‘তোর মৃত্যু অনেক কিছু শিখিয়ে গেল’, রাহুলের উদ্দেশে স্বস্তিকা

[প্রয়াত অভিনয়শিল্পী রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন অভিনয়শিল্পী স্বস্তিকা মুখার্জি। ফেসবুকে পোস্ট করা স্বস্তিকার চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।]

মনে না করতে চাইলেও ফেসবুক মনে করিয়েই দেয়। অন্য সময় হলে এক গাল হেসে ছবিটা তোকে পাঠাতাম।

কত স্মৃতি। কপাল দেখ, শত ইচ্ছা থাকলেও একসঙ্গে আর কাজ করা হলো না।
তোর সঙ্গে শেষ কথা কয়েক সপ্তাহ আগে, আমি অরুণাচল যাচ্ছিলাম, ফিরে এসে সহজ কথায় যাব। তুই এর মধ্যে ‘বিবি পায়রা’ ছবিটা দেখে নিবি, সেই নিয়ে গল্প হবে, আরও কত কিছু। তুই এর আগেও কয়েকবার ফোন করেছিলি, অন্য বিষয়ে, গজগজ করতে যখন ফোন করতিস, সেগুলোই ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের।

আমি প্রত্যেকবার অন্য শহরে ছিলাম, ফিরে এসে সহজ কথায় যাব, তারপর তোর-আমার কাজের ব্যস্ততা সামলে যাওয়ার তারিখ, পেছতেই থাকল। কিন্তু এইবারটা তো পাকাপাকি হয়ে গেছিল ভাই। তুইও আউটডোর থেকে ফিরবি, আমিও, তারপর জমিয়ে আড্ডা হবে। জীবন নিয়ে, যাপন নিয়ে, কাজ নিয়ে, এমনি-কিছু না নিয়েও।

খবরটা পেয়ে অবধি বারবার একই কথা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, বারবার মেয়েকে বলছি, বড্ড দেরি হয়ে গেল। আর তো কোনো দিন কথা হবে না, দেখা হবে না, কাজ করা হবে না।

আরও পড়ুন

আজকাল সবই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ভাই, তুই একটা সোজা শিরদাঁড়া নিয়ে মহাপ্রস্থানে গেলি এটাই শিক্ষণীয়, বিস্ময়করও বটে। লোকে একটা আস্ত মেরুদণ্ড নিয়ে হাঁটতে–চলতে পারছে না, তুই কিনা স্বগ্গে চলে গেলি! তোর মৃত্যু অনেক কিছু শিখিয়ে গেল, জীবনের কিছু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহস জোগাল। কাজ পাই, না পাই, সেগুলোতে অনড় থাকব, থাকবই।

অরুণোদয়—এইভাবে অস্ত না গেলেও পারতিস। আহা গো। যার গেল তার গেল। বাবা সর্বক্ষণ বলত, আমাদের প্রফেশন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি রুথলেস। কেউ কারও নয়, কারও দায় নেই, কিছু হলে কেউ দায়িত্ব নেবে না, নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। তোর চলে যাওয়ার দায় দেখ কেউ নিল না, তোর ওপরেই দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তুই তো আর নিজের হয়ে লড়তে পারবি না, এটাই ওদের কাছে তুরুপের তাস। মায়া নেই, দুঃখ নেই, আহা নেই, দায়বদ্ধতা নেই, কাজের নিয়ম নিয়ে কৈফিয়ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, আসলে বোধটাই নেই। আমরা সবাই রিপ্লেসেবল। তোর চলে যাওয়া বাবার বলে যাওয়া কথাগুলোয়ে সিলমোহর বসাল।

এই ছবিটা আমাদের একসঙ্গে করা একটা কাজ—টেক ওয়ান–এর। সালটা বোধ করি ২০১৪, মনে আছে কারণ মা তার পরের বছর একই সময়ে চলে গেছিল। জীবনময় শুধু তারিখ।

মানি এই একটাই কাজ আমার সঙ্গে করেছিল বলে এতকাল এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল। এবার থেকে এক পাহাড় সমান বিষাদের কারণ হয়ে তুই যোগ দিলি।
মার্চ মাসটার তাৎপর্যটাই বদলে গেল।

আরও পড়ুন

১১ তারিখ বাবা, ২৯ তারিখ তুই।

এভাবে তুইও আরেকটা তারিখ হয়ে যাবি স্বপ্নেও ভাবিনি। অবশ্য তুই বলেছিলি, জন্মদিনের মতন আমাদের মৃত্যুদিনটাও বছরের কোনো একটা দিনেই লুকিয়ে আছে, হঠাৎ করে ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে গোল হয়ে সে বিশেষ পদে উত্তীর্ণ হবে।

তুই পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে আকাশে মিশে গেলি, আমি এখনো মেনে নেওয়ার যুদ্ধ চালাচ্ছি। সময় লাগবে। অনেকটা সময় লাগবে। সহজ হবে না রে।

‘যাও রে অনন্তধামে মোহ মায়া পাশরি
দুঃখ আঁধার যেথা কিছুই নাহি।
জরা নাহি, মরণ নাহি, শোক নাহি যে লোকে,
কেবলি আনন্দস্রোত চলিছে প্রবাহী!’

বন্ধু আমার, বিদায়।