‘রঞ্জিশ হি সহি’ থেকে ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’, চট্টগ্রামে জমেছিল ‘কিংবদন্তির গান’
চট্টগ্রামের টিআইসি মিলনায়তনে শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হলো শেখ রায়হান আনোয়ারের দ্বিতীয় একক সংগীতানুষ্ঠান ‘কিংবদন্তির গান’। প্রতিজ্ঞা সংগীত একাডেমির আয়োজনে দুই ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠান দর্শক-শ্রোতাদের নিয়ে গিয়েছিল উপমহাদেশের সংগীত ঐতিহ্যের এক বর্ণাঢ্য ভ্রমণে। নানা প্রজন্মের কিংবদন্তি শিল্পীদের অমর সৃষ্টিগুলো নিজের কণ্ঠে পরিবেশন করে শেখ রায়হান আনোয়ার সৃষ্টি করেন এক আবেগঘন ও অতীতাকুল পরিবেশ।
অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব ছিল গানের বৈচিত্র্য ও শিল্পীর নির্বাচনের সৌকর্য। ধ্রুপদি, আধুনিক, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, গজল ও লালনগীতির সমন্বয়ে সাজানো পরিবেশনা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খানের বিখ্যাত ‘আয়েনা বালাম’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর কণ্ঠের সাধনা ও রাগসংগীতের প্রতি অনুরাগের পরিচয় দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানে ছিল আবেগ ও সংযমের অপূর্ব মেলবন্ধন।
পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর জনপ্রিয় ‘ডাগর নয়ন’, কিশোর কুমারের ‘নয়ন সরসী কেন’, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে’ এবং মান্না দের ‘কে তুমি তন্দ্রাহরণী’—প্রতিটি গানেই শিল্পী মূল শিল্পীদের আবহকে সম্মান জানিয়ে নিজের স্বকীয়তার ছাপ রাখার চেষ্টা করেছেন। লালনের ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’ পরিবেশনে তিনি দর্শকদের নিয়ে যান এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুভবের জগতে।
নজরুলসংগীত ‘ধীরে যায় ফিরে ফিরে চায়’ এবং পঙ্কজ উদাসের ‘চাঁদ জ্যায়সা’ গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ হয় অন্য মাত্রা। জগজিৎ সিংয়ের কালজয়ী গজল ‘হোঁঠোঁ সে ছুঁ লো তুম’, মেহেদী হাসানের অমর সৃষ্টি ‘রঞ্জিশ হি সহি’ এবং ওস্তাদ গোলাম আলীর ‘হাঙ্গামা হ্যায় কিউঁ’ পরিবেশনায় শিল্পীর কণ্ঠে গজলের আবেগ ও ব্যঞ্জনা বিশেষভাবে ধরা পড়ে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ পরিবেশনের সময় মিলনায়তনের আবহ যেন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। একঝাঁক তরুণ কণ্ঠশিল্পী কোরাসে অংশ নিয়ে গানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন। দর্শক-শ্রোতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটির সমাপ্তিকে স্মরণীয় করে রাখে।
শুধু গান নয়, বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সুনিপুণ সংগতও অনুষ্ঠানটির অন্যতম শক্তি ছিল। তপন চক্রবর্তীর তবলা বাদন ছিল অনবদ্য; প্রতিটি গানের মেজাজ অনুযায়ী তিনি ছন্দের সূক্ষ্ম কারুকাজ তুলে ধরেছেন। রোমেন শীলের কি–বোর্ড, নন্দন নন্দীর অক্টোপ্যাড, সুচয়ন দের লিড গিটার এবং রাজু বড়ুয়ার বেজ গিটার সম্মিলিতভাবে সংগীত আয়োজনকে দিয়েছে পরিপূর্ণতা। উপল শীলের সংগীতবিন্যাস অনুষ্ঠানটির সামগ্রিক সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
দুটি গানের সঙ্গে পূর্ণা চৌধুরীর ধ্রুপদি নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের জন্য ছিল বাড়তি আকর্ষণ। সংগীত ও নৃত্যের এই সমন্বয় অনুষ্ঠানটিকে একক সংগীতানুষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আয়োজনে রূপ দেয়।
‘কিংবদন্তির গান’ ছিল সংগীতের স্বর্ণযুগকে স্মরণ করার এক আন্তরিক প্রয়াস। শেখ রায়হান আনোয়ার তাঁর কণ্ঠ, নিষ্ঠা ও সংগীতপ্রেম দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে কালজয়ী গান কখনো পুরোনো হয় না; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা নতুন শ্রোতার হৃদয়ে একইভাবে অনুরণিত হতে থাকেন।