বাবা নেই, জন্মদিন কীভাবে কাটে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের

মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব (বামে), স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার (মাঝে) ও ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুবের (ডানে) সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুছবি : পরিবারের সৌজন্যে

আইয়ুব বাচ্চু নেই আট বছর। অথচ ১৬ আগস্ট এলেই তাঁর জন্মদিন ঘিরে পরিবারের নানা স্মৃতি এসে ভিড় করে। একসময় এই দিনে বাড়ি ভরে উঠত নানা আয়োজনে—কেক কাটা হতো, আর পছন্দের সব খাবার রান্না হতো। কাছের ও প্রিয় মানুষ আর আত্মীয়দের পদচারণ ও হইহুল্লোড়ে ভরে থাকত আইয়ুব বাচ্চুর বাড়ি। এখন সেই বাড়িতে নেই প্রিয় মানুষটি। তবু জন্মদিন এলে স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার, ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব ও মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব বাবার স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই দিনটি কাটান। কেকও কাটেন। তবে সেই কেক কাটার আনন্দের আড়ালে থাকে গভীর শূন্যতা আর চোখের পানি।

আইয়ুব বাচ্চু (১৬ আগস্ট ১৯৬২—১৮ অক্টোবর ২০১৮)
ছবি: খালেদ সরকার

ছেলে আহনাফ তাজওয়ার তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। মেয়ে ফাইরুজ সাফরা স্বামীর সঙ্গে থাকেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। আর আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার নির্দিষ্ট সময় বাংলাদেশে থাকেন। সময়-সুযোগ হলে ছেলে-মেয়ের কাছে গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আসেন। দূরদেশে থাকলেও ১৬ আগস্ট এলে তিনজনের মনেই ফিরে আসে একই মানুষ—‘বাবুই’, অর্থাৎ আইয়ুব বাচ্চু।

বেঁচে থাকতে নিজের জন্মদিনে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন আইয়ুব বাচ্চু। সন্তানেরা ছোট থাকতে বাড়িতেই হতো আয়োজন। কেক কাটা, পছন্দের খাবার রান্না—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠত আনন্দের।

আইয়ুব বাচ্চু ও তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার
ছবি : সংগৃহীত

সে সময়ের কথা মনে করে ফেরদৌস আক্তার বলেন, ‘সন্তানেরা যখন ছোট ছিল, তখন বাসায় বেশ আয়োজন করা হতো। কেক কাটা হতো। বাচ্চুর পছন্দের খাবার রান্না করা হতো। আস্তে আস্তে ছেলে-মেয়ে যখন বড় হতে থাকল, তখন স্টুডিও ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। তখন জন্মদিনের শুরুতে স্টুডিওতে বন্ধুবান্ধব ও গানের সহযাত্রীদের নিয়ে কেক কাটত। আনন্দ করত। হইচই, গানবাজনা হতো। বাসায় আমাদের জন্যও খাবার পাঠিয়ে দিত। বাসায়ও ছেলে-মেয়েরাও কেক নিয়ে রেডি থাকত।’

আইয়ুব বাচ্চু
ছবি: প্রথম আলো

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যায় জন্মদিনের সেই উচ্ছ্বাসও। ২০০০ সালে আইয়ুব বাচ্চুর মা মারা যাওয়ার পর জন্মদিন নিয়ে আগের মতো আর আনন্দ করতেন না আইয়ুব বাচ্চু। ফেরদৌস আক্তারের মতে, ‘আমার শাশুড়ি বেঁচে থাকা পর্যন্ত বাচ্চু জন্মদিনটা বেশ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্‌যাপন করত। পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজনও বাসায় আসত। ২০০০ সালে ক্যানসারে আমার শাশুড়ি মারা যান। মা-অন্তঃপ্রাণ বাচ্চু এরপর জন্মদিন নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখাত না। আনুষ্ঠানিকতার জন্য হয়তো কেক কাটত। চ্যানেল আইয়েও প্রায় জন্মদিনে আয়োজন থাকত।’

আইয়ুব বাচ্চু
ছবি: সংগৃহীত

সন্তানদের সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। ছেলে-মেয়ে দুজনকেই গিটার শিখিয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল, একদিন দুজন সন্তানকে নিয়ে একই মঞ্চে গিটার বাজাবেন। ছেলে তাজওয়ারকে বাবার সঙ্গে এক মঞ্চে গিটার বাজাতে দেখা গেলেও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি পূরণ হয়নি। মেয়েকে নিয়ে মঞ্চে ওঠা আর হয়ে ওঠেনি। বাবাকে ‘বাবুই’ বলে ডাকতেন সাফরা। বাবার মৃত্যুর পরও তাঁর কাছে আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু বিখ্যাত শিল্পী বা গিটার জাদুকর হিসেবে নয়, বরং ঘরের সেই মানুষ, যিনি হাতে গিটার তুলে নিয়ে মুহূর্তেই অন্য এক জগতে হারিয়ে যেতেন।

