‘বক্স অফিস বা টিকিট বিক্রি নিয়ে মৃণালদাকে মাথা ঘামাতে দেখিনি’

মৃণাল সেন। ছবি: আইএমডিবি

‘খুব কম মানুষ রয়েছেন, যাঁরা বলবেন, ভুল করতে করতে শেখো। সেখানে ব্যতিক্রম একজন ছিলেন মৃণাল সেন। তিনি সব সময় বলতেন, “ভুল করে শেখো। অল্প টাকায় ছবি করো। তা হলে নিজের মনের মতো কাজ করতে পারবে।” আমার জীবনে মৃণালদা ছিলেন তেমনই একজন, যার কাছ থেকে বহু কিছু শিখেছি। ভুল করতে করতে শেখা, কম বাজেটেও যে ছবি তৈরি করা সম্ভব, সেটাও মৃণালদার থেকেই শেখা।’ এক সিনেমার আড্ডায় বলেছিলেন অঞ্জন দত্ত। তাঁরা ছিলেন গুরু-শিষ্য। সেই গুরুর আজ জন্মদিন। মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুরে।

সিনেমার দর্শক, সমালোচকদের বহু সিনেমা দিয়ে ভাবিয়েছেন চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। কিন্তু কখনোই কি তাঁর জীবন সেই অর্থে সামনে এসেছে, ভাবিয়েছে দর্শক বা সমালোচকদের? গুণী এই চলচ্চিত্র নির্মাতার জীবনীভিত্তিক কাজ খুব একটা নেই। তবে এই পরিচালককে নিয়ে আলোচিত কাজের একটি ছিল ‘চালচিত্র এখন’। সিনেমার মৃণাল সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেন অঞ্জন দত্ত। তিনিই সিনেমাটি পরিচালনা করেন। কাছ থেকে গুরুকে কীভাবে দেখেছিলেন, সেটাই তুলে ধরেন সিনেমায়। প্রশংসিত হয় সিনেমাটি।

মৃণাল সেন। ছবি: আইএমডিবি

দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন মৃণাল সেনকে। অঞ্জন দত্তের কথায় নানাভাবে উঠে এসেছে গুরুর কথা। ২০২৪ সালে ‘চালচিত্র এখন’ সিনেমাটি দেখানো হয় ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সিনেমাটির বাংলাদেশ প্রিমিয়ারের পর পরিচালক অঞ্জন দত্ত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

মৃণাল সেনকে সম্পর্কে প্রথম আলোর এক প্রশ্নে অঞ্জন দত্ত বলেছিলেন, ‘আমি গান লিখেছি, সিনেমা বানিয়েছি, নাটক করেছি; কিন্তু মৃণাল সেন কখনোই কাজে আসেনি, অর্থাৎ আমার কাজে রিফ্লেক্ট হয়নি। কিন্তু তিনি এমন একজন মানুষ, তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে, দূর থেকেও চিনেছি। কাউকে দূর থেকে না চিনলে কোনো কাজ করা উচিত নয়। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে আমি চিনি। একসময় আমার ভেতর থেকে মনে হলো, গুরুকে নিয়ে কিছু না করলে অন্যায় হবে।’

অঞ্জন দত্ত ও মৃণাল সেন। ছবি: আইএমডিবি

শুরু থেকেই তাঁদের মধ্যে মতভিন্নতা ছিল। তারপরও তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সিনেমায় সেসব দ্বন্দ্বও তুলে ধরেছেন। মৃণাল সেন সম্পর্কে অঞ্জন দত্ত বলেছিলেন, ‘আমি গল্পটা একটা সময়ের মধ্যে আবদ্ধ রেখে দিতে চাইছি না। আমি অনেক কিছুই করেছি, যেটা নিজের মতো করে নির্মাণ না করলে আমাকে করতে দেওয়া হতো না। আমি মৃণাল সেনকে পুজো করিনি এই সিনেমায়। একটা মানুষ হিসেবে দেখিয়েছি। তিনি কতটুকু মজার মানুষ, তাঁর জীবনযাপন কেমন ছিল, তাঁর অভ্যাস—খুঁটিনাটি বিষয়গুলো উঠিয়ে এনেছি। এসবই আমার কাছ থেকে দেখা।’

কোনো সিনেমা বানানোর আগে মৃণাল সেন কখনোই সিনেমার আয় নিয়ে ভাবতেন না; বরং নতুনত্ব নিয়ে ভাবতেন, আলাদা কৌশল নিয়ে ভাবতেন। এই নিয়ে অঞ্জন দত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কোনো দিনও বক্স অফিস বা টিকিট বিক্রি নিয়ে মৃণালদাকে মাথা ঘামাতে দেখিনি। তাঁর কাজের ধারা বা কৌশলটিও আজকের দিনে বিরল, অভাব অনুভব করি। আমি নিজেও সেইভাবেই কাজ করার চেষ্টা করি। জানি না, তাতে সফল হয়েছি কি না। তিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এখন এ ধরনের “অনুপ্রেরণা”র বড় অভাব।’

আরও পড়ুন
মৃণাল সেন। ছবি: আইএমডিবি

মৃণাল সেন ভারতের চলচ্চিত্রের সেরা সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর পরিচালিত বেশ কয়েকটি ছবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। কান, ভেনিস, বার্লিন, মস্কো, শিকাগো, মন্ট্রিয়ল, কায়রোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ছবি পুরস্কৃত হয়েছে। তিনি বাংলা ছাড়াও হিন্দি, ওডিশি ও তেলেগু ভাষায় ছবি করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এসে দাঁড়িয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে।

মৃণাল সেন পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘ভুবন সোম’, ‘মৃগয়া’, ‘কোরাস’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘কলকাতা-৭১ ’, ‘খারিজ’, ‘পদাতিক’, ‘আমার ভুবন’, ‘পুনশ্চ’, ‘আকাশ কুসুম’, ‘অন্তরীণ’, ‘পরশুরাম’, ‘খণ্ডহর’, ‘একদিন প্রতিদিন’। মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুরে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ওই শহরেই। ১৯৪৩ সালে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে পড়ার সময় তিনি চলে আসেন কলকাতায়।