‘আজ যে শিশু’ থেকে ‘ঘুম ভাঙা শহরে’: জন্মদিনে এক গীতিকবির যাত্রাপথ

৬ ফেব্রুয়ারি গীতকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর জন্মদিনকোলাজ

সমুদ্র-হাওয়ার শহর চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ ঢাকার ব্যস্ততায় এসে থিতু হলেন—ব্যবসা করলেন, শিক্ষকতা করলেন, কফিশপ খুললেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থা গড়লেন; আবার দিনের শেষে ফিরে গেলেন সেই জায়গায়, যেখানে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—গীতিকবি। তিনি গীতকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী।

আজ তাঁর জন্মদিন। বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাসে যাঁর লেখা ‘আজ যে শিশু’, ‘হৃদয় কাদামাটি’, ‘আমি ভুলে যাই তুমি আমার নও’, ‘যতীন স্যারের ক্লাসে’, ‘সময় যেন কাটে না’, ‘তৃতীয় বিশ্ব’ কিংবা ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’—এ গানগুলো শুধু জনপ্রিয় গান নয়; অনেকের কাছে এগুলো জীবনেরও “লাইন”।

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
প্রথম আলো

শিকড়: চট্টগ্রাম, পরিবার ও সাংস্কৃতিক উঠোন  
শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর জন্ম ১৯৫৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। পরিবারে রাজনীতি-সমাজসেবারও একটা দীর্ঘ ছায়া আছে—তাঁর বাবা এ. এল. চৌধুরী ১৯৫৪ সালে যুক্ত ফ্রন্টের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; পরে সমাজসেবায় নিবেদিত হন। তাঁর সেই অবদানকে সম্মান জানিয়ে চট্টগ্রামে এ. এল. চৌধুরীর নামে একটি সড়কও আছে। তবে জঙ্গীর শৈশব-কৈশোরের আরেকটা শক্ত ভিত্তি ছিল—বাড়ির উঠোনে গান। ৬০–৭০ দশকে তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত গানের আসর বসত, রোববার ছিল সেই আসরের দিন। নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রধারা থেকে মাইজভান্ডারি, রমেশ শীল—নানান ঘরানার গান। ছোট ভাইদেরও গানচর্চা ছিল; একজনের একসময় একক অ্যালবাম বের হয়, একটি গান জনপ্রিয়ও হয়। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশই ধীরে ধীরে তাঁকে টেনে নিল—সংগঠন, মঞ্চ, আড্ডা, শিল্পীদের জগতে।

তিনি বলেন, তাঁদের পারিবারিক পদবি ছিল চৌধুরী। কিন্তু নামের লম্বা হওয়ার ধারা কমাতে গিয়ে তাঁর বাবাই ‘জঙ্গী’ শব্দটি নামের সঙ্গে জুড়ে দেন—একটি আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সূত্রে: বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গী—সেখান থেকেই ‘জঙ্গী’ শব্দটির গ্রহণ।

স্কুল পালানো ছেলেটা নাটকের ‘মন্টু’ হয়ে গেল
স্কুল পালানো ছেলেটার কৈশোরটা সত্যিই যেন একধরনের সিনেম্যাটিক যাত্রা। প্রতিদিন সকালে বই–খাতা হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেক সময়ই তাঁর গন্তব্য হতো কাছের সিনেমা হল কিংবা পাবলিক লাইব্রেরি। ক্লাসের একঘেয়েমি আর বাঁধাধরা নিয়মের চেয়ে গল্প, কল্পনা আর পর্দার আলো তাঁকে বেশি টানত। এই ‘বেপরোয়া’ স্বভাব বদলাতে পরিবার একসময় তাঁকে বোর্ডিং স্কুলেও পাঠায়। শৃঙ্খলার কড়াকড়িতে কিছুদিন চললেও মনটা তাতে বসেনি। পরে এম ই এস হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টা অন্যভাবে দেখল। শাস্তি বা ভীতি নয়, বরং দায়িত্ব—এই ভাবনা থেকেই তাঁকে ক্লাস ক্যাপ্টেন করা হয়। দায়িত্ব কাঁধে পড়তেই ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে আচরণ; ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার বদভ্যাস অনেকটাই কমে আসে।

