রাষ্ট্রের রোষানলে পড়া স্বামী-স্ত্রীর অন্য রকম সংগ্রামের গল্প
বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রিমিয়ার হয় ‘ইয়েলো লেটারস’ সিনেমা। গোল্ডেন বার্লিন বেয়ার জয়ী এই সিনেমার গল্পে কী আছে? সিনেমাটির গল্প শুরু হয় এক অন্তরঙ্গ পারিবারিক গল্প হিসেবে। কিন্তু পারিবারিক সেই গল্পটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর রাজনৈতিক ও মানসিক সংকটের কাহিনিতে। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন ইলকার চাতাক।
সিনেমার শুরুতেই এক থিয়েটারের অন্ধকার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডেরিয়া। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী ওজগু নামাল। দেশ, অস্তিত্ব আর নীরব চিৎকারের ভাষা হয়ে ওঠে ডেরিয়া। একটি শব্দহীন আর্তনাদ যেন ঘোষণা করে, কিছু রাজনৈতিক আবহে কবিতাও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ডেরিয়া ও তার স্বামী আজিজ; এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তানসু বিচের। ডেরিয়া ও আজিজ দুজনেই থিয়েটারকর্মী। একই সঙ্গে আজিজ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বই, ক্রিপ্ট আর স্বপ্নে ভরা তাঁদের উষ্ণ সংসার। সেই সাজানো সংসার হঠাৎই ভেঙে পড়ে এক ঘটনার পর।
মঞ্চের বলা সংলাপের আড়ালে তুরস্কের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেমন চাকরিচ্যুতি, আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ—রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে না; বরং ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে। এই দমবন্ধ বাস্তবতায় ডেরিয়া মর্যাদা ধরে রাখতে লড়ে যায়, আর আজিজ মানিয়ে নিতে চায়—দুজনেই ক্লান্ত, নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব হয়ে ওঠে গল্পের হৃদয়।
রাজনৈতিক চেতনা যখন কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে তখন মানুষের মাঝে ভয় বাড়ে। এই দম্পতির কিশোরী মেয়ে এজগির মধ্যে সেই চিত্র দেখতে পাই। সে এমন এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা ভয় নিয়ে বড় হচ্ছে। সিনেমাটি দেখায়—রাজনৈতিক দমননীতি শুধু আজকে আঘাত করে না, আগামীকেও গড়ে দেয়।
চিত্রগ্রাহক জুডিথ কাউফম্যানের ক্যামেরা ঘর, দরজা, জানালা ও বিভাজনের ভেতর চরিত্রদের বন্দিত্ব দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। শেষ দৃশ্যে মঞ্চে আজিজের নগ্ন হয়ে দাঁড়ানো—অপমান, প্রতিবাদ, ভাঙন ও মুক্তির একসঙ্গে বহিঃপ্রকাশ। শরীরই যেন শেষ সত্য, যা রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না।
‘ইয়েলো লেটারস’ ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনীতিকে একসূত্রে গাঁথা এক শক্তিশালী চলচ্চিত্র, যা মনে করিয়ে দেয় প্রকাশের স্বাধীনতা ভঙ্গুর হলেও পরিবার ও মর্যাদার বন্ধন কখনো কখনো সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। সিনেমার পরিচালক ইলকার চাতাকের হাত ধরে ২২ বছর পরে তুরস্কে গেল বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা ছবি। এর আগে ফতে আকিনের ‘হেড অন’ সিনেমাটি গোল্ডেন বার্লিন বেয়ার পুরস্কার জয় করে।
সিনেমার চিত্রনাট্যে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আয়দা মেরিয়েম চাতাক ও এনিস কোস্টেপেন। সিনেমাটি এ বছর শেষের দিকে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে।
ভিউ অব দ্য আর্টস অবলম্বনে।