দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে কনসার্টের ভেন্যু

ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের একটি কনসার্টে গাইছে আর্টসেলছবি : আয়োজকদের সৌজন্যে

নাটক ও নৃত্যচর্চার জন্য ঢাকায় রয়েছে গাইড হাউস, মহিলা সমিতি, শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন, মহানগর নাট্যমঞ্চসহ বেশ কিছু নির্দিষ্ট জায়গা। সারা দেশেও শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন শাখায় নাটক ও নৃত্যচর্চার সুযোগ আছে। কিন্তু গানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মঞ্চ নেই। ফলে ইনডোর কিংবা ওপেন এয়ার কনসার্ট আয়োজন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভেন্যু–সংকটে পড়ছেন শিল্পী ও আয়োজকেরা। একটা সময় ঢাকার যেসব মাঠে নিয়মিত কনসার্ট হতো, সেগুলোর বেশির ভাগেই এখন আর সেই আয়োজন হয় না। নতুন কিছু জায়গায় কনসার্ট হলেও ভাড়া, নিরাপত্তা ও নানা শর্তের কারণে সেখানেও নিয়মিত আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পী ও আয়োজকেরা বলছেন, দেশে এখন এমন একটি নির্দিষ্ট কনসার্ট ভেন্যু প্রয়োজন, যেখানে সারা বছর কনসার্ট ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে।

ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের একটি কনসার্ট
ছবি : আয়োজকদের সৌজন্যে

একটা সময় কমলাপুর স্টেডিয়াম, আর্মি স্টেডিয়াম, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, মিরপুর শেরেবাংলা নগর স্টেডিয়াম, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব মাঠ, রাওয়া ক্লাব মাঠ, ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজ মাঠ ও কলাবাগান মাঠে নিয়মিত ওপেন এয়ার কনসার্ট হতো। এসব মাঠের বেশির ভাগেই এখন আর কনসার্ট হয় না। রাওয়া ক্লাব মাঠে তৈরি হয়েছে বহুতল ভবন। ঢাকার বাইরের পরিস্থিতিও খুব একটা ভিন্ন নয়। চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন জায়গায় একসময় বড় কনসার্ট হয়েছে। সেসব জায়গায়ও এখন নিয়মিত কনসার্ট আয়োজনের সুযোগ কমেছে।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর মঞ্চে আর্ক ব্যান্ডের হাসান
ছবি : প্রথম আলো

বছর দুয়েক আগেও ঢাকার ৩০০ ফুটসংলগ্ন বসুন্ধরা এক্সপো জোন এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরাতেও (আইসিসিবি) নিয়মিত কনসার্ট হয়েছে। তবে দুই বছর ধরে সেখানেও কনসার্টের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। পূর্বাচল ও কিং মাদানী অ্যাভিনিউর কিছু খোলা মাঠে কনসার্ট হলেও সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তিতে থাকেন না আয়োজকেরা।

মাইলস ব্যান্ডের সদস্য হামিন আহমেদ মনে করেন, মাঠে কনসার্ট বাংলাদেশের শিল্পীদের জন্য অনেকটা স্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘বামবা এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাও বলেছে। দেশের ৫৫ বছরে একটা ডেডিকেটেড কনসার্টের ভেন্যু নেই—এটা ভাবা যায় না। আমরা বলেছি, ঢাকা দিয়ে শুরুটা হোক। এরপর ছয়টি বিভাগে পর্যায়ক্রমে করা হোক।’

শুধু গানের জন্য মঞ্চ চান শিল্পীরা

ওয়ারফেজ ব্যান্ডের দলনেতা ও বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) সাধারণ সম্পাদক মনিরুল আলম টিপু বলেন, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ও আয়োজকদের আগ্রহ থাকলেও ভেন্যুর অভাবে অনেক সময় কনসার্ট আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তাঁর মতে, ‘পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান কিংবা আয়োজক ওপেন এয়ার কনসার্ট করতে চায়। অপ্রতুল ভেন্যুর কারণে আয়োজকেরা সব প্রস্তুতি নিয়েও এগোতে পারেন না।’
আশির দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে মেটাল ও হার্ড রকের যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তার অন্যতম পথিকৃৎ ওয়ারফেজ। চার দশকে দেশের আনাচকানাচে অনেক ওপেন এয়ার কনসার্ট করেছে দলটি। সে অভিজ্ঞতা থেকেই টিপু মনে করেন, সংগীতচর্চার জন্য স্থায়ী মঞ্চ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের পক্ষ থেকে বলতে চাই, শুধু গানের জন্যই একটি কিংবা দুটি মঞ্চ সব সময়ের জন্য থাকা উচিত। যেখানে শুধু গানবাজনা হবে। শ্রোতারা টিকিট কেটে গান শুনতে আসবেন। সংস্কৃতিচর্চা হবে।’