বাবা সম্পর্কে সাফরা বলেছিলেন, ‘বাবুইকে দেশ-বিদেশের মানুষ ভালোবাসত, এটা বুঝতাম। কিন্তু চলে যাওয়ার পর উপলব্ধি করলাম, তাকে কতটা বেশি ভালোবাসতেন তার ভক্তরা। বাসায় থাকলে বাবুইকে দেখতাম, ছোট্ট একটা গিটার নিয়ে জ্যামিং করতে করতে ভিন্নরকম একটা জোনে চলে যেত। অনেকবার বিভিন্ন মঞ্চেও তাকে দেখেছি, গিটার তাকে কীভাবে অন্য একটা জগতে নিয়ে যেত।’

আইয়ুব বাচ্চু
ছবি: প্রথম আলো

বাবার সেই গিটারপ্রেমই মেয়ের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সাফরা যখন ও লেভেলে পড়ে, তখন তাঁর জন্য একটি গিটার নিয়ে আসেন বাবা। সাফরার মতে, ‘বাবুই বলেছিল, তুমি আমার সঙ্গে স্টেজে একদিন বাজাবে।’ কিন্তু সেই ‘একদিন’ আর আসেনি।

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ৫৬ বছর বয়সে আইয়ুব বাচ্চু মারা যাওয়ার পর তাঁর সন্তানদের জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা যেন এটিই—বাবার সঙ্গে আর এক মঞ্চে দাঁড়ানো হলো না। সময় পেরিয়েছে, সন্তানেরা বড় হয়েছেন, নিজেদের সংসার গড়েছেন, দেশ ছেড়ে দূরদেশে বসতি গড়েছেন। কিন্তু বাবাকে ঘিরে তাঁদের স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই।

আইয়ুব বাচ্চু। ছবি : আনন্দ

জন্মদিন এলেও তাই সাফরা ও তাজওয়ার তাঁদের বাবাকে ভুলে থাকেন না; বরং এই দিনে বাবার কথা আরও বেশি মনে পড়ে। মা-সন্তান যখন কথা বলেন, পুরোনো গল্প উঠে আসে, তখন আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফেরদৌস আক্তার জানান, আজও ছেলে-মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় আইয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গ উঠলে চোখে পানি চলে আসে।

বাবা নেই, তাই বলে জন্মদিনে কেক কাটা বন্ধ হয়ে যায়নি। স্ত্রী-সন্তানেরা নিজেদের মতো করে কেক কাটেন। তবে সেই কেক কাটায় আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই। বাবাকে মনে করে কেক কাটার পর কারও চোখে পানি আসে, কেউ নীরবে স্মৃতিতে ডুবে থাকেন। এরপর আবার যে যাঁর জীবনে ফিরে যান। দূরদেশে থাকা সন্তানদের জীবনও চলতে থাকে, কিন্তু ১৬ আগস্ট তাঁদের কাছে থেকে যায় বাবাকে আরও একবার মনে করার দিন হয়ে।

আইয়ুব বাচ্চু
ছবি: সুমন ইউসুফ

এবারও আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করে প্রকাশিত হচ্ছে ‘উত্তরাধিকার’ শিরোনামের একটি অ্যালবাম। এতে তাঁর গাওয়া ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে গাইছেন দেশীয় ব্যান্ড ও একক শিল্পীরা। দলছুট গেয়েছে ‘রুপালি গিটার’, আরবোভাইরাস ‘নীল বেদনা’, সোনার বাংলা সার্কাস ‘গতকাল রাতে’, শুভযাত্রা ‘চলো বদলে যাই’, ক্যালিপসো ‘চাঁদ মামা’, রকসল্ট ‘অচেনা জীবন’, ডোপামিন ‘মাধবী’ এবং এ কে রাহুল ‘মন চাইলে মন’। একক শিল্পীদের কণ্ঠেও থাকছে তাঁর আরও জনপ্রিয় গান। সব কটি গানের মাস্টারিং করেছেন ইকবাল আসিফ জুয়েল। শিল্পী চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গান থামেনি। গিটার থামেনি। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর গান আবার ফিরছে। ভক্তদের ভালোবাসায় আজও তিনি বেঁচে আছেন। আর পরিবারের কাছে তিনি বেঁচে আছেন আরও ব্যক্তিগত এক স্মৃতিতে—‘বাবুই’ হয়ে।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্নগুলোকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয় গত বছরের ৯ জুলাই।