একই তারিখে জন্মদিন, পরে জীবনসঙ্গী; হয়ে ওঠেন বাংলা গানে অমর জুটি
প্রখ্যাত সংগীত ব্যক্তিত্ব কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের জন্ম একই দিনে, একসঙ্গে বাংলা গানে শ্রেষ্ঠত্বও লাভ করেছেন। বাংলা গানের এই কিংবদন্তি দম্পতির আজ জন্মবার্ষিকী। ২৮ জুলাই ১৯১১ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন কমল দাশগুপ্ত, ঠিক একই দিনে ১৯৩০ সালে ফরিদপুরে জন্ম নেন ফিরোজা বেগম। পরবর্তীকালে জীবনসঙ্গী হওয়ার পাশাপাশি বাংলা গানের ইতিহাসে তাঁরা হয়ে ওঠেন এক অনন্য জুটি।
জন্মদিন উপলক্ষে মা–বাবাকে স্মরণ করে ফেসবুকে আবেগঘন একটি পোস্ট দিয়েছেন তাঁদের ছেলে, মাইলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ। তিনি লিখেছেন, ‘আজ ২৮ জুলাই—আমার মা ও বাবার জন্মবার্ষিকী। একই দিনে জন্ম নেওয়া এই দুই মানুষ পরবর্তীকালে তাঁদের অসামান্য অবদানে বাংলা গানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিক প্রার্থনায় স্মরণ করছি তাঁদের। যেখানেই থাকেন, আপনাদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা।’
কমল দাশগুপ্ত ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরকার ও সংগীত পরিচালক। আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তিনি অসংখ্য নজরুলগীতিতে সুরারোপ করেছেন। সংগীতজীবনে তিনি একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন। তাঁর সুরে সৃষ্টি হয়েছে বাংলা গানের অসংখ্য কালজয়ী গান।
পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ১৯৩৫ সালে এইচএমভি (হিজ মাস্টার্স ভয়েস) গ্রামোফোন কোম্পানিতে সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন কমল। কাজ করেছিলেন কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানিতেও। এইচএমভিতে ১ মাসে ৫৩টি গান রেকর্ড করে রীতিমতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
এ ছাড়া প্রতি মাসে গড়ে ৪৫টি করে গান সুর করার কৃতিত্ব ছিল কমল দাশগুপ্তের। ১৯৪৩ সালে যূথিকা রায়কে দিয়ে মীরাবাঈয়ের ভজন গাওয়ান। সেই ভজন এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে মহাত্মা গান্ধী যূথিকাকে ‘মীরাবাঈ’ উপাধি দিয়ে ফেললেন। আর সুরকার কমল দাশগুপ্তকে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় দিল ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি।
অন্যদিকে নজরুলগীতির সমার্থক নাম হয়ে উঠেছিলেন ফিরোজা বেগম। হামিন আহমেদ সূত্রে তাঁর মা সম্পর্কে জানা গেছে, কলকাতার এইচএমভির মহড়ায় কবি কাজী নজরুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ফিরোজা বেগমের। সেখানকার অডিশনে ফিরোজা বেগম কবিকে তাঁর ‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা’ গানটি শুনিয়েছিলেন। তাঁর বয়স তখন ১১ নয়তো ১২ বছর। গানটি শুনে নজরুল খুব প্রশংসা করেছিলেন।
হামিন আহমেদ তাঁর মায়ের কাছে শোনা সেদিনের গল্পটা আজ মঙ্গলবার দুপুরে প্রথম আলোকে এভাবে বললেন, ‘মায়ের কাছে শুনেছি, কবি নজরুল ইসলাম গান শোনার পর কমল দাশ গুপ্তকে ডাকেন। বলেন, “দেখো, এই ছোট মেয়েটা কী সুন্দর গান গায়।” এরপর আবার গানটি গায় মা। তখন বাবাও নাকি বলেছিল, “হ্যাঁ, সুন্দর গায়।” এরপর একটা হাসি দিয়ে বাবা সেখান থেকে চলে যায়।’
ফিরোজা বেগম ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন অল-ইন্ডিয়া রেডিওতে গান করে সংগীতবোদ্ধাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালে এইচএমভি থেকে ফিরোজা বেগমের গানের প্রথম রেকর্ড ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’ বের হয়। চিত্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে এই অ্যালবাম যখন প্রকাশিত হয়, তখন ফিরোজা বেগমের বয়স ১২ বছর।
ফিরোজা বেগমের শৈশব কেটেছে যশোরে, কৈশোরের কিছুদিন কেটেছে ভারতের কোচবিহারে। তাঁর পরিবারের উপার্জনের উৎস ছিল গুপ্ত প্রেস। পরে সপরিবার তাঁরা চলে যান কলকাতায়। কলকাতার মানিকতলার একটি বাড়িতে তাঁরা বসবাস শুরু করেন। ৯ ভাইবোনের সবাই ছিলেন সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। সবার রেকর্ড বেরিয়েছিল এইচএমভি থেকে। বাড়িতেই সংগীতের ভিতটা তৈরি হয়েছিল ফিরোজার। সে সময় বাড়িতে বিখ্যাত সব ওস্তাদের আনাগোনা ছিল।
‘মোমের পুতুল’ ও ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ গান দুটি সংগীতজীবনে তাঁকে বড় সাফল্য এনে দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৮০টির বেশি একক সংগীতানুষ্ঠান করেছিলেন তিনি, পেয়েছেন বহু পুরস্কার। স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদক এর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার, নেতাজি সুভাষচন্দ্র পুরস্কার, সত্যজিৎ রায় পুরস্কার, নজরুল আকাদেমি পদক।
১৯৫৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগম। তাঁদের সংসারে জন্ম নেন তিন সন্তান—তাহসিন, হামিন ও শাফিন আহমেদ। হামিন ও প্রয়াত শাফিন আহমেদ বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় নাম। তাঁদের হাত ধরেই দেশের অন্যতম সফল ব্যান্ড মাইলস নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। শাফিন আহমেদ প্রয়াত হলেও হামিন আহমেদ এখনো মাইলসের মাধ্যমে বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।
একই দিনে জন্ম নেওয়া এই দুই কিংবদন্তি শুধু দাম্পত্য জীবনে নয়, বাংলা গানের ইতিহাসেও নিজেদের কাজের ছাপ রেখে গেছেন। তাঁদের সৃষ্টি, সাধনা ও অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলা সংগীতপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করবে।