ঢাকায় আতিফ আসলামের কনসার্ট
ছবি : আয়োজক প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ থেকে

ভাড়া বেড়েছে, বেড়েছে খরচ

শিল্পী ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওপেন এয়ার কনসার্টের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মাঠ। কিন্তু সারা দেশে এসব মাঠের ভাড়া আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শুধু মাঠ ভাড়াই নয়, মঞ্চ, শব্দ, আলোকসজ্জা, জেনারেটর, নিরাপত্তা, শিল্পীদের পারিশ্রমিকসহ সব মিলিয়ে কনসার্ট আয়োজনের খরচও বেড়েছে। আগের মতো সাধারণ মানের মঞ্চ বানিয়ে এখন আর বড় কনসার্ট আয়োজন করা যায় না। দর্শকদের প্রত্যাশা ও অনুষ্ঠানের মান ধরে রাখতে আধুনিক মঞ্চ, শব্দ ও আলোকসজ্জায়ও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বড় ধরনের ওপেন এয়ার কনসার্ট আয়োজন এখন আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের পক্ষে নিয়মিত এমন আয়োজন করা কঠিন।

জেমস গাইছেন চাঁদপুর স্টেডিয়ামে।
ছবি : প্রথম আলো

বিভাগীয় শহরেও নেই নির্দিষ্ট ভেন্যু

কনসার্টের ভেন্যু–সংকট শুধু ঢাকায় নয়, দেশের অন্যান্য শহরেও রয়েছে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ট্রিপল টাইম কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রিতম দে বলেন, বেশির ভাগ কনসার্ট এখন ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ ঢাকার বাইরেও দেশের শিল্পীদের চাহিদা রয়েছে। পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোও শিল্পীদের নিয়ে বিভাগীয় শহরে কনসার্ট করতে চায়। কিন্তু নির্দিষ্ট ভেন্যু না থাকায় তা নিয়মিত করা সম্ভব হয় না। প্রিতম দে জানান, সব বিভাগীয় শহরে যদি একটি করে ইনডোর ও আউটডোর ভেন্যু থাকত, তাহলে নিয়মিত কনসার্ট আয়োজন করতে পারতেন।

ইভেন্ট আয়োজক, ব্যান্ড ও একক শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ থেকে ৭ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার ইনডোর ভেন্যু এবং ১০ থেকে ১৫ হাজার, এমনকি ২০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার আউটডোর ভেন্যু প্রয়োজন। এসব ভেন্যু থাকলে বছরজুড়ে কনসার্ট আয়োজনের সুযোগ তৈরি হবে।

ভেন্যু–সংকটের বিষয়টি নিয়ে বামবাও ভাবছে বলে জানিয়েছেন মনিরুল আলম টিপু। তাঁর মতে, ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও সংগীতের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকা প্রয়োজন। টিপু বলেন, ‘আমাদের দেশে ভেন্যুস্বল্পতা সব সময়ই ছিল। তারপরও আমরা কিছু খোলা মাঠে কনসার্ট করেছি। এখন তো ভেন্যু যাতে না পাওয়া যায়, ভাড়াও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সবাই অনাগ্রহী হই। এক্সপো জোন কনসার্টের জন্য একটা ভালো জায়গা ছিল, অনেক ইভেন্ট হয়েছে, কনসার্ট হয়েছে—সেটাও এখন দেওয়া হচ্ছে না। আইসিসিবির মিলনায়তনগুলো এখন করপোরেট ইভেন্ট, এক্সিবিশন ও মেলার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ইনডোরে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন ও ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারের মতো ভেন্যু আছে, কিন্তু সেগুলোর ভাড়াও বেশি। পাঁচ তারকা হোটেলও এ ধরনের আয়োজনে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না।’

