চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত সিনেমা মেইড ইন চিটাগং–এ পার্থ বড়ুয়া ও নিশিতা বড়ুয়ার গাওয়া ‘ফেট ফুরেদ্দে তোঁয়াল্যাই’ প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা। গায়কির প্রশংসার পাশাপাশি পরিবেশনার ঢং নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন কেউ কেউ।

গানটি নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে সামনে আসছে গানের স্রষ্টার নাম। তিনি সাধক, শিল্পী আমানউল্লাহ গায়েন। লোকগানের গবেষকেরা বলছেন, দেশজুড়ে আমানউল্লাহ গায়েনের তেমন পরিচিতি না থাকলেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে তাঁর তুমুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। তিনি কক্সবাজার বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন। জীবদ্দশায় অন্তত ৫০০ গান রচনা করে তাতে সুরারোপ করেছেন। মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর পর কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম ছাপিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় এলেন তিনি।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকসংগীত–গবেষক নাসির উদ্দিন হায়দার বলেন, গত ৫০ বছরে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ১০টি গানের তালিকা করা হলে শেফালী ঘোষ, আবদুল গফুর হালীর গানের সঙ্গে আমানউল্লাহ গায়েনের ‘ফেট ফুরেদ্দে তোঁয়াল্যাই’ থাকবে। গানটি দশকের পর দশক ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
গানটি কবে লেখা হয়েছে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নথি না থাকলেও গবেষকেরা বলেছেন, এটি সত্তরের দশকের শেষভাগে লেখা হয়ে থাকতে পারে। শিল্পী আমানউল্লাহর বড় ছেলে হাসান উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারের বৈদ্যঘোনা খাজা মঞ্জিল এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকাকালে ১৯৭৮ সালের দিকে গানটি বাঁধেন তাঁর বাবা। তিনি মুখে মুখে গান বাঁধতেন, লিখতে জানতেন না।

কোন প্রেক্ষাপটে গানটি বেঁধেছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বাবার মুখে শোনা গল্পই তুলে ধরলেন হাসান উল্লাহ, ‘হালা চান হলেন একজন রাখাল বালক, আমাদের বাড়ির পাশে একটি জমিদারবাড়ি ছিল। সেখানে সেই রাখাল গরু পালতেন। জমিদারের মেয়ের সঙ্গে রাখালের প্রেম ছিল। রাখালের গাঁয়ের রং কালো ছিল বলে প্রেমিকা তাকে “হালা চান” বলে ডাকতেন।’
নাসির উদ্দিন হায়দার বলছেন, কক্সবাজার ও রাখাইন অঞ্চলের গানের মধ্য বেশ মিল আছে; দুই অঞ্চলের গানে পাহাড়, নদী, সাগরের কথা থাকে। এই গানেও তেমনি পাহাড়ি ঘর, টিনের চালের কথা আছে। এতে প্রেমিক কিংবা স্বামীর জন্য বিরহকাতর এক নারীর আকুতি উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মরিচ্যা গ্রামে জন্ম নেওয়া শিল্পী আমানউল্লাহ সংগীতের টানে শৈশবে পাড়ি দিয়েছিলেন মায়ানমারে, সেখানে এক শিল্পীর কাছে গান ও মেন্ডোলিন বাজানো শেখেন। একাত্তরের পর কক্সবাজারে ফিরে গান পরিবেশন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি।
হাসান বলেন, ‘বিভিন্ন আয়োজনে গানটি পরিবেশন করতেন বাবা। তত দিনে বিভিন্ন গানের আসরে গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেতে থাকে; ভক্তদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আশির দশকেই কক্সবাজারের আলাউদ্দিন রেকর্ডিং স্টুডিওতে “ফেট ফুরেদ্দে তোঁয়াল্যাই”সহ বেশ কয়েকটি গান রেকর্ড করে অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন তিনি।’
আমানউল্লাহর কণ্ঠে গানটি ভক্তদের মুখে মুখে ছড়ালেও সাধারণ শ্রোতাদের মুখে তখনো ওঠেনি। ১৯৯১ সালে কক্সবাজারের লোকগানের শিল্পী বুলবুল আক্তারের কণ্ঠে রেকর্ডিংয়ের পর শ্রোতাদের মধ্যে আলোড়ন তোলে। কক্সবাজারের রেডিও ট্রেডার্স নামে একটি অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বুলবুলের লাল শাড়ি অ্যালবামে গানটি ছিল। অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেছেন আহমেদ বশির।

