আকাশ থেকে নেমে এল ছোট্ট একটা প্লেন…সেদিন কাছ থেকে দেখা সুচিত্রার বিদায়
সে বছর কলকাতায় শীত ছিল রেকর্ড ছোঁয়া। ২০১৪ সালের জানুয়ারি। ভোরের দিকে রাস্তায় মানুষ কম, দোকানের শাটার উঠত দেরিতে, ট্রামলাইনের ওপর কুয়াশা জমে থাকত। কিন্তু মিন্টো পার্কের সামনে ছবিটা ছিল একেবারেই আলাদা। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের ধারে ছোট্ট অথচ নামী হাসপাতাল—বেল ভিউ—তার সামনে যেন প্রতিদিন তৈরি হচ্ছিল আরেকটি কলকাতা।
সাধারণ মানুষ, সংবাদকর্মী, ক্যামেরা, ট্রাইপড—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জমায়েত। সবাই জানত ভেতরে কে আছেন। নামটা উচ্চারণ না করেও সবাই বলত—‘দিদি’। এমনকি সংবাদকর্মীরাও। কেউ কেউ আবার বলতেন ‘মিজ সেন’, কেউ ‘ম্যাডাম সুচিত্রা’।
দিনের পর দিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে। হাসপাতালের দরজা খুলে কোনো নার্স বেরোলেই চোখগুলো একসঙ্গে তাঁর দিকে ঘুরে যেত। প্রশ্ন একটাই, ‘এখন কেমন আছেন দিদি?’ কখনো সংক্ষিপ্ত উত্তর মিলত, কখনো মিলত না কিছুই। সেই না–পাওয়া উত্তরই ছিল সবচেয়ে ভারী।
২৬ দিনের লড়াই
হাসপাতালে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই অনুসরণ করছিলাম। ভেতরের খবর পাওয়া সহজ ছিল না। স্থানীয় এক বন্ধুর সূত্রে এক নার্সের সঙ্গে পরিচয় হয়। নানার বাড়ি খুলনায়, মায়ের মুখে বাংলাদেশের গল্প—এই সূত্রেই একটু ভাব জমেছিল। শর্ত একটাই—পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। চাকরি যাবে। প্রতিদিন হাসপাতালের অন্য একটি ভবনের ক্যানটিনে কথা হতো।
তাঁর মুখে শুনেছি ভেতরের কড়াকড়ির গল্প। সুচিত্রা সেনের ইচ্ছাতেই তাঁর পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা তিনজন নার্সের ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। পরিচিত মুখ ছাড়া অন্য কাউকে দেখলে তিনি বিরক্ত হতেন। অনেক সময় চিকিৎসা নিতেও চাইতেন না।
শেষ ২৬টি দিন হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ যেন এক নামেই শ্বাস নিচ্ছিল—সুচিত্রা সেন। কার্ডিওলজি, পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার—সবাই জানত, এটা কেবল চিকিৎসা নয়; এটা এক ইতিহাসকে ধরে রাখার লড়াই। বাড়িয়ে বলছি না—সবার দৌড়ঝাঁপ, দৃষ্টি আর উৎকণ্ঠা দেখলেই তা বোঝা যেত।
সবারই নিজস্ব কিছু সূত্র ছিল। তবে সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল মেডিক্যাল বুলেটিন। দিনে একাধিকবার নিয়ম করে হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হতো শারীরিক অবস্থা। টেলিভিশনের লাইভ রিপোর্টে কখনো শোনা যেত ‘স্থিতিশীল’, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘আশঙ্কাজনক’। এই দ্বন্দ্বই শহরের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
খেয়াল করেছিলাম—চ্যানেল আর পত্রিকার রিপোর্টার ও ভিডিও টিম নিজেদের জায়গা নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। কাজের চাপে অনেকের অবস্থা যেন তাঁবু গেড়ে থাকার মতো। কেউ কেউ বলেছিলেন, ৭২ ঘণ্টা ঘুমাননি—কিছুটা বাড়িয়ে বলা হলেও ক্লান্তির ছাপ ছিল চোখেমুখে। কেউ গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন, কেউ হাসপাতালের পাশের ছোট্ট পার্কে।
সংবাদকর্মীদের মধ্যেও তখন একধরনের নীরব সমঝোতা তৈরি হয়েছিল—এটা আর শুধু সংবাদ নয়।
১৭ জানুয়ারির সকাল
সেদিন শুক্রবার। সকাল সাতটার দিকেই গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করে—অবস্থা আবার খারাপ। আগের দিন খবর ছিল, শরীর একটু ভালো। এমনকি বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিও চলছিল। ভোরের দিকে হঠাৎ সংকট। হাসপাতালের ভেতর থেকে নানা রকম খবর আসছিল। লাইভ সম্প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল মিডিয়া। অন্য এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আত্মীয়কে বুঝিয়ে আমিও প্রস্তুত ছিলাম। অথচ মনে হচ্ছিল, কেউই প্রস্তুত নই। সুচিত্রা যেন মারা যেতে পারেন না!