তবে সবচেয়ে বড় বাঁকটা আসে নাটকের হাত ধরে। স্কুলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করতে প্রধান শিক্ষক যখন একটি নাটক মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করেন, তখন সেই নাটকের খোঁজ এনে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপরই। তিনি খুঁজে বের করেন ‘মন্টুর পাঠশালা’—শিশু–কিশোর মনস্তত্ত্ব আর শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা একটি পরিচিত গল্পনির্ভর নাটক। শুধু নাটক খুঁজে আনা নয়, শেষ পর্যন্ত তিনিই ‘মন্টু’ চরিত্রে অভিনয় করেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা, চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়া আর দর্শকের প্রতিক্রিয়া—এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভেতরের অস্থিরতাকে এক নতুন খাতে প্রবাহিত করে। যে ছেলেটা এত দিন স্কুল এড়িয়ে চলত, সেই ছেলেটাই নাটকের রিহার্সাল, সংলাপ মুখস্থ আর মঞ্চ ভাবনা নিয়ে ডুবে যেতে শুরু করে। নাটক-সংস্কৃতির এই সংস্পর্শ তাঁর মনোজগৎ বদলে দেয়—পালিয়ে বেড়ানোর জায়গায় আসে দায়িত্ববোধ, আর এলোমেলো কৌতূহলের জায়গা নেয় সৃজনশীল অনুসন্ধান। স্কুল পালানো ছেলেটা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মঞ্চের ‘মন্টু’—এবং সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক অধ্যায়।

এক অর্থে, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ হয়ে ওঠে এলআরবি–যাত্রার সূচনাসংগীত
কোলাজ

১৯৬৯–৭১: আন্দোলন, মামলা, পালিয়ে বাঁচা
চট্টগ্রামের ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সময় তাঁর জীবনেও রেখেছে গভীর দাগ। ১৯৭০ সালে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ বইয়ের বিরুদ্ধে স্কুল-ছাত্র আন্দোলনে তিনি মাধ্যমিক স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, চট্টগ্রাম শাখার নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক হন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে একটি পত্রিকা অফিসে পাথর ছোড়ার ঘটনায় মামলা হয়; মার্শাল ল-এর সময় মেজর খিজির হায়াত খানের আদালতে হাজিরার নির্দেশ আসে। সভাপতির শাস্তি হয় কারাদণ্ড—ফলে তিনি ঢাকায় পালিয়ে যান; অনুপস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে ৯ মাস কারাদণ্ড ও হুলিয়া জারি হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বয়স কম থাকায় ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও তিনি নানা সহায়ক কাজে যুক্ত ছিলেন—বার্তা পৌঁছে দেওয়া, নজরদারি, ছোট ছোট দায়িত্ব। যুদ্ধকালে তাঁর বাবাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্দেশে তুলে নেওয়ার ঘটনাটিও তাঁদের পরিবারের জন্য ছিল ভয়াবহ অভিজ্ঞতা—পরে বহু প্রচেষ্টায় তাঁকে ফেরত পাওয়া যায়।

‘সুরেলা’ (সোলস)-এর প্রথম শো, আর চট্টগ্রামের ব্যান্ড-নেটওয়ার্ক  
স্বাধীনতার পরপরই, ১৯৭২ সালে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সূচনা’–র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে যখন নতুন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলার তাগিদ প্রবল, তখন ‘সূচনা’ থেকে নিয়মিতভাবে রবীন্দ্র–নজরুল জয়ন্তীসহ নানা সাহিত্য–সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

এই আয়োজনগুলোর একটিতেই ঘটেছিল চট্টগ্রামের ব্যান্ড সংগীত ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা। সেই মঞ্চে দুটি অ্যাকর্ডিয়ন হাতে নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বাজান মমতাজুল হক লুলু ও সাজেদুল আলম—তখন তাঁদের ব্যান্ডের নাম ছিল ‘সুরেলা’, যা পরবর্তী সময়ে পরিচিত হয় ‘সোলস’ নামে। সংগীত–ইতিহাসের বিচারে এটিই ছিল তাঁদের প্রথম পাবলিক পারফরম্যান্স—একেবারে অনাড়ম্বর পরিবেশে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য গভীর তাৎপর্য নিয়ে।


