হাতিরপুল থেকে ‘হাতিরপুল সেশনস’

চার বছরের পথচলায় ‘উপ’, ‘শহরের দুইটা গান’, ‘মনোহর’–এর মতো আলোচিত গান প্রকাশ করে শ্রোতামহলে পরিচিতি পেয়েছে সংগীতের প্ল্যাটফর্ম হাতিরপুল সেশনস। ঢাকার হাতিরপুলের এক চায়ের আড্ডায় চার বন্ধু অনয় চৌধুরী, অনিরুদ্ধ অনু, মার্ক রাতুল সিনহাশাহানাজ পারভীন জোনাকির হাত ধরে গড়ে উঠেছে প্ল্যাটফর্মটি। গত শনিবার সেন্ট্রাল রোডে হাতিরপুল সেশনসের স্টুডিওতে তাঁদের সঙ্গে আড্ডা দিলেন মকফুল হোসেন

প্রথম আলো:

২০১৯ সালের শীতে ‘হাতিরপুল সেশনস’ গড়ে উঠেছে; জন্মসূত্রেই হাতিরপুল সেশনসের সঙ্গে তো শীতের একটা যোগ আছে!

জোনাকি: শীতকালে মানুষ খুব সকালে ওঠে না, আওয়াজ কম থাকে। সব দিক দিয়েই শীতকালে কাজ করতে সুবিধা হতো। হাতিরপুলে আমাদের বাসার ছাদে গান রেকর্ড করতাম।

রাতুল: নিষেধাজ্ঞাও এসেছে, পাশের বাসা থেকে অনেক অভিযোগ এসেছিল; ঘুমাতে পারছে না।

প্রথম আলো:

প্ল্যাটফর্মের ধারণাটা কীভাবে এল?

রাতুল: গানকে কেন্দ্র করেই আমরা চারজন আড্ডা দিতাম। হাতিরপুলে, বুয়েটে, শাহবাগে—আমাদের সব আড্ডায় গান থাকত। আমাদের আশপাশের অনেকেই মিউজিশিয়ান। নিজেদেরও অনেক অপ্রকাশিত গান ছিল। গান করতে করতে জোনাকির মাথায় আসে, গানগুলো রেকর্ড করা যায়। কারণ, গানগুলো হারিয়ে যেতে পারে। তেমনই এক আড্ডায় গান রেকর্ডের পরিকল্পনা করি। হাতিরপুলে বসে গান করছি বলে নামও ঠিক করা হলো ‘হাতিরপুল সেশনস’। আমার আর অনুর দুটি গান রেকর্ড করে ফেসবুক পেজে প্রকাশ করি। শ্রোতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি; পরে আরও শিল্পীদের নিয়ে কাজ শুরু করলাম।

অনয়: শিল্পী বলতে, ওরা সবাই আমাদের বন্ধুবান্ধব।

হাতিরপুলের আড্ডা থেকেই প্ল্যাটফর্মটির ধারণা পেয়েছেন তাঁরা, ফলে প্ল্যাটফর্মের নামও দেওয়া হয়েছে, ‘হাতিরপুল সেশনস’
ছবি: খালেদ সরকার
প্রথম আলো:

আপনারা চারজনই হাতিরপুলে থেকেছেন। আপনাদের জীবনে এই হাতিরপুলের প্রভাব কতটা?

জোনাকি: আমাদের জীবনে হাতিরপুলের প্রভাব অনেক। এলাকা হিসেবে চিন্তা করলে, সেন্ট্রাল রোড থেকে আজিজ সুপার মার্কেট, ক্যাম্পাসের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) আগপর্যন্ত হাতিরপুল বলেই চালিয়ে দিয়েছি। বন্ধুরা ফোন করলে বলি, হাতিরপুলে আসছি। আমি ও অনয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আমি, অনয় ও অনু ভাই আগে থেকেই আড্ডা দিতাম, পরে রাতুল যোগ দিলেন। আমরা চারজন মূলত হাতিরপুলেরই বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দিতাম।

অনয়: আমরা মাত্র পড়াশোনা শেষ করে ক্যাম্পাস (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বের হয়েছি। ফলে ক্যাম্পাস থেকে বেশি দূরে যেতে পারব না, কারণ ক্যাম্পাসে সময় কাটাতে ভালো লাগে। ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে এসে কাছে থেকে হাতিরপুলে অবস্থান নিয়েছি, যেন চাইলেই বিকেলে ক্যাম্পাসে যেতে পারি। পরে ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে যাওয়া কমেছে, আড্ডাটাকে হাতিরপুলেই নিয়ে এসেছি।

জোনাকি: হাতিরপুলেই যেহেতু সবাই আড্ডা দিচ্ছিলাম, ফলে আসা–যাওয়ার সুবিধার জন্য সবাই হাতিরপুলেই বাসা নিই।

প্রথম আলো:

আপনাদের কাছে হাতিরপুল কোন দিক থেকে আলাদা? এর বিশেষ বৈশিষ্ট কী?