একসময় শোনা গেল, পালস রেট একদম কমে গেছে। শহরের ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন—তাহলে কি শেষ?
সকাল আটটার কিছু পর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তারি ভাষায়—ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। ভেতরে তখন মেয়ে মুনমুন মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ডেকে যাচ্ছেন, ‘মা, মা’। নাতনি রাইমার কান্না থামছে না। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে চলে গেলেন সুচিত্রা সেন।
হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে জানানো হয়—শেষকৃত্য হবে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে।
কথা বলতে বলতে মুখ্যমন্ত্রী নিজেও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই কান্না মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ব্যথাতুর হৃদয়ের নিভৃত রক্তক্ষরণে বৃদ্ধ, যুবক, এমনকি কিশোর-কিশোরীকেও দেখা গেল চোখ মুছতে। সবারই এক অনুরোধ—‘একবার দেখতে চাই দিদিকে।’ কিন্তু সে অনুরোধ রাখা হয়নি যুক্তিসংগত কারণেই।
হাসপাতালের একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম—এক তরুণ হঠাৎ গেয়ে উঠলেন,
‘আরও কিছুটা সময় না রহিতে…’
কেওড়াতলার পথে
মিন্টো পার্কের রাস্তা সকাল থেকেই নিয়ন্ত্রিত ছিল। লাল–নীল আলো জ্বালিয়ে একের পর এক গাড়ি এসে থামছিল। সাইরেনের শব্দ কনকনে শীতের বাতাস চিরে দিচ্ছিল, যেন শহর নিজেই জানিয়ে দিচ্ছে—আজ কিছু একটার জন্য থেমে আছে কলকাতা।
বেলুর মঠ থেকে আসা তিন সন্ন্যাসী সুচিত্রার গলায় পরিয়ে দেন শ্রীরামকৃষ্ণের প্রসাদি মালা। সেই মুহূর্তে হাসপাতাল চত্বরে নেমে আসে একধরনের স্তব্ধতা—কেউ কথা বলছে না, অনেকের চোখে পানি। শববাহী গাড়িতে তোলার আগে কেবিনেই পরানো হয় শেষযাত্রার পোশাক—সাদা বেনারসি, তার ওপর সোনালি গরদের চাদর। মাথায় ঘোমটা। কফিন বন্ধ। ফুলে ঢাকা। গাড়ি এগোতেই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নীরবে হাতজোড় করছিলেন। কেউ ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন গাড়ির দিকে, কেউ ফোঁপাচ্ছিলেন নিঃশব্দে।
ভিড়ের মধ্যেই ভেসে আসছিল চাপা স্বর, ‘আর এমন কাউকে পাব কি আমরা?’ ‘এই তো আমাদের শৈশব…।’
শ্মশানের কাছে একজনকে দেখলাম টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ছোটবেলার ছড়া আওড়াচ্ছেন,
‘আকাশ থেকে নেমে এলো ছোট্ট একটা প্লেন/ সেই প্লেন এ বসে ছিল লাল টুকটুক মেম/ মেমকে আমি জিজ্ঞেস করলাম/ হোয়াট ইজ ইওর নেইম/ মেম বলল, মাই নেইম ইজ সুচিত্রা সেন…।’
সেদিন এমন কত আবেগ, কত স্মৃতির ঝাঁপি যে খুলে গিয়েছিল, তার হিসাব নেই।
নিয়ম রক্ষার জন্য মিনিট কয়েক বালিগঞ্জের বাড়িতে। সেখানেও মানুষের ঢল। বারান্দা, গেট, গলির মুখ—সবখানেই দাঁড়িয়ে থাকা চোখ। তারপর ধীরে ধীরে শববাহী গাড়ি রওনা দেয় কেওড়াতলার পথে। রাস্তাজুড়ে যেন এক নিঃশব্দ শোকযাত্রা—কোথাও স্লোগান নেই, কোথাও উচ্চস্বরে কান্না নয়, শুধু চাপা দীর্ঘশ্বাস আর চোখের পানি।
বেলা ১টা ৪০ মিনিটে মুনমুনের হাতে মুখাগ্নি। আগুন জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ শোনা যায়। কেউ চোখ ঢেকে ফেলেন, কেউ তাকিয়েই থাকেন—বিশ্বাস করতে চান না, এত বড় এক অধ্যায়ের এমন পরিসমাপ্তি হতে পারে। চার ঘণ্টা পরে বাবুঘাটে গঙ্গায় চিতাভস্ম বিসর্জন দেওয়া হয়।
শ্মশানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে তখন কোনো কথা ছিল না। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছিলেন না। যেন কৈশোর, যৌবন, ভালোবাসা আর স্মৃতির একটা বড় অংশ—সব একসঙ্গে শেষ হয়ে গেল কলকাতার শীতের সেই বিকেলে।
চলে যাওয়ার পরের কলকাতা
১৮ জানুয়ারি, শনিবার। এক রাতেই শহরের রং বদলে গেল। আগের দিনের শোক যেন ঘুম ভেঙে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। কলকাতার আগ্রহ তখন একজনকেই ঘিরে—সুচিত্রা সেন। তাঁর বাড়ি। তাঁর ফেলে যাওয়া নীরবতা।
পাড়া-মহল্লা, ক্লাব, চায়ের দোকান—সবখানেই সাদাকালো প্রতিকৃতি। ছবির নিচে ফুল, কোথাও কোথাও ছোট প্রদীপ জ্বলছে। কেউ থেমে থেমে ছবি দেখছেন, কেউ নীরবে হাতজোড় করছেন। মনে হচ্ছিল, শহর যেন নিজের মতো করেই শোক পালন করছে—কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
নিউমার্কেটের পানের দোকানেও সেদিন বদল। যে দোকানে বছরের পর বছর মোহাম্মদ রফির গান বাজত, সেখানে ভেসে আসছে সুচিত্রার ঠোঁটে স্থান পাওয়া সিনেমার গান। ভিডিও–সিডির দোকানগুলোতে হঠাৎ করেই পুরোনো ছবির খোঁজ বেড়ে যায়—‘সপ্তপদী আছে?’ ‘হারানো সুর?’ দোকানিরা অবাক হয়ে বলছিলেন, এত বছর পর আবার এসব ছবির চাহিদা!