সে সময় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল উর্বর। তরুণ শিল্পীদের মধ্যে তখনই ঘুরে বেড়াচ্ছেন কুমার বিশ্বজিৎ, নকীব খান, তপন চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, নাসিম আলী খানসহ আরও অনেকে—যাঁরা পরবর্তীকালে দেশের সংগীতজগতে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করবেন। জঙ্গী ছিলেন মূলত সাংস্কৃতিক সংগঠক ও গীতিকবি; আর ওঁরা তখন পারফর্মার, সংগীতসাধক। তবু এই ভিন্ন ভূমিকার মাঝেও সম্পর্কটা ছিল ঘনিষ্ঠ—একধরনের বড় ভাই–ছোট ভাইয়ের বন্ধনে বাঁধা। আড্ডা, রিহার্সাল, অনুষ্ঠান আয়োজন—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী ব্যান্ড–নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চট্টগ্রাম শহর।

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
শিল্পীর ফেসবুক থেকে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠন—‘সৈকতচারী’। এই সংগঠনটি শুধু গান–নাটকের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর লক্ষ্য ছিল লোকজ সংস্কৃতি, আধুনিক গান আর সামাজিক চেতনার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা। জঙ্গীর মতে, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রামের ডিসি হিল পার্কে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের যে প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়, সেখানে ‘সৈকতচারী’র ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখনো পয়লা বৈশাখ সার্বজনিক উৎসব হিসেবে চট্টগ্রামে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি; সেই প্রেক্ষাপটে এমন আয়োজন ছিল সাংস্কৃতিক সাহসের উদাহরণ।

‘সৈকতচারী’র মঞ্চে নিয়মিত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মৌলিক গানের প্রতি একধরনের তাগিদ তৈরি হতে থাকে। শুধু কভার বা পুনর্নির্মাণ নয়—নিজস্ব কথা, নিজস্ব সুরের গান গাওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এই তাগিদ থেকেই ১৯৭৮ সালে তিনি লেখেন তাঁর প্রথম দিককার দুটি উল্লেখযোগ্য গান—একটি আঞ্চলিক ভাষায়, চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ নিয়ে; আরেকটি আধুনিক রোমান্টিক ধারার, নগর–সংবেদনশীলতায় ভর করে। এই দুটি গানই ছিল তাঁর গীতিকবিতা–যাত্রার প্রাথমিক স্বাক্ষর। সেখান থেকেই শুরু হয় সেই পথচলা—যে পথচলা পরবর্তী কয়েক দশকে বাংলা সংগীতে জমা করেছে অসংখ্য জনপ্রিয় ও ‘কালজয়ী’ গানের ভান্ডার।

আরও পড়ুন

আইয়ুব বাচ্চু, পার্থ, পিলু—কতজনের ‘প্রথম’
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে তাঁর নামটি তাই শুধু একজন গীতিকবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বহু শিল্পীর ‘প্রথম’ মুহূর্তের সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে এই ভূমিকা প্রায় কিংবদন্তির মতোই আলোচিত। শুরুতে আইয়ুব বাচ্চু ইংরেজি রক ও ওয়েস্টার্ন ঘরানার গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। জঙ্গীই প্রথম তাঁকে ধারাবাহিকভাবে বোঝান—বাংলা ভাষায় গান না করলে নিজের মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে না। সেই পরামর্শ থেকেই তিনি বাচ্চুকে একটি বাংলা গান লিখে দেন—‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’। আইয়ুব বাচ্চু নিজেই বহুবার বলেছেন, এই গানটিই ছিল তাঁর জীবনে প্রথমবার বাংলা গানে সুর করা ও গাওয়া—এক অর্থে তাঁর বাংলা ব্যান্ডযাত্রার সূচনাবিন্দু।

এলআরবির ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চু
ফাইল ছবি

এই সম্পর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে সোলস–এর দ্বিতীয় অ্যালবামের প্রস্তুতিকালে জঙ্গী আবারও আইয়ুব বাচ্চুর হাতে তুলে দেন একটি গুরুত্বপূর্ণ গান—‘প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত’। গানটি শুধু অ্যালবামের শক্ত স্তম্ভই হয়নি, বরং বাচ্চুর সুর–ভাবনার পরিণত রূপটিও সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক সংগীতবোদ্ধার মতে, এই সময় থেকেই আইয়ুব বাচ্চু একজন পূর্ণাঙ্গ বাংলা রক সুরকার হিসেবে নিজের জায়গা শক্ত করেন।