রেকর্ডিংয়ের স্মৃতিচারণা করে বুলবুল আক্তার বলেন, ‘আমানউল্লাহর কাছ থেকে গানটি আনা হয়েছিল। গানটি নিয়ে তখন খুব আলোচনা হয়েছিল। তিন দশক পরও শ্রোতারা গানটিকে এখনো ভালোবাসে দেখে আমার খুব ভালো লাগে।’
তবে লাল শাড়ি অ্যালবামে আমানউল্লাহর নাম ব্যবহার করা হয়নি; অ্যালবামের মোড়কে সুর ও সংগীতের জায়গায় আহমেদ বশিরের নাম ছিল। বিষয়টি নিয়ে গবেষক নাসির উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘আশির দশকে অ্যালবামের মোড়কে শিল্পী ও সংগীত পরিচালকের নাম থাকত। সেই অ্যালবামের বেশির ভাগ গান আহমেদ বশিরের; কয়েকটা অন্যদের ছিল। ফলে মোড়কে তাঁর নাম ছিল। অন্যদের মধ্যে সেই গান আমানউল্লাহর লেখা ও সুর করা; গানটি আমরা আমানউল্লাহর কণ্ঠে অনেকবার শুনেছি।’

আমানউল্লাহ নিজে লিখতে পারতেন না, ফলে তাঁর ৫ শতাধিক গানের মধ্যে মোটে ১০০–এর মতো গান সংরক্ষণ করা গেছে; বাকিগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে, সংরক্ষণ করা যায়নি। তিনি জীবদ্দশায় কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ কক্সবাজার শিল্পী সম্মাননা, শিল্পকলা একাডেমি পদক ও অন্তরা শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা পেয়েছেন।
২০১০ সালের দিকে নাসির উদ্দিন হায়দারের কাছে গানটির কথা শুনে শিল্পী শিরিন জাওয়াদ নিজের কণ্ঠে গানটি রেকর্ড করতে চান। আমানউল্লাহ পরিবারের অনুমতি নিয়ে হৃদয় খানের সংগীতায়োজনে শিরিনের কণ্ঠে গানটি প্রকাশের পর চট্টগ্রামের শ্রোতাদের বাইরে অন্য শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পায়।

এ গবেষকের দাবি, প্রায় চার দশক আগে সোলস ব্যান্ড আমানউল্লাহর ‘আইচ্ছা পাগল মন রে’ গানটি গেয়ে আলোচিত হয়েছিল। তবে তারা গানটি সংগৃহীত বলে চালিয়ে দেওয়ায় আমানউল্লাহ প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি।
চলতি বছর আমানউল্লাহর পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মেইড ইন চিটাগং সিনেমার জন্য ‘ফেট ফুরেদ্দে তোঁয়াল্যাই’ গানটি রেকর্ড করেন শিল্পী পার্থ বড়ুয়া ও নিশিতা বড়ুয়া। এতে আমানউল্লাহর মূল সুরের ‘বিকৃতি’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন গবেষক নাসির।

অভিযোগ বিষয়ে পার্থ বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুরের একটু এদিক–ওদিক হতে পারে। কারণ, আমি এই গানের কোনো স্বরলিপি পাইনি। গানটা শুনতে কি অশালীন মনে হয়েছে? তাহলে এটি বিকৃত কী করে হলো? হয়তো এই ভার্সনটা আমার ভালো লাগতে না–ও পারে, হতে পারে। এটা একটা মানুষ বলতেই পারে। কিন্তু বিকৃত বলা তো ঠিক নয়।’