‘ডাক্তার ডাকলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে’ বলার পর সত্যি সত্যিই হৃদ্রোগে মারা যান কিশোর কুমার
কখনো গানে মাতিয়েছেন, কখনো অভিনয়ে হাসিয়েছেন দর্শককে। কখনো আবার নিজের খামখেয়ালি স্বভাব আর অদ্ভুত সব কাণ্ডে হয়েছেন আলোচনার বিষয়। কিশোর কুমার ছিলেন এমনই এক মানুষ, যাঁকে কোনো একটি পরিচয়ে বেঁধে রাখা কঠিন। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন তাঁরই কোনো সিনেমার গল্প—যেখানে আছে অদ্ভুত এক ভবিষ্যদ্বাণী, মৃত্যুর আগে ছেলের জন্য অপেক্ষা, আর শেষ মুহূর্তেও রসিকতা করার স্বভাব।
১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মারা যান ভারতের কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পী। চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্রোগের কথা জানান। কিন্তু মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আজও মানুষের কৌতূহল জাগায়। বিশেষ করে তাঁর ছেলে অমিত কুমারের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে এমন কিছু কথা, যা শুনলে মনে হয়, নিজের মৃত্যুর আঁচ কি আগেই পেয়েছিলেন কিশোর?
সাত বছরের ভবিষ্যদ্বাণী
কিশোর কুমারের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল তাঁর মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর আগে। ১৯৮২ সালে আসামে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে এক ট্যারো কার্ড পাঠকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিশোরের। ছেলের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি কিশোরকে বলেছিলেন, তাঁর হাতে আর সাত বছর সময় আছে।
কথাটি কি নিছক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, নাকি কাকতালীয় কোনো ঘটনা—তার উত্তর জানা নেই। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মারা যাননি কিশোর; মারা যান ১৯৮৭ সালে, অর্থাৎ ১৯৮২ সালের সেই ঘটনার প্রায় পাঁচ বছর পর। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণীর ঘটনাটি আলোচিত হয়েছে।
কিশোরের ছেলে অমিত কুমার পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে ঘটনাটি স্মরণ করেন। তাঁর বক্তব্যের সূত্র ধরেই বাবার মৃত্যুকে ঘিরে এ গল্প নতুন করে আলোচনায় আসে।
মৃত্যুর দিনও ছেলের অপেক্ষায়
কিশোরের জীবনের শেষ দিনটি ছিল ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর। সে সময় অমিত কুমার যুক্তরাষ্ট্রে একটি অনুষ্ঠানের সফরে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা গোবিন্দ ও আসরানি। সফরের শেষ পর্যায়ে অমিত ছিলেন টরন্টোতে।
অমিতকে সেখান থেকে কিছু ইংরেজি সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট কিনে আনতে বলেছিলেন কিশোর কুমার। অমিতের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, সেগুলো কেনার কথাও তাঁর মনে ছিল। কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না, দেশে ফিরে বাবার সঙ্গে আর দেখা হবে না।
অমিতের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর দিন কিশোর তাঁর ফেরার সময় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ছেলের বিমান ঠিক সময়ে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে বারবার খোঁজ নিচ্ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতিও সেদিন তাঁর আচরণে কিছুটা অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন অমিত।
এই স্মৃতিগুলোই কিশোরের শেষ দিনকে ঘিরে রহস্যের আবহ তৈরি করেছে। তবে এসব ঘটনা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে তিনি নিজের মৃত্যুর সময় বুঝতে পেরেছিলেন।
চিকিৎসক ডাকতে নিষেধ করেছিলেন?
কিশোর কুমারের মৃত্যুর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি তাঁর শেষ মুহূর্তের কথোপকথন। ছেলে অমিত কুমারের স্মৃতিচারণ এবং কিশোরের জীবনীভিত্তিক লেখায় উঠে এসেছে, মৃত্যুর দিন অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি। শরীর ভালো লাগছিল না, কাঁধেও ব্যথা অনুভব করছিলেন।
স্ত্রী লীনা চন্দাভারকর প্রথমে ভেবেছিলেন, কিশোর হয়তো মজা করছেন। কারণ, মানুষকে হাসানো এবং নিজের খামখেয়ালি আচরণে সবাইকে চমকে দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
কিশোরের শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকলে চিকিৎসক ডাকার কথা ভাবেন লীনা। তখন কিশোর নাকি রসিকতা করে বলেছিলেন, ডাক্তার ডাকলে তাঁর সত্যিই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। কথাটি ছিল তাঁর পরিচিত রসিকতাপ্রবণ স্বভাবেরই প্রতিফলন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর পরপরই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
কিশোরকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর ফেরানো যায়নি।
মৃত্যুর আগের দিনও গেয়েছিলেন গান
কিশোরের জীবনের শেষ কর্মদিবসটিও ছিল সংগীতে ভরা। ১৯৮৭ সালের ১২ অক্টোবর, মৃত্যুর ঠিক আগের দিন, মুম্বাইয়ের মাহবুব স্টুডিওতে সংগীত পরিচালক বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে ‘গুরু গুরু’ গানটি রেকর্ড করেছিলেন তিনি। গানটি ছিল মিঠুন চক্রবর্তী ও শ্রীদেবী অভিনীত ‘ওয়াক্ত কি আওয়াজ’ ছবির জন্য।
বাপ্পি লাহিড়ী পরে স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন, রেকর্ডিংয়ের সময় কিশোর বরাবরের মতোই হাসিঠাট্টায় মেতে ছিলেন। তাঁর আচরণে এমন কিছু ছিল না, যা দেখে বোঝা যেত জীবনের শেষ গানগুলোর একটি রেকর্ড করছেন তিনি।
পরদিনই সেই মানুষটির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। যে কণ্ঠে অসংখ্য গান মানুষের মন জয় করেছিল, সেই কণ্ঠের যাত্রা থেমে যায় আচমকাই।
খামখেয়ালি স্বভাব, কিন্তু সংগীতে অনন্য
কিশোর কুমার শুধু গায়ক ছিলেন না; অভিনেতা, সুরকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রথাগত প্রশিক্ষণ না থাকলেও নিজের কণ্ঠ, গায়কির বৈচিত্র্য ও অভিনব প্রকাশভঙ্গিতে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন।
‘মেরে স্বপ্নো কি রানি’, ‘রুপ তেরা মস্তানা’, ‘আনেওয়ালা পাল’, ‘ও সাথি রে’ কিংবা ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’—এমন অসংখ্য গানে তাঁর কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের কাছে প্রিয়। দেব আনন্দ, রাজেশ খান্না ও অমিতাভ বচ্চনের মতো তারকাদের পর্দার উপস্থিতিকে তাঁর কণ্ঠ দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
ব্যক্তিজীবনে কিশোর ছিলেন স্বাধীনচেতা, আবেগপ্রবণ ও নিজের মতো করে চলতে পছন্দ করা মানুষ। জীবনের শেষ দিকে সংগীতের পরিবর্তিত ধারা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন বলেও তাঁর ছেলে জানিয়েছেন। নিজের জন্মস্থান মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল তাঁর।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে