ছায়ানটে রাগাশ্রয়ীর আশ্রয়ে নজরুল স্মরণ

অনুষ্ঠানের শুরুতে সমবেত পরিবেশনা ছবি সৌজন্য ছায়ানট
অনুষ্ঠানের শুরুতে সমবেত পরিবেশনা ছবি সৌজন্য ছায়ানট

বহুমুখী প্রতিভার কবি নজরুলকে গতকাল সন্ধ্যায় পাওয়া গেল রাগাশ্রয়ী সুরের আশ্রয়ে। কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণবার্ষিকীর আগের দিন গতকাল শুক্রবার ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবন মিলনায়তনে কবিকে জানানো হলো সুরের শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রচলিত ধারার বাইরে ভিন্নভাবে স্মরণ করা হয় জাতীয় কবিকে। মেলে ধরা হয় নজরুল রচনার দ্যুতিময় অধ্যায় রাগাশ্রয়ী গানের ডালি। পরিবেশিত হয় কবির অনন্য সৃষ্টির আলোময় রাগভিত্তিক গীতিআলেখ্য ‘যাম-যোজনায় কড়ি মধ্যম’।
অনুষ্ঠানটি সত্যিকার অর্থে ব্যতিক্রম এবং উপভোগ্য ছিল শ্রোতাদের কাছে। শ্রোতাদের সুবিধার্থে প্রতিটি পরিবেশনার আগে রাগের প্রকৃতি পাঠের পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয় রাগটির পরিচয়। উঠে আসে রাগসংগীত–বিষয়ক নজরুলের গবেষণাধর্মী বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিসম্ভার।
প্রহরভিত্তিক আটটি রাগের সঙ্গে পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়গুলো উচ্চারিত হয় সুর-তাল ও লয়ের সহযোগে। এই আটটি রাগের বিন্যাসেই নজরুলের অনবদ্য গীতি-আলেখ্যটি ১৯৪০ সালে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে সম্প্রচারিত হয় ‘যাম-যোজনায় কড়ি মধ্যম’ নামে।
যাম যোজনায় কড়ি মধ্যম রাগের পরিবেশনায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। সম্মেলক কণ্ঠে ছায়ানটের শিল্পীরা শোনান ‘পিউ পিউ বিরহী পাপিয়া বোলে’ গানটি। রাগটির পরিচয় তুলে ধরেন ছায়ানটের সংগীত শিক্ষক রেজোয়ান আলী। আর রাগটির বিবরণ মেলে ধরেন জয়ন্ত রায়। জানালেন, রাত্রি শেষ প্রহর ও দিবা প্রথম প্রহরের সন্ধি হচ্ছে এই ললিত রাগ।
দ্বিতীয় পরিবেশনায় তিন শিল্পীর একক কণ্ঠে উচ্চারিত হয় রাগ টৌড়ি। এ পর্যায়ে মোহিত খান শোনান ‘জাগো জাগো খোলো গো আঁখি’। তানভীর আহমেদ শোনান ‘তোমার আকাশে উঠেছিনু চাঁদ’। শ্রাবন্তী ধর পরিবেশিত গানের শিরোনাম ছিল ‘নয়ন মুদিল কুমুদিনী হায়’। রাগটির পরিচয় তুলে ধরেন ছায়ানটের সংগীত শিক্ষক অসিত দে। আর রাগের প্রকৃতি পাঠে সুমনা বিশ্বাস বলেন, দিবা প্রথম প্রহর ও দিবা দ্বিতীয় প্রহরের সন্ধি হিসেবে এই রাগটি নির্বাচন করেছিলেন নজরুল। দ্বিতীয় প্রহর ও দিবা তৃতীয় প্রহরের সন্ধি হিসেবে গৌড় সারং নামের রাগের আশ্রয়ে উপস্থাপিত হয় তৃতীয় পরিবেশনাটি। সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয় ‘ভবনে আসিল অতিথি সুদূর’। একক কণ্ঠে জারিফ ইকরাম পরিবেশন করেন ‘ভুলিতে পারিনে তাই’। জয়ন্ত রায়ের বিবরণে রাগটির পরিচয় তুলে ধরেন রেজোয়ান আলী। চতুর্থ পরিবেশনায় ছিল দিবা তৃতীয় ও চতুর্থ প্রহরে সন্ধি রাগ মুলতানি। নবনীতা চক্রবর্তী গেয়ে শোনান ‘বাঁশরী বাজে মুলতানী সুরে’ এবং ধ্রুব সরকারের কণ্ঠে গীত হয় ‘ভারত শ্মশান হ’ল মা’। সুমনা বিশ্বাসের পাঠে রাগ পরিচয় উপস্থাপন করেন অসিত দে।
দিবাভাগের শেষ প্রহর এবং রাত্রি প্রথম প্রহরের সন্ধি রাগ পূরবীর আশ্রয়ে শুক্লা পাল সেতু পরিবেশন করেন ‘কে তুমি দূরের সাথি’। জয়ন্ত রায়ের পাঠে রাগ পরিচয় উপস্থাপন করেন রেজোয়ান আলী। রাগ ছায়ানটে সম্মেলক গানের সঙ্গে ছিল তিন শিল্পীর একক পরিবেশনা। বৃন্দ কণ্ঠে গীত হয় ‘দোলা লাগিল দখিনার বনে বনে’। কানিজা হুসনা গেয়ে শোনান ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়’। মনীষ সরকার পরিবেশন করেন ‘রিনিকি ঝিনিকি ঝিনি রিনি’ এবং ঐশ্বর্য সমাদ্দার ‘বনে বনে দোলা লাগে’। সুমনা বিশ্বাসের পাঠে রাগ-পরিচয় উপস্থাপন করেন অসিত দে। রাত্রি দ্বিতীয় ও তৃতীয় সন্ধি রাগ বেহাগের আশ্রয়ে পরিবেশিত হয় ‘কেন দিলে এ কাঁটা’, ‘রে অবোধ শূন্য শুধু’, ‘নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে’ ও ‘নাইবা পেলাম আমার গলায়’ শিরোনামের গানগুলো। গেয়ে শোনান মির্জা বুশরা , অভিজিৎ কণ্ডু, অর্পিতা সরকার ও আফসানা রুনা। রাত্রি তৃতীয় ও চতুর্থ প্রহরের সন্ধি রাগ পরজে গান শোনান সুপ্তিকা মণ্ডল। তাঁর কণ্ঠে গীত ‘পর জনমে দেখা হবে প্রিয়’।
ঐতিহ্য অনুযায়ী সম্মেলক জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে শেষ নজরুলকে স্মরণের এ সংগীতানুষ্ঠান।