আরেকটি ঐতিহাসিক ‘প্রথম’-এর গল্প জড়িয়ে আছে পিলু খান–এর সঙ্গে। দীর্ঘদিন ব্যান্ড সংগীতে যুক্ত থাকলেও ১৯৮৭ সালে জঙ্গীর লেখা ‘আজ যে শিশু’ গানে সুর করার মধ্য দিয়েই পিলু খানের সুরকার হিসেবে একধরনের ‘সিগনেচার’ তৈরি হয়। এই গানটি ছিল তাঁর সুরে প্রথম বড় মাইলফলক—যেখানে কথার গভীরতা আর সুরের সংবেদনশীলতা একাকার হয়ে যায়। পরে রেনেসাঁ ব্যান্ডের কণ্ঠে গানটি প্রকাশ পেলে তা শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং সময়ের রাজনৈতিক–সামাজিক বাস্তবতার এক শক্ত দলিল হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পায়।

১৯৭৬ সালে বিটিভিতে
পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

এই তালিকায় আরও নাম আছে—পার্থ বড়ুয়াসহ আরও কয়েকজন শিল্পী, যাঁদের ক্যারিয়ারের শুরুর পর্বে প্রথম উল্লেখযোগ্য গান, প্রথম সুর বা প্রথম হিটের পেছনে নীরবে কাজ করেছেন জঙ্গী। কারও হাতে তুলে দিয়েছেন গান, কারও চিন্তায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন বাংলা ভাষার সাহস, আবার কারও পাশে থেকে দিয়েছেন মানসিক ভরসা। সে কারণেই বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান আলাদা—তিনি শুধু গানের কথাকার নন, বহু শিল্পীর যাত্রাপথের নেপথ্য প্রেরণা, তাঁদের ‘প্রথম’-এর নীরব সাক্ষী।

ঢাকা: কফিশপ, অ্যাডফার্ম, আর ‘ব্লুনাইল’-এর আড্ডা

ঢাকার জীবনে পা রাখার পর তাঁর সাংস্কৃতিক যাত্রা একেবারে নতুন মাত্রা পায়। ১৯৮৫ সালের দিকেই ব্যবসা ও গানের প্রয়োজনেই তাঁকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় থিতু হতে হয়। এর আগে চট্টগ্রামে তিনি যে কফিশপটি খুলেছিলেন—‘কফি ইন’—তা শহরের প্রথম দিককার কফিশপগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি পায়। সেখানে শুধু কফি নয়, জমে উঠত দীর্ঘ আড্ডা, গান আর তর্ক–বিতর্ক; অনেকটাই ইউরোপীয় কফিহাউস সংস্কৃতির আদলে, যা তখনকার চট্টগ্রামের জন্য ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। এই কফিশপ ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একধরনের অনানুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক বলয়।

এস এম সুলতানের সঙ্গে
পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

ঢাকায় এসে তিনি সেই অভিজ্ঞতারই বিস্তার ঘটান ভিন্নভাবে। বিজ্ঞাপনী সংস্থা (অ্যাডফার্ম) গড়ে তুলে পেশাগতভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও গভীর হয়। এই সময়েই এলিফ্যান্ট রোডের ব্লুনাইল হোটেল–এর সঙ্গে তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে যায়। ব্লুনাইল তখন কেবল একটি হোটেল ছিল না; এর রেস্টুরেন্ট, লবি আর আশপাশের অফিসঘর মিলিয়ে জায়গাটি হয়ে উঠেছিল শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের এক স্বাভাবিক মিলনকেন্দ্র—একধরনের “কমফোর্ট জোন”।

শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর নিজের বাছাই করা ১০ গান

১. আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে

সুর: পিলু খান

প্রথম শিল্পী: পিলু খান

ব্যান্ড: রেনেসাঁ

২. একদিন ঘুম ভাঙা শহরে

সুর: আইয়ুব বাচ্চু

প্রথম শিল্পী: আইয়ুব বাচ্চু

ব্যান্ড: এলআরবি

৩. হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়

সুর: নকীব খান

প্রথম শিল্পী: ফয়সাল সিদ্দিকী বগী

ব্যান্ড: রেনেসাঁ

৪. সময় যেন কাটে না

সুর: পিলু খান

প্রথম শিল্পী: সামিনা চৌধুরী

৫. চায়ের কাপে পরিচয়

সুর: পার্থ বড়ুয়া

প্রথম শিল্পী: নাসিম আলী খান

ব্যান্ড: সোলস

৬. আমি ভুলে যাই তুমি আমার নও

সুর: পার্থ বড়ুয়া

প্রথম শিল্পী: পার্থ বড়ুয়া

৭. হে বাংলাদেশ, তোমার বয়স হলো কত?

