।’ তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় হলো।

আশা ভোসলে
খালেদ সরকার

এরপর তিনি রুনা লায়লাকে বললেন, ‘চলো গানটা আরেকবার তুলে দাও তো দেখি। কী খতরনাক সুর করেছ। আমি তো সেই সকালে উঠেই রেওয়াজ করে নিলাম।’ তারপর তিনি সুর তুললেন। এই ফাঁকে বাংলায় পুরো গীতিকবিতাটি লিখে আমি আশাজির দিকে বাড়িয়ে দিলাম তাঁর অটোগ্রাফের জন্য। এরপর ছবি তোলার বায়না। তাঁর সঙ্গে ছবি তুললাম। তিনি আমার মাথায় তাঁর আশীর্বাদের হাত রাখলেন। (ছবিটি আমার ফেসবুক আইডির প্রোফাইল পিকচারে ২০১৯ থেকেই দেওয়া) গান তোলা হলে তিনি চলে গেলেন, ভয়েস বুথে। ৮৫ বছর বয়স। কিন্তু কণ্ঠ যখন ভেসে এল, মনেই হলো না, তাঁর বয়স হয়েছে। তাঁর বিনয়, সংগীতের প্রতি যে ত্যাগ, তাঁর সামনে বসেই উপলব্ধি করলাম। কেউ এমনি এমনিতেই মহিরুহুতে পরিণত হন না। তার জন্য অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, ধ্যান লাগে।

যত দূর জেনেছি, এটাই ছিল তাঁর গাওয়া শেষ বাংলা গান। ‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি, ভেঙে যাওয়া মন আর ভালোবাসেনি’। চলে গেছেন আশা ভোসলে। সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে গেল আজ। তবে তাঁর আলোয় আলোকিত থাকবে সংগীতাঙ্গন। আজীবন।