জুবিনের পর রাহুলের পানিতে মৃত্যু, ভাইরাল সেই গান
একটি গান কখনো শুধু গান থাকে না, তা হয়ে ওঠে সময়ের দলিল, এক প্রজন্মের আবেগের ভাষা। বাণিজ্যিক সিনেমার ‘পিয়া রে’ গানটি তেমনই একটি বলে মনে করেন অনেকে। সেই গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুই শিল্পী—রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ও জুবিন গর্গ, এখন দুজনেই নেই। তাঁদের অনুপস্থিতি যেন নতুন করে ফিরিয়ে আনছে ২০০৮ সালের সেই সময়, যখন একটি গান পুরো বাংলায় আবেগের ঢেউ তুলেছিল।
২৯ মার্চ দিঘার তালসারি সৈকতে শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে যান রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। জানা গেছে, ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। শুটিং চলাকালে কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে এক ইয়ট পার্টিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মারা যান জুবিন গর্গ। তিনি সেখানে নর্থ ইস্ট ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। শুরুতে তাঁর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ২৫ মার্চ সিঙ্গাপুর পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে আদালত তাঁর মৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ বলেই নিশ্চিত করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন এবং লাইফ জ্যাকেট পরেননি। যদিও এ বিষয়ে আসাম পুলিশ তাদের নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
দুই শিল্পীর মৃত্যুর মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও ঘটনাপ্রবাহে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল—দুজনকেই কেড়ে নিয়েছে সমুদ্র। এই সমাপতনই নতুন করে আলোচনায় এনেছে তাঁদের একসঙ্গে তৈরি করা স্মরণীয় কাজ ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর ‘পিয়া রে’ গানটি।
২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল। বড় তারকার বাইরে গিয়ে একটি সরল প্রেমের গল্প দিয়েই দর্শকের মন জয় করেছিলেন নির্মাতারা। মফস্সলের এক সাধারণ তরুণ ‘কৃষ্ণ’ চরিত্রে রাহুলের সংযত অভিনয়, চোখের ভাষা ও স্বাভাবিক উপস্থিতি দর্শকের কাছে চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলে।
গানটির আবেগকে গভীরতা দেয় জুবিন গর্গের কণ্ঠ। বলিউডে ‘ইয়া আলি’ গানের মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও বাংলা দর্শকের কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান ‘পিয়া রে’ দিয়েই। গানটির কথা লিখেছেন প্রিয় চট্টোপাধ্যায়, সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।
সে সময় সিঙ্গেল স্ক্রিনের দর্শকসংস্কৃতিতে গানটি বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। দুর্গাপূজার মণ্ডপ থেকে চায়ের দোকান—সব জায়গায় শোনা যেত ‘পিয়া রে’। কৈশোরের প্রেম, অপূর্ণতা আর আবেগ—সবকিছুরই একধরনের প্রতীক হয়ে ওঠে গানটি।
জুবিনের মৃত্যুর পর একাধিক সাক্ষাৎকারে রাহুল তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পিয়া রে’ গানটি তাঁদের পরিচিতি এনে দেয় এবং দীর্ঘ সময় দর্শকের কাছে তাঁদের একসঙ্গে স্মরণীয় করে রাখে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও দর্শকের অনুরোধে গানটি গাইতে হতো তাঁকে।
পরে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাহুল জানান, গানটির শুটিংয়ের সময় তাঁরা জানতেন না এটি এত বড় জনপ্রিয়তা পাবে। পরবর্তী সময়ে গানটি যুক্ত হওয়ার পর ছবির আবেগ আরও গভীর হয় এবং দর্শকের মধ্যে আলাদা প্রভাব ফেলে।
সময়ের সঙ্গে বাংলা সিনেমার ধারা বদলেছে, এসেছে নতুন প্রজন্ম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। তবু ‘পিয়া রে’ গানটি এখনো সমানভাবে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে। এই গানের মাধ্যমেই অনেক দর্শক আজও রাহুলকে মনে রাখেন।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় টলিউডে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী ও ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে জুবিন গর্গের মৃত্যুর রেশও এখনো কাটেনি তাঁর ভক্তদের মধ্যে।
দুই শিল্পীর এই পরপর মৃত্যু ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁদের কাজ, বিশেষ করে ‘পিয়া রে’ গানটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে স্মৃতিচারণা করছেন, ভাগ করে নিচ্ছেন সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, আবেগ।