গোপালচন্দ্র রায়ের ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই আমন্ত্রণে। সঙ্গে ছিলেন ছেলে রথীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসংগীতের প্রধান স্বরলিপিকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র-সহযোগী কালীমোহন ঘোষ, ইতালির খ্যাতনামা অধ্যাপক জিয়োসেপ্নে তুচ্চি। ৯ দিনের সফরের প্রথম কয়েকটি দিন ছিলেন জগন্নাথ হলের তৎকালীন প্রভোস্ট, পরবর্তী সময়ে উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদারের রমনার বাড়িতে, ঐতিহাসিক আরসি মজুমদার নামেই যিনি পরিচিত। সদলবল কবি কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত আসেন রেলগাড়িতে চড়ে। এরপর বিশেষ স্টিমার পাঠিয়ে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ আনা হয়। এরপর মোটরগাড়ির শোভাযাত্রা করে ঢাকার রমনা।

সেবার ঢাকায় আক্ষরিক অর্থেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন সংগঠন চাইছিল তাঁকে কাছে পেতে, সংবর্ধনা দিতে। কিন্তু তখন ৬৫ বছরের রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সবার মন রক্ষা করতে পারেননি। রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ জীবনের স্মৃতিদীপেতে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি তখন জগন্নাথ হল, অর্থাৎ হোস্টেলের অধ্যক্ষ (প্রভোস্ট)। হলের ছাত্ররা এসে অনুরোধ করায় কবি একটা বড় কবিতা লিখে দিলেন। সেই কবিতাটি হলো, “এই কথাটি মনে রেখো,/ তোমাদের এই হাসিখেলায়,/ আমি যে গান গেয়েছিলেম/ জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়।” যা পরে গীতবিতান-এর অন্তর্ভুক্ত হয়। ছেলেরা এটি প্রকাশ করেছিল জগন্নাথ হলের বার্ষিক সাময়িকী বাসন্তিকায়।’
রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ঢাকায় তাঁর বাসায় আতিথ্যকালে রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। রমেশচন্দ্রের বড় মেয়ের বয়স তখন ১২-১৩ বছর। হাবভাব দেখে সে বুঝতে পারে, তাদের বাড়িতে একজন বড় কবি এসেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারের ভাষায়, ‘একদিন সাহস করে কবির কক্ষে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, “আপনি নাকি কবিতা লেখেন?” কবি বললেন, “হ্যাঁ, আমার সে দুর্নাম আছে।” তখন আমার ছোট মেয়ে ছোট একটি নোটবই তাঁর সামনে ধরে বলল, “আমার নামে একটা কবিতা লিখে দিন না।” কবি তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, “ডাকনাম সুষমা, ভালো নাম শান্তি।” কবি তৎক্ষণাৎ ওই নোটবইয়ে লিখে দিলেন, “আয় রে বসন্ত, হেথা/ কুসুমের সুষমা জাগা রে/ শান্তিস্নিগ্ধ মুকুলের/ হৃদয়ের গোপন আগারে।”’

সুষমা ও শান্তি—দুটি নামই উল্লেখ করে লেখা কবিতাটি রবীন্দ্র রচনাবলীতে স্থান পায়। রমেশচন্দ্র মজুমদারের আক্ষেপ, কার উদ্দেশে, কোন প্রেক্ষাপটে কবিতাটি রচিত হয়েছে, তার উল্লেখ কোথাও রইল না।
বুড়িগঙ্গায় বজরায় অবস্থানকালে কবি সকালবেলা জলভ্রমণে বের হতেন। এ সময় তাঁর দেখভালে নিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদের একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র স্নিগ্ধ কুমার গুহ। একদিন সকালে স্নিগ্ধ কুমার বলাকা কাব্যগ্রন্থটি কবির হাতে দিয়ে তাতে একটা কবিতা লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। ঘণ্টাখানেক বুড়িগঙ্গা ভ্রমণ শেষে কবি তাঁকে বইটি ফেরত দেন। তাতে লেখা ছিল কবির স্বাক্ষর করা চার লাইনের একটি কবিতা, ‘ভারী কাজের বোঝাই তরী কালের পারাবারে/ পাড়ি দিতে গিয়ে কখন ডোবে আপন ভারে।/ তার চেয়ে মোর এই ক-খানা হালকা কথার গান/ হয়তো ভেসে বইবে স্রোতে তাই করে যাই দান।’

বুড়িগঙ্গায় এই বজরায় রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখেন বুদ্ধদেব বসু। আমার ছেলেবেলা গ্রন্থে সে কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। বুদ্ধদেব তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র এবং কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদের পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থ থেকে জানা যাচ্ছে, ঢাকার বলধার জমিদারবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নানা রকম ফুল ও শৌখিন উদ্ভিদ দেখে মুগ্ধ কবি মুখে মুখে রচনা করেন, ‘কাঁটাতে আমার অপরাধ আছে,/ দোষ নাহি মোর ফুলে।/ কাঁটা, ওগো প্রিয়, থাক্‌ মোর কাছে,/ ফুল তুমি নিয়ো তুলে।’
সেবার ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে গান শোনেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক, বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ, সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন। সেই অনুষ্ঠান ছিল সেক্রেটারিয়েট মুসলিম হলের (বর্তমান মেডিকেল কলেজ) প্রাঙ্গণে। স্মৃতিকথা নামের বইয়ে মোতাহার হোসেন লিখেছেন, ‘কবি ছেলেদের সঙ্গে কিছু গল্পগুজব করবার পর আমাদের অনুরোধে একটি গান গাইলেন—“বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে,/ শূন্য ঘাটে একা আমি/ পার ক’রে লও খেয়ার নেয়ে।।”’ মোতাহার হোসেনের ভাষায়, ‘সত্যিই সে সময় পশ্চিম আকাশে রক্তিম রবি অস্তমিত হচ্ছিল। কবি পশ্চিম দিকে মুখ করেই বসেছিলেন, বোধ হয় অস্তায়মান সূর্য দেখেই তিনি গানটা ধরেছিলেন। ঐ পরিবেশে অনুরাগরঞ্জিত স্বভাবমধুর ধ্বনির ব্যঞ্জনায় আর সুঠাম দেহের ঈষৎ আন্দোলনভঙ্গীতে যে কী মর্মস্পর্শী সঙ্গীতসূধা নিঃসৃত হয়েছিল তা বর্ণনার অতীত।’
ঢাকার অনুষ্ঠান শেষ করে ময়মনসিংহ চলে যান কবি। এরপর আরও ১৫ বছর বেঁচে রইলেও ঢাকায় আর আসা হয়নি তাঁর।

গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন