গান, স্মৃতি আর নতুন যাত্রা: দুই দশক পূর্তিতে গানচিলের উৎসব

দুই দশকের এই বিশেষ আয়োজনে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়গানচিলের সৌজন্যে

নব্বইয়ের দশকের ক্যাসেট–সিডির দিন পেরিয়ে শূন্য দশকের অ্যালবাম–সংস্কৃতি, সেখান থেকে আজকের ডিজিটাল সময়—বাংলা সংগীতের এই দীর্ঘ অভিযাত্রার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা মানুষগুলোর মিলনমেলায় এক অনন্য আবহ তৈরি হয়েছিল। সংগীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও পর্দার আড়ালের কারিগরদের উপস্থিতিতে গান, স্মৃতি ও আবেগে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সন্ধ্যা। উপলক্ষ ছিল দেশের অন্যতম সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গানচিল–এর দুই দশকের পথচলা উদ্‌যাপন।

আয়োজনের শেষ পর্বে প্রদর্শিত হয় কোনাল ও নিলয়ের গাওয়া নতুন গান ‘ও জান’–এর ভিডিও চিত্র
গানচিলের সৌজন্যে

এই ২০ বছর পূর্তির আয়োজন ছিল কেবল অতীত স্মরণ নয়; বরং সংগীতকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রকাশ। পুরোনোকে সম্মান জানিয়ে নতুন রূপে, নতুন লোগো ও নতুন পরিকল্পনায় আরও বিস্তৃত পরিসরে পথচলার ঘোষণা দেয় গানচিল। অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয় প্রতিষ্ঠানটির নতুন মূলমন্ত্র—‘উত্তরাধিকার কখনো অবসর নেয় না, সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে।’

রফিকুল আলম
গানচিলের সৌজন্যে

২০০৫ সালের শেষ দিকে নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, আসিফ ইকবাল ও রেজা রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা গানচিল সময়ের বিবর্তনে আজ এক পরিণত সংগীত প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হিসেবে এককভাবে দায়িত্ব পালন করছেন আসিফ ইকবাল। দুই দশকের এই বিশেষ আয়োজনে তাঁর উদ্যোগেই গানচিলের তিন প্রতিষ্ঠাতা—নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ ও রেজা রহমানকে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। কানাডায় অবস্থান করায় কুমার বিশ্বজিৎ সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে নিজের আবেগ ও কৃতজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন।

সম্মাননা গ্রহণের সময় তিন প্রতিষ্ঠাতার কণ্ঠে ধরা পড়ে গানচিলকে ঘিরে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি, ভালোবাসা ও আবেগ। গানচিলের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে ভবিষ্যতের জন্য শুভেচ্ছা জানান তাঁরা, যেন সংগীতের এই পথচলা আরও বহুদূর বিস্তৃত হয়।

নকীব খান
গানচিলের সৌজন্যে

সম্মাননা পর্ব শেষে শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক আয়োজন। মঞ্চে গান পরিবেশন করেন কোনাল, সালমা, কিশোর, মাহাদি, দোলা, নিলয়, নাহিদ হাসান, তরিক মৃধাসহ একাধিক শিল্পী। তাঁদের কণ্ঠে ভেসে আসে গানচিলের ব্যানারে প্রকাশিত আসিফ ইকবালের লেখা জনপ্রিয় গানগুলো।

মানসম্মত ও সুস্থ সংগীতচর্চার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা গানচিল শুরুতেই শ্রোতাদের উপহার দেয় ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মেহরাব ও রুমির জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘আড্ডা’ ও ‘বিউটির চরণদাসী’। তবে ২০০৮–০৯ সালের দিকে পাইরেসির আগ্রাসন ও এফএম রেডিও সংস্কৃতির প্রভাবে গানের বাজারে মন্দা নেমে আসে। ২০১২ সালে অ্যালবাম প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও গানচিলের যাত্রা থেমে থাকেনি। ২০১৫ সালের পর নতুন উদ্যমে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। আয়োজনের বিভিন্ন মুহূর্তে সেই সংগ্রাম ও টিকে থাকার গল্পও উঠে আসে।

গীতিকবি সাকি আহমেদ ও শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
গানচিলের সৌজন্যে

অনুষ্ঠানে গানচিলের আগামী দিনের পরিকল্পনার কথাও জানান কর্ণধার আসিফ ইকবাল। তিনি বলেন, সামনে আসছে নাটক, গানচিল অরিজিনালস, নতুন গান এবং অদেখা বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘পথের গল্প’, যার মাধ্যমে দর্শক–শ্রোতাদের ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

আয়োজনের শেষ পর্বে প্রদর্শিত হয় কোনাল ও নিলয়ের গাওয়া নতুন গান ‘ও জান’–এর ভিডিও চিত্র। গানচিল অরিজিনালসের দ্বিতীয় এই গানটির কথা লিখেছেন আসিফ ইকবাল। যুগ্মভাবে সুর করেছেন আভ্রাল সাহির ও পশ্চিমবঙ্গের লিংকন; সংগীতায়োজনেও ছিলেন আভ্রাল সাহির। ভিডিওটি নির্মাণ করেছেন তানিম রহমান অংশু। নেপালের মুস্তাংয়ের জমসম অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে গানটির দৃশ্যায়ন করা হয়েছে, যেখানে পারফর্ম করেছেন সুনেরাহ্‌ বিনতে কামাল ও ফররুখ আহমেদ রেহান।

গানচিলের কর্ণধার আসিফ ইকবাল
ছবি : গানচিলের সৌজন্যে

বড় পর্দায় গানটি প্রদর্শিত হতেই করতালি ও উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মিলনায়তন। মঞ্চে উঠে আসেন গানটির শিল্পী ও কলাকুশলীরা। তাঁদের ভাষ্যে, যত্ন ও ভালোবাসা দিয়েই গানটি তৈরি করা হয়েছে, আর নতুন লোকেশনের কারণে ভিজ্যুয়ালেও এসেছে আলাদা মাত্রা। অনেকের চোখে ‘ও জান’ হয়ে উঠেছে গানচিলের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।
পুরো আয়োজনটি উপস্থাপনা করেন মৌসুমী মৌ ও আবু হেনা রনি। তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আরও বর্ণিল। অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, রফিকুল আলম, সামিনা চৌধুরী, মানাম আহমেদ, শওকত আলী ইমন, চয়নিকা চৌধুরী, ধ্রুব গুহ, মিনার রহমান, অদিত, মেহরাব, বেলাল খান, শাহরিয়ার রাফাত, মীর মাসুম, সিঁথি সাহা, জুয়েল মোর্শেদসহ সংগীতাঙ্গনের বহু গুণী মানুষ।

দুই দশকের এই আয়োজন শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি সত্য—গানচিল কেবল একটি সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সময়, স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত সেতুবন্ধ, যা অতীতকে ধারণ করেই নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে সামনে এগিয়ে যেতে জানে।