২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মালিক এই আলোচিত গায়ক-অভিনেতা
বিশ্বসংগীতের অন্যতম আলোচিত তারকা হ্যারি স্টাইলসের জন্মদিন আজ। একসময়ের বয় ব্যান্ডের সদস্য থেকে আজ তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, ফ্যাশন আইকন ও অভিনেতা—আধুনিক পপ সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখগুলোর একটি। সংগীত, ফ্যাশন ও লিঙ্গ-অভিব্যক্তির প্রচলিত সীমারেখা ভেঙে দেওয়া এই শিল্পী কীভাবে হয়ে উঠলেন বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রতীক। জন্মদিন উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক তাঁর ক্যারিয়ার, ব্যক্তিত্ব, বিতর্ক, সাফল্য আর জানা-অজানা নানা দিক।
ছোট শহর থেকে বিশ্বমঞ্চে
হ্যারি এডওয়ার্ড স্টাইলসের জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪, ইংল্যান্ডের ওরচেস্টারশায়ারের রেডিচ শহরে। বেড়ে ওঠা চেশায়ারের ছোট শহর হোমস চ্যাপেলে। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। স্কুলজীবনে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলা ব্যান্ড ছিল তাঁর সংগীতযাত্রার হাতেখড়ি। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০১০ সালে, ব্রিটিশ ট্যালেন্ট শো ‘দ্য এক্স ফ্যাক্টর’-এ অংশ নেওয়ার মাধ্যমে।
একক প্রতিযোগী হিসেবে অডিশনে অংশ নিলেও বিচারকদের সিদ্ধান্তে হ্যারি স্টাইলস, নিয়াল হোরান, লিয়াম পেইন, লুই টমলিনসন ও জেইন মালিককে নিয়ে গঠিত হয় ব্যান্ড ওয়ান ডাইরেকশন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পপ সংগীতের এক দশকের ইতিহাস।
ওয়ান ডাইরেকশন: বিশ্বজুড়ে পাওয়া তারকাখ্যাতি
২০১০ থেকে ২০১৫—এই সময়ে ওয়ান ডাইরেকশন হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী তরুণ প্রজন্মের উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দু। ‘হোয়াট মেকস ইউ বিউটিফুল’, ‘স্টোরি অব মাই লাইফ’, ‘বেস্ট সং এভার’, ‘ড্রাম মি ডাউন’—একের পর এক হিট গান ব্যান্ডটিকে নিয়ে যায় চার্টের শীর্ষে। স্টেডিয়াম ট্যুর, রেকর্ড ভাঙা অ্যালবাম বিক্রি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে ওয়ান ডাইরেকশন ছিল আধুনিক পপ সংস্কৃতির অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন।
হ্যারির আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এসেছে রেকর্ডভাঙা বৈশ্বিক কনসার্ট টুর থেকে। বিশেষ করে ‘লাভ অন ট্যুর’ ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সফল বিশ্ব ট্যুরগুলোর একটি, যা তাঁকে শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, বিপুল আর্থিক সাফল্যও এনে দেয়। পাশাপাশি তাঁর তিনটি একক অ্যালবাম থেকেও আয় হয়েছে। এ ছাড়া মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক পেয়েছেন সিনেমা থেকেও।
এই সময়েই হ্যারি স্টাইলস ধীরে ধীরে ব্যান্ডের সবচেয়ে আলোচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর কণ্ঠের আলাদা টেক্সচার, স্টেজে উপস্থিতি ও ক্যারিশমা তাঁকে আলাদা করে তোলে। তবে তারকাখ্যাতির এই উত্থানের সঙ্গে আসে গোপনীয়তার অভাব, ট্যাবলয়েড নজরদারি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে লাগাতার গুঞ্জন।
একক ক্যারিয়ার: নিজের পরিচয় নির্মাণ
২০১৫ সালে ওয়ান ডাইরেকশন বিরতিতে গেলে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন—হ্যারি স্টাইলস কি একক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন? কিন্তু ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘হ্যারি স্টাইলস’ সেই সন্দেহ অনেকটাই দূর করে দেয়।
এরপর আসে ‘ফাইন লাইন’ (২০১৯)। এই অ্যালবামেই হ্যারি স্টাইলস নিজেকে পূর্ণাঙ্গ পপ তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যালবামের ‘ওয়াটারমেলন সুগার’ শুধু চার্ট টপারই নয়, গ্র্যামি পুরস্কারও এনে দেয় তাঁকে। প্রেম, বিচ্ছেদ, আত্মানুসন্ধান ও মানসিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে এই অ্যালবাম তাঁর শিল্পীসত্তার আরও পরিণত রূপ তুলে ধরে।
২০২২ সালে প্রকাশিত ‘হ্যারিস হাউস’ তাঁকে নিয়ে যায় আরও এক ধাপ ওপরে। ‘অ্যাজ ইট ওয়াজ’ বিশ্বজুড়ে বছরের সবচেয়ে বড় হিটগুলোর একটি হয়। এই অ্যালবামে হ্যারি আরও ব্যক্তিগত, আরও সংযত, কিন্তু আরও আত্মবিশ্বাসী শিল্পীর পরিচয় দেন। সমালোচকদের মতে, এটি তাঁর সবচেয়ে পরিণত ও ভারসাম্যপূর্ণ কাজগুলোর একটি।
ফ্যাশন আইকন: লিঙ্গনিরপেক্ষ স্টাইলের মুখ
সংগীতের বাইরেও হ্যারি স্টাইলস হয়ে উঠেছেন আধুনিক ফ্যাশনের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি নিয়মিতই লিঙ্গনিরপেক্ষ বা জেন্ডারফ্লুইড পোশাক পরে আলোচনায় আসেন। স্কার্ট, নেইল পলিশ, রঙিন স্যুট—সব মিলিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন পুরুষ ফ্যাশনের প্রচলিত গণ্ডি।
২০২০ সালে তিনি ভোগ ম্যাগাজিনের কভারে প্রথম একক পুরুষ হিসেবে উপস্থিত হন, তা–ও একটি গাউন পরে। এটি যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি সমালোচনার মুখেও পড়েছে। হ্যারি বরাবরই বলেছেন, তাঁর কাছে ফ্যাশন মানে নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা—আর এই অবস্থান তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক করে তুলেছে।
অভিনয়ে পদার্পণ: বড় পর্দায় নতুন অধ্যায়
হ্যারি স্টাইলসের অভিনয় ক্যারিয়ারও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ২০১৭ সালে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ডানকার্ক’-এ তাঁর অভিনয় ছিল অনেকের জন্য চমক। এরপর ‘ডোন্ট ওরি ডার্লিং’ ও ‘মাই পুলিশম্যান’-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখান, অভিনয়কে তিনি কেবল শখ হিসেবে নয়, সিরিয়াস ক্যারিয়ার হিসেবেই দেখছেন।
যদিও এই ছবিগুলো নিয়ে সমালোচকদের মতভেদ রয়েছে, তবু এটুকু স্পষ্ট—হ্যারি নিজেকে শুধুই ‘পপ স্টার-অভিনেতা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না।
ব্যক্তিগত জীবন ও ট্যাবলয়েড সংস্কৃতি
হ্যারি স্টাইলসের ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই মিডিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রে। বিভিন্ন তারকার সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন নিয়মিতই ট্যাবলয়েডের শিরোনাম হয়েছে। তবে তিনি সচেতনভাবেই নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কম কথা বলেন।
হ্যারির এই নীরবতা একদিকে যেমন রহস্য তৈরি করে, অন্যদিকে নানা জল্পনারও জন্ম দেয়। হ্যারি বরাবরই বলে আসছেন—তিনি চান তাঁর কাজই তাঁকে সংজ্ঞায়িত করুক, ব্যক্তিগত জীবন নয়।
লাইভ পারফরম্যান্স: স্টেডিয়াম কাঁপানো শক্তি
হ্যারি স্টাইলসের কনসার্ট মানেই রঙিন পোশাক, দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং উচ্ছ্বসিত শক্তিতে ভরা পারফরম্যান্স। তাঁর ‘লাভ অন ট্যুর’ কনসার্ট সিরিজটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম সফল ট্যুর হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, লাইভ পারফরম্যান্সেই হ্যারি স্টাইলসের প্রকৃত শক্তি সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে।
কত সম্পদের মালিক