অনু: আমরা থাকি (হা হা)

অনয়: হাতিরপুলে অনেক চায়ের দোকান আছে।

জোনাকি: হাতিরপুল থেকে শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) অনেক কাছে। আড্ডা দেওয়ার অনেক জায়গা রয়েছে। হাতিরপুলের জনতা ব্যাংকের বিপরীতে একটা চায়ের দোকানে নিয়মিত আড্ডা দিতাম।

অনু: আজিজের পেছনে, মোতালেব প্লাজার পাশ দিয়ে যে গলি আছে, ওখানে বিউটি খালার চায়ের দোকানে চা খেতাম, আড্ডা দিতাম।

হাতিরপুল সেশনসে মিউজিক ডিরেক্টর ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনু, ভিডিও প্রডাকশনে অনয়, ক্রিয়েটিভ প্রডিউসার হিসেবে জোনাকি ও স্ট্র‍্যাটেজি অ্যান্ড কো - প্রডিউসারের দায়িত্বে রয়েছেন রাতুল
ছবি: খালেদ সরকার
প্রথম আলো:

জোনাকি ও অনয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অনু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আর রাতুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। আপনাদের বন্ধুত্ব কত বছরের? কীভাবে বন্ধুত্ব হলো?

জোনাকি: আমাদের বন্ধুত্ব পাঁচ–ছয় বছরের মতো।

প্রথম আলো:

মাত্র?

অনয়: মাত্র মানে কী, আমাদের আর বয়স কত (হা হা)! একসঙ্গে পড়াশোনাকালে আমার ও জোনাকির বন্ধুত্ব, সেটা অন্তত ছয়–সাত বছরের মতো হবে। ২০১৮ সাল থেকে অনু ভাই আর ২০১৯ সাল থেকে রাতুল ভাই আমাদের সঙ্গে যোগ দেন।

জোনাকি: আমরা সবাই ঘরছাড়া মানুষ। আমরা শুধু বন্ধুই নই, আমরা পরিবারের সদস্য হয়ে গেছি। বয়সে খানিকটা বেড়ে ওঠার পর আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে বলে আমাদের বোঝাপড়াটা ভালো, বন্ধুত্বও জোরালো।

প্রথম আলো:

প্রথম ও দ্বিতীয় মৌসুম মিলিয়ে হাতিরপুল সেশনসের ‘উপ’, ‘শহরের দুইটা গান’, ‘মনোহর’-এর মতো বেশ কিছু গান সাধারণ শ্রোতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রোতাদের প্রত্যাশার চাপকে কীভাবে পাশ কাটাবেন?

অনু: আমরা খুব একটা পাশ কাটাতে পারি—তেমন নয়। আমরা তো মহান কোনো মানুষ নই। জনপ্রিয় গানের পেছনে একধরনের ফরমুলেশন থাকে। তবে আমরা মনে করি, প্রতিটি গানই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি গান অনেক মানুষ শুনছে না বলে সেই গানের শৈল্পিক মূল্য কমে যায় না। সমসাময়িক ঘটনার প্রেক্ষাপটে হয়তো একটি গান ছড়িয়ে পড়েছে, তবে আমরা নিজেদের মতো করে গান করে যেতে চাই।

জোনাকি: আমাদের গান ছড়িয়ে পড়েছে, এতে আমরা খুশি। তবে এটাই আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে নেই। স্বাধীনভাবে গান করে যেতে চাই।

প্রথম আলো:

প্রথম মৌসুমে হাতিরপুল সেশনসের গানে একটা ‘র’ ব্যাপার ছিল। সীমিত আয়োজনে দুয়েকটা বাদ্যযন্ত্রে গান করেছেন শিল্পীরা। ধীরে ধীরে গানের পরিবেশনা আরও জমকালো হয়ে উঠছে। এটা আপনাদের ‘সিগনেচার স্টাইল’কে বিঘ্নিত করছে কি না!