খালপাড় হয়ে বেলেঘাটার রাস্তা ধরে যেতে যেতে দেখেছি—একটার পর একটা দোকানে বাজছে সুচিত্রার সিনেমার গান। দেয়ালে ঝোলানো ছবি, ছবির গলায় মালা। কোথাও ফুল শুকিয়ে আসছে, কোথাও নতুন ফুল যোগ হচ্ছে। শহরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, কলকাতা যেন নিজেই তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মৃত্যুর পরের কয়েক দিন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ‘বেদান্ত’ নামের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল এক সংবাদের কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পরিচিতদের প্রবেশও ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গেটের সামনে সারাক্ষণ পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীরা। ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না—সুচিত্রার জীবনের মতোই তাঁর মৃত্যুর পরের পরিসরেও ছিল সেই চেনা গোপনীয়তা।
কিন্তু বাইরে থামছিল না মানুষের ঢল। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গলির মুখে ভিড়। কেউ এসেছেন দূর পাড়া থেকে, কেউ পাশের এলাকা থেকে। হাতে ফুল—গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা। কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ চুপচাপ ফুল রেখে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই বলছিলেন, ‘ভেতরে ঢুকতে চাই না, শুধু জানাতে এসেছি—আমরা ভুলিনি।’
সংবাদকর্মীদেরও যেন অস্থায়ী আস্তানা হয়ে উঠেছিল সেই গলি। ক্যামেরা নামিয়ে রেখে আড্ডা, কফির কাপে ধোঁয়া, পুরোনো সুচিত্রা–উত্তমের গল্প—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ। অথচ কড়াকড়িও ছিল। ভেতরের কোনো খবর নেই, কোনো ছবি নেই। শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখ, চোখ আর নীরবতা।
জীবনে যাঁর কাছে ফুল পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব—প্রহরীদের কড়া পাহারায় আটকে যেত সব—মৃত্যুর পর সেই ফুলই পৌঁছে যাচ্ছিল তাঁর ঘরের কাছাকাছি। ঢুকতে না পারলেও, ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল বাড়ির বাইরের দেয়াল, গেট আর রাস্তা।
দিনগুলো আলাদা ছিল
পেশাগত জীবনে অনেক বড় মানুষের শেষবিদায় দেখেছি। বহু শোকযাত্রা কভার করেছি। শোক সংবাদ লিখেছি, স্মরণসভা, শ্রদ্ধাঞ্জলি—সবই করেছি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। কিন্তু সুচিত্রা সেনের চলে যাওয়ার দিনগুলো আলাদা ছিল। কারণ, তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্মৃতির নাম, এক অধ্যায়। তিনি ছিলেন এমন এক নস্টালজিয়া, যাকে মানুষ নিজের কৈশোর, যৌবন আর প্রথম ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে। সুচিত্রা সেন মানে শুধু সিনেমার পর্দা নয়। তিনি মানে ক্লান্ত দুপুরে টেপ রেকর্ডারে ভেসে আসা গান, সাদাকালো ছবির আলোছায়া, মা–খালার গল্পে শোনা নায়িকার নাম, আর শহরের কোনো এক কোণে হঠাৎ ফিরে পাওয়া হারানো সময়, আকাশ থেকে নেমে আসা মেম। তাঁর চলে যাওয়া মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়—একটা যুগের নিঃশব্দ বিদায়।
১৭ জানুয়ারি ২০১৪—সেদিন কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন ‘হারানো সুর’-এর রমা, ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউন, ‘সাত পাকে বাঁধা’র অর্চনা। ফিরে এসেছিলেন বলেই শহর বুঝেছিল—তিনি আসলে কোথাও যাননি। এত দিন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও, তাঁর উপস্থিতি কখনো ফুরোয়নি মানুষের স্মৃতি থেকে।
সুচিত্রা ছিলেন, আবার সুচিত্রা অথচ ছিলেন না। আর হয়তো সেই না–থাকাটাই সুচিত্রা সেনের সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।