সংগীত, অভিনয় ও ব্র্যান্ড অংশীদারত্ব—সব মিলিয়ে হ্যারি স্টাইলস বর্তমানে ব্রিটিশ বিনোদন জগতের সবচেয়ে ধনী তরুণ তারকাদের একজন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সানডে টাইমস রিচ লিস্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের হিসাবে ৩৫ বছরের কম বয়সী ব্রিটিশ তারকাদের মধ্যে তিনি ছিলেন শীর্ষ ধনীদের কাতারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি (প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা)। সাম্প্রতিক টুর ও নতুন প্রকল্পের কারণে এই অঙ্ক আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি বছর হ্যারি স্টাইলস তাঁর ভক্তদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছেন। ২০২৬ সালে তিনি তাঁর নতুন স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন, যা ‘হ্যারিস হাউস’-এর পর তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নতুন প্রজেক্ট। ঘোষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এই অ্যালবামে হ্যারি আরও বেশি পরীক্ষামূলক সাউন্ড, লাইভ ইনস্ট্রুমেন্টেশন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত গান যুক্ত করছেন।
হ্যারির আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এসেছে রেকর্ডভাঙা বৈশ্বিক কনসার্ট টুর থেকে। বিশেষ করে ‘লাভ অন ট্যুর’ ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সফল বিশ্ব ট্যুরগুলোর একটি, যা তাঁকে শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, বিপুল আর্থিক সাফল্যও এনে দেয়। পাশাপাশি তাঁর তিনটি একক অ্যালবাম থেকেও আয় হয়েছে। এ ছাড়া মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক পেয়েছেন সিনেমা থেকেও।
নতুন অ্যালবাম ও বিশ্ব ট্যুর: ২০২৬-এ হ্যারির নতুন অধ্যায়
চলতি বছর হ্যারি স্টাইলস তাঁর ভক্তদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছেন। ২০২৬ সালে তিনি তাঁর নতুন স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন, যা ‘হ্যারিস হাউস’-এর পর তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নতুন প্রজেক্ট। ঘোষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এই অ্যালবামে হ্যারি আরও বেশি পরীক্ষামূলক সাউন্ড, লাইভ ইনস্ট্রুমেন্টেশন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত গান যুক্ত করছেন।
শিল্পীর ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন অ্যালবামে থাকছে রক, সফট-পপ ও ইন্ডি প্রভাবের মিশ্রণ, যেখানে আগের কাজের তুলনায় আরও পরিণত লিরিক ও সংগীতায়োজন শোনা যাবে। ভক্তদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে—এই অ্যালবামটি কি হ্যারি স্টাইলসের ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে?
অ্যালবামের পাশাপাশি ঘোষণা এসেছে নতুন বিশ্ব ট্যুরের। এই ট্যুরের মাধ্যমে তিনি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক বড় শহরে পারফর্ম করার পরিকল্পনা করছেন। ‘লাভ অন ট্যুর’-এর বিপুল সাফল্যের পর এই নতুন ট্যুরকে ঘিরে প্রত্যাশা আরও বেশি। আয়োজকদের মতে, এটি হতে যাচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বৃহৎ ও প্রযোজনামূলক দিক থেকে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ট্যুর।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, ব্রিট অ্যাওয়ার্ড, এমটিভি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড—হ্যারি স্টাইলসের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা। ‘হ্যারিস হাউস’ অ্যালবামের জন্য তিনি বছরের সেরা অ্যালবামসহ গুরুত্বপূর্ণ গ্র্যামি পুরস্কার পান, যা তাঁকে সমসাময়িক পপ শিল্পীদের শীর্ষ সারিতে স্থায়ী করে।
ভোগ, কসমোপলিটন অবলম্বনে