সুর: পিলু খান

প্রথম শিল্পী: পিলু খান

ব্যান্ড: রেনেসাঁ

৮. কোলাহল থেমে গেল

সুর: নাসিম আলী খান

প্রথম শিল্পী: নাসিম আলী খান

৯. তৃতীয় বিশ্ব

সুর: পিলু খান

প্রথম শিল্পী: পিলু খান

ব্যান্ড: রেনেসাঁ

১০. শুধুমাত্র তোমার জন্য

সুর: নকীব খান

প্রথম শিল্পী: কুমার বিশ্বজিৎ

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
ফেসবুক থেকে

এই ব্লুনাইলের আড্ডাতেই জন্ম নেয় বহু স্মরণীয় গান। নিয়মিত আড্ডায় বসে কথা বলতে বলতে, কফির কাপ হাতে নিয়েই অনেক সময় লেখা হতো গানের লাইন। সেখানেই নাসিম আলী খান–এর অনুরোধে তিনি লিখে দেন ‘যতীন স্যারের ক্লাসে’—যে গানটি পরে এক প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। গানটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; আশির দশকের শহুরে শিক্ষাজীবন আর ছাত্রসময়ের আবহকে ধরেছিল সহজ, কথ্য ভাষায়।


একইভাবে ব্লুনাইল–আড্ডা ঘিরেই তৈরি হয়েছে পার্থ বড়ুয়ার প্রথম দিককার হিট গানের গল্প। পার্থের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বড় ভাই–ছোট ভাইয়ের মতো—আড্ডায় গল্প, গান নিয়ে তর্ক, হঠাৎ কোনো লাইনে সুর বসানোর চেষ্টা। এই অনানুষ্ঠানিক পরিবেশেই পার্থ বড়ুয়ার সুরকার হিসেবে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, আর সেখান থেকে জন্ম নেয় এমন কিছু গান, যা পরে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের মূলধারায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
সব মিলিয়ে ব্লুনাইল ছিল কেবল একটি ঠিকানা নয়; ছিল আশির ও নব্বইয়ের দশকের ঢাকার ব্যান্ড–সংস্কৃতির এক জীবন্ত আর্কাইভ। কফিশপের অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞাপনী সংস্থার পেশাগত শৃঙ্খলা আর ব্লুনাইলের আড্ডা—এই তিনের সমন্বয়েই ঢাকায় তাঁর সৃজনশীল জীবনের ভিত শক্ত হয়, আর বাংলা ব্যান্ড সংগীত পায় তার বহু স্মরণীয় গান ও গল্প।

‘আজ যে শিশু’ ও ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’—দুটি গান, দুটি সময়
‘আজ যে শিশু’ গানটির জন্ম একেবারেই আরামদায়ক কোনো জায়গায় নয়; বরং একধরনের অস্বস্তি, অপরাধবোধ আর তাড়নার ভেতর থেকে। ঢাকা–চট্টগ্রাম ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াতের সময় স্টেশন আর আশপাশের ফুটপাথে শীতের রাতে পড়ে থাকা শিশুদের দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত। ট্রেন থামে, মানুষ নামে–ওঠে, আবার চলে যায়—কিন্তু প্ল্যাটফর্মের কোণে কাঁপতে থাকা শিশুগুলো সেখানেই থেকে যায়। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, “ওই দৃশ্যগুলো মাথা থেকে নামছিল না। না লেখা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিলাম না।” সেই তাড়না থেকেই লেখা হয় আজ যে শিশু—যে গানটি কেবল একটি সামাজিক বক্তব্য নয়, বরং শহুরে নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ চিৎকার।

গানটিতে সুর দেন পিলু খান, যা তাঁর সুরকার হিসেবে প্রথম বড় ও স্বতন্ত্র স্বাক্ষর হিসেবে ধরা হয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে রেনেসাঁ ব্যান্ডের কণ্ঠে গানটি প্রথম মঞ্চে পরিবেশিত হয়। ধীরে ধীরে এটি ব্যান্ড সংগীতের গণ্ডি ছাড়িয়ে একধরনের প্রজন্মগত স্মৃতিতে রূপ নেয়। রাজনৈতিক–সামাজিক বাস্তবতা বদলালেও গানটি তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি; বরং নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছেও বারবার ফিরে এসেছে—স্টেজে, ক্যাম্পাসে, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোতে।

