আঘাত কাটিয়ে সুরে ফিরল ছায়ানট
শুদ্ধসংগীতের ধারাবাহিক চর্চা ও শ্রোতাদের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতকে নতুন করে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী শুদ্ধসংগীত উৎসব। গতকাল শুক্রবার শুরু হওয়া এই উৎসবে নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতে সাজানো পরিবেশনায় শাস্ত্রীয় সুরের আবেশে কেটেছে শ্রোতাদের সময়। তিন অধিবেশনের এই আয়োজন উৎসর্গ করা হয়েছে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে।
ছায়ানটে আক্রমণের পর এই উৎসবের আয়োজন সংগঠনটির ঘুরে দাঁড়ানোরই প্রতীক। তার প্রতিফলন দেখা গেছে গতকাল শ্রোতাদের উপস্থিতিতেও। আগাম নিবন্ধন করে আসা দর্শকে মিলনায়তন ছিল পূর্ণ। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি শ্রোতাদের এই আগ্রহ ও উপস্থিতি ছায়ানটের প্রত্যাবর্তনের বার্তাকেই জোরালো করেছে।
গতকাল জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ১৮ ডিসেম্বর এ ভবনে একটা অঘটন ঘটেছিল। তারপর এটি প্রথম আয়োজন। সে রাতের হামলাকে সংস্কৃতিচর্চার বিরোধী গোষ্ঠীর পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছায়ানটের ছয়তলা ভবনের প্রতিটি কক্ষে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। হামলাকারীদের মূল আক্রোশ ছিল সংগীতশিক্ষার জন্য ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলোর ওপর। পাশাপাশি ‘নালন্দা’ শিশু বিদ্যালয়ের পাঠ্য ও সহায়ক বইও ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। এর আগেও বাংলা ও বাউলশিল্পীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের মূল উদ্দেশ্য বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা, তারা আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন করতে চায়।
সারওয়ার আলী বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতির চেয়ে বড় ক্ষতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। এ ক্ষত আমাদের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চিত করেছে। মাত্র পক্ষকালের মধ্যেই ছায়ানট স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে। ক্লাস শুরু হয়েছে, আয়োজন করা হয়েছে শুদ্ধসংগীত উৎসবের।’ তাঁর ভাষায়, ‘ছায়ানট নিরাপদ পরিবেশে গান গাইতে, সংগীতচর্চা ও সংগীতশিক্ষা দিতে চায়। সব ধারার মানুষ যেন নিরাপদে গান করে, সেটি আমরা চাই।’ নাট্যকর্মীরা নাটক করুক, বাউলেরা শীতকালে পালাগান করুক আগের মতো, সাংবাদিকেরা নিরাপদে তাঁদের বিবেক ও নীতি অনুযায়ী কাজ করুক, এমন একটি নিরাপদ দেশ ও নির্বিঘ্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাঁদের প্রত্যাশা।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে শুরু হয় পরিবেশনা। প্রথমেই ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মেলক সংগীত পরিবেশিত হয়, পরিচালনায় ছিলেন অসিত দে। এতে রাগ মালকোষের মূর্ছনায় পাঁচটি রাগের সমাহার তুলে ধরা হয়। তবলায় ছিলেন বাদল চৌধুরী এবং হারমোনিয়ামে টিংকু শীল। এরপর কণ্ঠসংগীতে দীপ্র নিশান্ত পরিবেশন করেন রাগ পূরবী। তবলায় সংগত করেন প্রশান্ত ভৌমিক, হারমোনিয়ামে অভিজিৎ কুন্ডু এবং সারেঙ্গিতে শৌণক দেবনাথ ঋক।
তৃতীয় পরিবেশনায় অনন্য ইগ্নেসিউস রোজারিও ও অপ্রতিম রায়ের দ্বৈত তবলাবাদন শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। হারমোনিয়ামে ‘নাগমা’ পরিবেশন করেন অমিত কর্মকার। এরপর সেতারে এবাদুল হক পরিবেশন করেন রাগ ইমনকল্যাণ। পঞ্চম পরিবেশনায় কণ্ঠসংগীতে শায়লা তাসমীন পরিবেশন করেন রাগ শ্যামকল্যাণ। বিটু শীল কণ্ঠসংগীতে রাগ বাচস্পতি পরিবেশন করেন। সপ্তম পরিবেশনায় বাঁশিতে যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করেন মৃত্যুঞ্জয় দাস। তিনি রাগ রাগেশ্রী পরিবেশন করেন। দিনের শেষ পরিবেশনায় কণ্ঠসংগীতে অংশ নেন অসিত কুমার দে।
ধানমন্ডির ছায়ানট ভবন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উৎসবের দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার। এদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলবে দ্বিতীয় অধিবেশন। দেড় ঘণ্টা বিরতির পর বেলা দুইটা থেকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে তৃতীয় অধিবেশন।