গানে গানে তিন দশক
মা–বাবা চেয়েছিলেন, চাকরির পাশাপাশি সংগীতটাও চালিয়ে যান ছেলে। কিছুদিন তাই একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যান বাপ্পা মজুমদার। কিন্তু মা–বাবা যাঁর আপাদমস্তক শিল্পী, তাঁদের সন্তানও যে শুধু গান আঁকড়েই এগোবেন, সে আর আশ্চর্য কী। একটা সময় চাকরি ছেড়ে সংগীতটাই হয়ে উঠল তাঁর কাছে মুখ্য। এই বছর পেশাদার সংগীতজীবনের ৩০ বছর পার করছেন বাপ্পা মজুমদার। তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে গতকাল হয়ে গেল বিশেষ আয়োজন ‘অ্যালাইভ এক্সপেরিয়েন্স চ্যাপ্টার ওয়ান বাপ্পা মজুমদার’।
৩০ বছরে এমন আয়োজন আগে কেন হয়নি জানতে চাইলে বাপ্পা মজুমদার বলেন, ‘এভাবে কেউ ভাবেনি, তাই হয়তো হয়নি। সংগীতের বড় কোনো অনুষ্ঠান করাটা তো আসলে ইচ্ছারও ব্যাপার। সেই ইচ্ছা হয়তো কেউ এত দিন পোষণ করেনি। এবার শাহান ও জোহেব ইচ্ছা পোষণ করেছে, তাই হচ্ছে।’
পণ্ডিত বারীণ মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী ইলা মজুমদার বাপ্পার মা-বাবা। ১৭ সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িটায় সারাক্ষণই চলত সংগীতচর্চা। রেওয়াজ করতেন কেউ না কেউ। ছোটবেলা থেকে দেশ–বিদেশের বিভিন্ন শিল্পীর গান শুনে বেড়ে উঠেছেন বাপ্পা মজুমদার। এই তালিকায় বনি এম, অ্যাবা, ডোনা সামার যেমন ছিল; তেমনি সলিল চৌধুরী, মান্না দে, কিশোর কুমারও ছিলেন।
বাপ্পা বলেন, ‘সেমি-ক্ল্যাসিক্যাল শুনেছি, আবার পিওর ক্ল্যাসিক্যালও শুনছি। একই সঙ্গে ফোক, হেভি মেটালও শুনতাম। আরেকটা নেশা ছিল, রাত জেগে রেডিও শোনা। ফ্লাস্কভর্তি চা নিয়ে বারান্দায় বসে বিভিন্ন দেশের রেডিও শুনতাম। আমার মেজদা পার্থপ্রতীম মজুমদার বাসায় নানা ধরনের রেকর্ড নিয়ে আসতেন। তার কারণেও অনেক কিছু শোনা হয়েছে।’
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী শুভাশীষ মজুমদার একসময় বাপ্পা নামে পরিচিতি পান। ওই সময় শুধু গিটার বাজাতেন তিনি। ১৯৮৮ সালে বাপ্পা যখন এসএসসির শিক্ষার্থী, তখন বন্ধু আনন্দ রহমানের সঙ্গে গড়ে তোলেন অরনী শিল্পীগোষ্ঠী। বাপ্পা বলেন, ‘আমরা এই সংগঠনের হয়ে গান গাইতাম, গণসংগীত করতাম, আবৃত্তি আর অভিনয় চর্চাও করতাম।’ একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে গিটার বাজাতে গিয়ে হাসান আবিদুর রেজার সঙ্গে পরিচয়। ‘তিনি আমার গিটার বাজানো পছন্দ করেন। এরপর তাঁর সঙ্গে নিয়মিত বাজাতাম।’
’৯২ অথবা ’৯৩ সালের দিকে একদিন শাহবাগ আজিজ মার্কেটের সিঁড়িতে সঞ্জীব চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়। বাপ্পা বলেন, ‘দুজন একসঙ্গে ২৫ মার্চ ঘিরে অশোক কর্মকারের “কালরাত্রি” শিরোনামে প্রদর্শনীর আবহ সংগীত করতে গিয়ে দেখলাম, আমাদের দুজনের চিন্তাভাবনা প্রায় এক। পছন্দও কাছাকাছি। ভাবলাম, একসঙ্গে কিছু করা যায় কি না।
আমাদের সঙ্গে মিঠু ভাইও ছিলেন। গড়ে ওঠে দলছুট, সেটা ১৯৯৬ সালের নভেম্বরের কথা। ১৯৯৭-এ প্রথম অ্যালবাম আহ। আট মাসে শ্রোতাদের সাড়া পাইনি। পরের বছর “সাদা ময়লা রঙিলা পালে” গানটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “শুভেচ্ছা”য় প্রচারের পর দলছুটকে চেনে সবাই। ২০০০ সালে দ্বিতীয় অ্যালবাম হৃদয়পুর–এর গান “গাড়ি চলে না চলে না” ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “ইত্যাদি”তে প্রচারের পর দলছুটকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।’
তিন দশক পেরিয়ে আজ সঞ্জীব চৌধুরীকেই বেশি মনে পড়ে, ‘তাঁর কথা ভাবলেই বুকের ভেতর কষ্ট হয়। আমার কাছে তিনি বন্ধু, বড় ভাই, অভিভাবক, পথপ্রদর্শক, গাইড। প্রতিনিয়ত মিস করি তাঁর মিউজিক, তাঁর সাহচর্য।’
গিটারবাদন থেকে সংগীতশিল্পী, এরপর সংগীত পরিচালনা। শুরুতে আবৃত্তির অ্যালবাম, এরপর গানের অ্যালবাম। তাঁর সংগীত পরিচালনায় নিজের দ্বিতীয় অ্যালবাম কোথাও কেউ নেই প্রকাশিত হয়। বাইরের শিল্পীর মধ্যে বাপ্পার সংগীত পরিচালনায় প্রথম গেয়েছেন হাসান আবিদুর রেজা। চলচ্চিত্রে প্রথম আবহ সংগীত করেন গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের স্বপ্নডানায়। চলচ্চিত্রের গানের সংগীত পরিচালনা করেন শুভবিবাহতে। তিন দশকে চলচ্চিত্রের গানে খুব কম কণ্ঠ দিয়েছেন বাপ্পা মজুমদার। প্রথম গেয়েছেন ইমন সাহার মাধ্যমে, চাষী নজরুল ইসলামের সুভা চলচ্চিত্রে। হাতে গোনা কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করে অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
সত্তা ছবিতে বাপ্পা মজুমদারের সুর ও সংগীতে গান গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন অন্য শিল্পীরাও, তাঁদেরই একজন জেমস। তিনি বাপ্পার সুর ও সংগীতে ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ হলাম’ গেয়ে সেরা গায়কের পুরস্কার পান। সেই গান এই অনুষ্ঠানে গেয়েছেন বাপ্পা। এর বাইরে দুই ডজনের বেশি গান গেয়েছেন তিনি।
‘অ্যালাইভ এক্সপেরিয়েন্স চ্যাপ্টার ওয়ান বাপ্পা মজুমদার’ আয়োজন করে ক্যারট কম। মঞ্চে দলছুট সদস্যরা ছাড়াও বাপ্পাকে ঘিরে ছিলেন বেশ কয়েকজন বিশেষ মিউজিশিয়ান। অতিথি শিল্পী হিসেবে ছিলেন তাঁরই ফিচারিং তিন শিল্পী: কনা, কোনাল শুভ ও জয়ীতা।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় বাপ্পার প্রথম একক অ্যালবাম তখন ভোরবেলা। একক, দ্বৈত, মিশ্রসহ তাঁর প্রকাশিত অ্যালবামের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে পেশাদার সংগীতশিল্পী হলেও ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল স্থপতি হওয়ার। বাপ্পার ইলেকট্রনিক পণ্যের প্রতি দুর্বলতা আছে। ড্রোন ওড়াতে ভালোবাসেন। ভিডিও গেমসও পছন্দ, যদিও অনেক দিন খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না তিনি। অ্যাস্ট্রোফিজিকসেরও প্রতি রয়েছে তাঁর আকর্ষণ।