শ্রাবণের সন্ধ্যায় সুরে ভাসালেন রুনা লায়লা

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া গানগুলো গাইতে গাইতে তিনি যেন ছুঁয়ে গেলেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের স্মৃতি, ভালোবাসা আর অনুভূতিকেশিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

শ্রাবণের বৃষ্টি এদিন শুধু আকাশে ঝরেনি, ঝরেছিল সুরেও। ছুটির দিন শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল কখনো মেঘলা, কখনো রৌদ্রোজ্জ্বল। থেমে থেমে বৃষ্টি ভিজিয়েছে নগরজীবন। সন্ধ্যা নামার পর সেই বর্ষার আবহ যেন মিলেমিশে যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে। বাইরে তখন বৃষ্টি থেমেছে, ভেতরে একের পর এক শ্রোতৃপ্রিয় গান দিয়ে যেন সুরের বৃষ্টি ঝরাচ্ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া গানগুলো গাইতে গাইতে তিনি যেন ছুঁয়ে গেলেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের স্মৃতি, ভালোবাসা আর অনুভূতিকে।

রুনা লায়লার একক গানের অনুষ্ঠান ঘিরে দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২৭ থেকে ৭৭—বিভিন্ন বয়সের শ্রোতায় পূর্ণ ছিল ৭০০ আসনের জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন। একটি আসনও ফাঁকা ছিল না। আয়োজকদের ভাষ্য, টিকিট বিক্রি শুরুর প্রথম দিনেই সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। অনেক অনুরাগী টিকিট না পেয়ে আক্ষেপও করেন।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার কিছু পরে মঞ্চে ওঠেন রুনা লায়লা
শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার কিছু পরে মঞ্চে ওঠেন রুনা লায়লা। শুরুতেই তিনি বলেন, ‘যাঁরা বাংলা ভাষা ও দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের সম্মান জানিয়ে শুরু করছি।’ এরপর দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা’ দিয়ে শুরু হয় তাঁর পরিবেশনা।
এরপর একে একে পরিবেশন করেন ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘সাধের লাউ’ এবং প্রথমবারের মতো মঞ্চে গাইলেন নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’। দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে রাত সোয়া ৯টায় বহুল জনপ্রিয় ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গেয়ে শেষ করেন প্রায় দেড় ঘণ্টার এই আসর। সব মিলিয়ে তিনি পরিবেশন করেন ১১টি গান।
প্রতিটি গান শেষে মিলনায়তনজুড়ে করতালি আর উচ্ছ্বাস যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—সময় বদলায়, কিন্তু রুনা লায়লার গান প্রজন্মের পর প্রজন্মে একই রকম আবেদন নিয়ে বেঁচে থাকে।

শুধু গান নয়, পরিবেশনার ফাঁকে নিজের সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি ও মজার ঘটনাও শোনান রুনা লায়লা
শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

শুধু গান নয়, পরিবেশনার ফাঁকে নিজের সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি ও মজার ঘটনাও শোনান রুনা লায়লা। প্রাণবন্ত কথাবার্তা, সহজাত রসবোধ আর দর্শকদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামের এই আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক কনসার্ট। যদিও দীর্ঘ সংগীতজীবনে দু-তিনবার এই মঞ্চে গান গেয়েছেন, তবে একক আয়োজন এবারই প্রথম। অভিনেতা, নির্মাতা ও উপস্থাপক আফজাল হোসেন যখন বলছিলেন, ৬২ বছরের পেশাদার সংগীতজীবনের পর এই মঞ্চে প্রথম একক অনুষ্ঠান, তখন মজার ছলে রুনা লায়লা বলে ওঠেন, ‘অবশেষে ডেকেছে, এটাই তো!’ এরপর তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে এমন আয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে নিজের প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন রুনা লায়লা। জানান, মাত্র ছয় বছর বয়সে করাচিতে প্রথমবার মঞ্চে গান করেন তিনি। ঢাকা ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশনের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর বড় বোন দিনারের গান গাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ছোট্ট রুনাকে মঞ্চে ওঠানো হয়। সেই আকস্মিক পরিবেশনাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে রুনা লায়লা দশ সহস্রাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে পাকিস্তানে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ৬২ বছর পরও তাঁর সেই পথচলা সমান উজ্জ্বল। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতুসহ ১৮টি ভাষায় গান গেয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন উপমহাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে।

দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে রাত সোয়া ৯টায় বহুল জনপ্রিয় ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গেয়ে শেষ করেন প্রায় দেড় ঘণ্টার এই আসর
শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের একজন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম পরিবারসহ ছয়টি টিকিট কেটে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এ বয়সেও রুনা লায়লার এনার্জি আর কণ্ঠের শক্তি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমাদের দেশের কিংবদন্তি শিল্পীদের নিয়ে আরও বেশি টিকিটের বিনিময়ে অনুষ্ঠান হওয়া উচিত। এতে শিল্পী ও শিল্প—দুটোরই মূল্যায়ন বাড়বে। শুধু বিদেশি শিল্পীদের কনসার্ট নয়, দেশের শিল্পীদের জন্যও এমন উদ্যোগ নিয়মিত হওয়া দরকার।’
অনুষ্ঠানে রুনা লায়লাকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। সম্মাননা তুলে দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘আপনার কণ্ঠে প্রতিটি গান সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আপনার শিল্পসাধনা বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদা উজ্জ্বল করেছে।’

শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, ‘দেশের বরেণ্য শিল্পীদের যথাযথ সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটি সেই প্রচেষ্টারই অংশ।’
আয়োজকেরা জানান, অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হবে। এর আগে একই ধরনের একক আয়োজন করা হয়েছিল কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন ও সৈয়দ আব্দুল হাদীকে নিয়ে।
শ্রাবণের দিন থেমে থেমে ঝরেছিল বৃষ্টি। সন্ধ্যা নামার পর প্রকৃতি যেন নিজেই থেমে অপেক্ষা করেছিল আরেক বৃষ্টির জন্য—সুরের বৃষ্টি। রাত সোয়া ৯টায় ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ দিয়ে যখন শেষ হলো আসর, তখন শিল্পকলা একাডেমির সেই সন্ধ্যা শুধু একটি কনসার্ট হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল বাংলা গানের এক কিংবদন্তিকে ঘিরে প্রজন্মের ভালোবাসা আর সংগীতের এক স্মরণীয় উদ্যাপন।