রাতুল: নাহ। বিঘ্নিত করছে না। প্রথম মৌসুমে ছাদে একজন গান করেছেন। যখন একজন গিটার বাজাতেন, তখন মনে হতো, গানে আরও কিছু দেওয়ার আছে। শুধু সুর ও কথা নয়, মিউজিকও একটা বিষয়। আমরা চিন্তা করলাম, আমাদের আশপাশে ভালো মিউজিশিয়ান আছেন; যাঁরা খুব ভালো গিটার, ড্রামস বাজান, বাঁশি বাজান। ভোকাল কোনো সময়ই একটা গানের পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারে না। তার জন্য মিউজিশিয়ান লাগে। ওটা চিন্তা করেই পরিকল্পনা করেছি, যেকোনো গানকে আমরা ভাঙব। সে হিসেবেই পরিসর বেড়েছে। দ্বিতীয় সিজনকে আমরা জমকালো বলব না, একধরনের উন্নতি বলতে পারেন। আমরা জমকালো হতে চাই না, আমাদের মতো করেই থাকব। তবে আওয়াজটা একটু শ্রুতিমধুর এবং ভোকালটা আরও সুন্দরভাবে নেওয়ার চেষ্টা করছি।

প্রথম আলো:

স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গান করছে হাতিরপুল সেশনস; এ সময় স্বাধীনভাবে গান করা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

জোনাকি: প্রথম সিজনে ওই রকম কোনো খরচ হয়নি। দ্বিতীয় মৌসুমে ভালো পরিমাণ খরচ হয়েছে, সেটা আমরা নিজেরাই দিয়েছি। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাজটা করছি। তবে একটু আরামদায়ক উপায়ে কাজটা করতে গেলে অর্থের প্রয়োজন। তৃতীয় মৌসুমের পরিকল্পনা করেছি, আমরা পৃষ্ঠপোষক খুঁজছি। যাঁরা আমাদের বুঝবেন, স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবেন, তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে খুঁজছি।

প্রথম আলো:

হাতিরপুল সেশনসের তৃতীয় মৌসুমে কী থাকবে?

অনয়: এটা অনেকটা দ্বিতীয় মৌসুমের মতোই হবে। তবে আরও বিস্তৃত হবে। জমকালো করব না।

রাতুল: আমাদের পরিবেশনায় স্বাধীন ব্যাপারটা থাকবে, জমকালো ব্যাপারটায় যাব না। স্বাধীনভাবে গান করতে চাইলে স্পনসর পেতে কষ্ট হয়। জমকালোভাবে গান করলে স্পনসর পাওয়া সহজ। তবে আমরা আসলে সেটা করতে চাই না, তাহলে স্বাধীনভাবে গানের সুযোগটা আর থাকবে না।

প্রথম আলো:

হাতিরপুল সেশনস নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

অনয়: গানের বাইরে সিনেমা, থিয়েটার, পডকাস্ট নিয়েও কাজ করা যায় কি না, সেটা নিয়ে চিন্তা করছি।

জোনাকি: আরও ক্ষেত্র তৈরি করতে চাই। শুধু গান নয়, গানের বাইরেও মানুষ সৃজনশীল কিছু তৈরি করবে। একটা কালচারাল হাব তৈরি হবে।

রাতুল: আমি চাই, হাতিরপুল সেশনস এমন একটা জায়গায় যাক, যেন আমি বুড়ো হয়ে গেলেও অপ্রাসঙ্গিক না হয়ে যাই। (হা হা) যেভাবেই যাক, বড় জায়গায় যাক। আমি মারা গেলে যেন কনসার্ট হয়। (হা হা)

জোনাকি: আদি হাতি (হা হা) (‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ব্যান্ডের আদি ঘোড়ার আদলে)।

অনু: শুধু গান করছি, ব্যাপারটা এমন নয়। ভণিতা ছাড়া যতটুকু করা যায়, সিনেমা, গান সবই করতে চাই।

হাতিরপুল সেশনসের দ্বিতীয় মৌসুমে তপেশ চক্রবর্তী, মুয়ীয মাহফুজ, অংকন কুমার, সামিন ইয়াসার, আহমেদ হাসান সানি, চেতনা রহমান ভাষা, জয়ী চাকমা, দীপ্ত প্রিতম নাথ, রিফাত আরেফিন হক, মুনহামান্নাসহ আরও অনেকে যুক্ত ছিলেন।