অন্যদিকে একদিন ঘুম ভাঙা শহরে–এর জন্মকথা ঠিক উল্টো মেজাজের—তাড়াহুড়া, উত্তেজনা আর সৃষ্টিশীল ‘চাপ’-এর ভেতর দিয়ে। সোলস ব্যান্ডের হয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে রেকর্ডিংয়ের ঠিক আগে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে মাইক্রোবাসেই শুরু হয় গানের কথার কাজ। গাড়ির ভেতর বসেই লিরিক নিয়ে আলোচনা, কাটাছেঁড়া, লাইন বদল—এই ‘গবেষণা’ চলতে থাকে পুরো পথে। ঢাকায় ঢোকার সময় কথার কাঠামো প্রায় চূড়ান্ত। এরপর এলিফ্যান্ট রোডের ব্লুনাইল হোটেল–এ রাতভর বসে গানটিকে সম্পূর্ণ রূপ দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠন—‘সৈকতচারী’
পারিবারিক অ্যালবাম থেকে


গানটি প্রচারিত হওয়ার পরপরই সোলসের কণ্ঠে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু এখানেই এই গানের যাত্রা শেষ হয়নি। সোলস ছাড়ার পর আইয়ুব বাচ্চু গানটি নিজের জন্য ‘চেয়ে নেন’। ফলে গানটি জায়গা করে নেয় এলআরবি–এর প্রথম অ্যালবামের প্রথম গান হিসেবে। এক অর্থে, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ হয়ে ওঠে এলআরবি–যাত্রার সূচনাসংগীত—যে গান দিয়ে ব্যান্ডটি নিজের পরিচয় ঘোষণা করে।
এই দুই গান—একটি স্টেশনের ফুটপাতের শীতল বাস্তবতা থেকে উঠে আসা, আরেকটি মাইক্রোবাস আর রাতজাগা শহরের ভেতর জন্ম নেওয়া—দুটি ভিন্ন আবহ, কিন্তু দুটিই বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। একটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, অন্যটি শহরের ঘুম ভাঙার শব্দ শোনায়। বাকিটা, সত্যিই ইতিহাস।

সংখ্যার চেয়ে মান
গানের সংখ্যা নিয়ে তিনি নিজেই কখনো হিসাব রাখেননি। অনেক লেখা ছড়িয়ে আছে, কিছু হারিয়েও গেছে। খাতায় বন্দী করে রাখার অভ্যাস ছিল না; কেউ চাইলে কাগজে লিখে দিয়ে মনে করতেন দায়িত্ব শেষ। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল এক জায়গায়—গানের আসল বিচার হয় সময়ের ভেতর দিয়ে, তৎক্ষণাৎ নয়। তিন দশক পেরিয়ে আজও যখন ‘হৃদয় কাদামাটি’, ‘সময় যেন কাটে না’, ‘আমি ভুলে যাই তুমি আমার নও’, ‘যতিন স্যারের ক্লাসে’, ‘আজ যে শিশু’ কিংবা ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ আলাদা আলাদা মানুষের জীবনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তখনই তাঁর কাছে তা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

করোনাকালের পর তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় যুক্ত হয়—গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের নেতৃত্ব। সংগঠনটির প্রথম ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি গীতিকবিদের পেশাগত স্বীকৃতি, মর্যাদা ও সংহতির প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসেন। রাজনীতি ও আন্দোলনের দিন, শিক্ষকতা ও ব্যবসার জীবন, কফিশপ আর বিজ্ঞাপনী সংস্থার ব্যস্ততা—এই সব পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত যিনি বারবার ফিরে এসেছেন গানের কাছে। জন্মদিনে শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর জন্য শুভকামনা। তাঁর গান যেমন একটি যুগের সাক্ষ্য, তেমনি তাঁর জীবনও প্রমাণ করে—বাংলা গান কেবল বিনোদন নয়; অনেক সময় তা একটি সময়ের নথি, সাংস্কৃতিক ইতিহাস।