টিপুর মতে, ভেন্যুর অভাবে শুধু কনসার্টই কমছে না, এর প্রভাব পড়ছে সংগীতচর্চা ও নতুন প্রজন্মের ওপরও। তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের কনসার্টে দেখে পরবর্তী প্রজন্ম উৎসাহী হবে। আমরা এমন অনেক মিউজিশিয়ানকে পাই, যারা বিভিন্ন কনসার্টে গিয়ে একসময় শিল্পী বা যন্ত্রশিল্পী হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। কেউ কারও গিটার বাদনে, কেউ গায়কিতে মুগ্ধ হয়ে তাদের মতো হতে চায়। এ রকম নজির অনেক আছে। সংস্কৃতির বিকাশ পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। ইন্ডাস্ট্রিও একটা জায়গায় আটকে থাকে, কখনো আবার পিছিয়ে যায়।’

বসুন্ধরা কনভেনশন সিটিতে কনসার্ট ‘বিগ রক ডে’তে গান করে আর্টসেল
ফাইল ছবি

এক্সপো জোনেও কনসার্ট বন্ধ

কনসার্ট আয়োজনের জন্য একসময় বসুন্ধরা এক্সপো জোন ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ভেন্যু। সেখানে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে বড় আয়োজন হয়েছে; কিন্তু এখন আর কনসার্ট হচ্ছে না। ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা সানজিদা শারমীন গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৫ থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের এখানে কোনো কনসার্ট হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এমনটা করা হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইসিসিবির একটি মিলনায়তনের ভাড়া সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। আর এক্সপো জোনের ভাড়া প্রতি বর্গফুট ৩৩ টাকা। জায়গাটির আয়তন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮০ বর্গফুট। পুরো জায়গাজুড়ে তাঁবু এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। এখন সেখানে কনসার্টের বদলে বিয়েসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। সানজিদা শারমীন জানান, তাঁর জানামতে এক্সপো জোনে সর্বশেষ কনসার্ট হয়েছিল বলিউডের গায়ক ও র্যাপার বাদশার। এরপর সেখানে আর কোনো কনসার্ট হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।

কী হতে পারে সমাধান

শিল্পী ও আয়োজকদের মতে, শুরুতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংগীতের জন্য নির্দিষ্ট ভেন্যু তৈরি করা যেতে পারে। পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও এমন ভেন্যু নির্মাণ করা প্রয়োজন। ভেন্যুগুলো শুধু কনসার্টের জন্য নয়, বছরজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের উপযোগী করে তৈরি করা যেতে পারে। হামিন আহমেদ বলেন, ‘ইনডোর স্টেডিয়ামে মানুষকে সংগীতের অসাধারণ অভিজ্ঞতা দিতে হলে পাঁচ হাজার ধারণক্ষমতার ইনডোর স্টেডিয়াম করতে হবে। আর আউটডোর স্টেডিয়াম ২০ হাজার মানুষ ধারণক্ষমতার হলে ভালো হয়। তখন গানের চর্চা বাড়বে। দেশের সংস্কৃতিও প্রসারিত হবে। তরুণ প্রজন্মের সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পেছনে এটা ভূমিকা রাখবে। ইনডোর ও আউটডোর—দুই ধরনের মঞ্চই দরকার।’
টিপুর প্রস্তাবও অনেকটা একই। তাঁর মতে, প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি বা দুটি স্থায়ী ইনডোর ভেন্যু থাকতে পারে, যার ধারণক্ষমতা হবে দুই হাজারের বেশি। সেখানে শুধু কনসার্ট নয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা থাকলে সারা বছর ভেন্যুগুলো সচল রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘শুধু কনসার্টের ভেন্যু শুরুতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম দিয়েই শুরু হতে পারে। এরপর অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও করা যেতে পারে। ইনডোর, আউটডোর বা মাল্টিপারপাস—যেকোনোভাবে হতে পারে। এখানে শুধু কনসার্ট নয়, লাভজনক করার জন্য নানান কিছু করা যেতে পারে। সারা বছর সচল রাখার মতো অনুষ্ঠান হলে শিল্প-সংস্কৃতিচর্চা বাড়বে। নতুন প্রজন্মও বেশ আগ্রহী হবে।’