কিছুটা সময় নিয়ে দিলারা জামান বলতে থাকেন, ‘ওর ক্যানসার ধরা পড়ল। কেমো দিয়ে সুস্থও হলো। অসুস্থতার পর থেকে ও কিছুটা ভেঙে পড়েছিল। মানসিকভাবে ড্রিপেশনে ছিল। আমাদের নিয়মিত কথা হতো। বুধবার হবে, আমাকে ফোন দিয়ে বলে, “বুবু, ঈদের সময়টা আমি আর তুমি একটু ঘুরব। রাস্তা খালি থাকবে, নিজেদের মতো কিছুটা সময় কাটাব। আমার কিছু ভালো লাগে না।” আমি তাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করি। ওর মেয়ে আমাকে ফোন দিয়ে বলে, “আম্মা শুধু শৈশবের কথাগুলো মনে করছে। বারবার অতীতের দিনগুলোর কথা মনে করছে। মা একা বোধ করছে।”

default-image

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাঁকে বলি, আমরা সময় করে ঘুরতে যাব, ওর মন ভালো হবে। এভাবে অনেকবার ঘুরেছি। কিন্তু এবার যে ঘোরা হবে না, কে জানত। শেষ সময়টা হাসপাতালেও থাকতে চাননি। বোনটা আমার হাসপাতালে যাওয়া–আসার মধ্যেই মারা গেল।’

উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে থাকেন দিলারা জামান। অন্যদিকে, ৯ নম্বরে থাকতেন শর্মিলী আহমেদ। শুধু বন্ধুত্বের কারণেই এই পাশাপাশি থাকাটা। দুটি সত্তা হলেও তাঁরা ছিলেন এক আত্মা। দুই পরিবারের খাবার ভাগাভাগি করা দীর্ঘদিনে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সম্পর্কটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কোনো বাসায় আলুভর্তা বানালেও সেটা পৌঁছে যেত অন্য বাসায়। প্রায় প্রতিদিন তাঁদের মধ্যে খাবার লেনদেন হতো। কে কী কিনবেন, সেটাও কারও অজানা থাকত না। এই সম্পর্ক করোনা বাধা মানাতে পারেনি। করোনার পুরো সময়েই দুই পরিবারের নিয়মিত খাবার দেওয়া–নেওয়া চলত। দিলারা জামান কিসের আচার, কী পছন্দ করেন, সেগুলো নিয়মিত সারপ্রাইজ দিতেন শর্মিলী আহমেদ। দিলারা জামান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসার পর আমি গাড়ি নিইনি। আমি কোথায় যাব, সব সময় সেখানো পৌঁছে দিত শর্মিলী। বোনটা আমার চেয়ে কত ছোট। সে–ই আমার আগে চলে গেল। কত কথা ছিল বলার, এখন মনে হচ্ছে কিছুই বলা হলো না। সে এভাবে হঠাৎ চলে যাবে ভাবতেই পারিনি। আমাকে সঙ্গে দেওয়ার আর কেউ রইল না।’

default-image

‘ঈদের কয়েক দিন আগে, শর্মিলীর ফোন। তখন সুস্থ ছিল। আমাকে বলল, আপা, এবার কোরবানি দেব না। চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে। আমি বললাম, দিয়ো না। তোমার ইচ্ছা। অনেক দিন ধরেই আমরা একসঙ্গে কোরবানি দিই। পরে ওর মেয়ে বলল, কোরবানি দেবে। ঈদ নিয়ে আমাদের কত কথা হয়। কিছুক্ষণ পরপর ফোন দিয়ে বলবে, আপা, তুমি কী করছ, কী খাচ্ছ, তোমার জন্য এই পাঠিয়ে দিলাম। কী খেতে ইচ্ছা করছে। আমার প্রতি ওর খুবই মায়া ছিল। ওরা সব বোনই আমাকে নিজের বড় বোন মনে করত। আমার নিয়মিত কথা বলার মানুষটি চলে গেল,’ বলেন দিলারা জামান।

১৯৮৩ সালের দিকের কথা। তখন শর্মিলী আহমেদের মায়ের সঙ্গে বিটিভিতে পরিচয় হয় দিলারা জামানের। প্রথম দেখা থেকেই তিনি দিলারা জামানকে খুবই পছন্দ করতেন। তাঁদের প্রায়ই দেখা হতো। শর্মিলী আহমেদের মা তখন থেকেই তাঁর সন্তানদের বলে দেন, ‘সে তোমাদের আরেকটা বোন।’ তার পর থেকে একটু একটু করে বাড়তে থাকা সম্পর্ক এখন পরিবারে রূপ নিয়েছে। একাধিকবার তাঁরা দেশের বাইরেও ঘুরতে গিয়েছেন। ‘আমরা ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর টানা ১২ দিন একসঙ্গে ছিলাম। সময়টা যেন আমার জীবনের সেরা সময়। তখন কত কথা হয়েছে, সেই দিনগুলোর কথাই গতকাল থেকে বারবার মনে পড়ছে। গত বছরও ঘুরতে গেলাম হালুয়াঘাট। কোথাও যেতে চাইলে আমাকে আগে বলত। আমার মনটা কখনো খারাপ থাকলে ওকেই ফোন দিতাম। আমি আর কথা বলতে পারছি না, তুমি লিখে দিয়ো,’ কথাগুলো বলতে বলতে কাঁদতে থাকলেন দিলারা জামান।

default-image

শর্মিলী আহমেদের বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দুই মাস আগে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। মৃত্যুর আগে শর্মিলী আহমেদেকে ২৮টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। গতকাল সকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি মারা যান। প্রায় ৪০০ নাটক ও ১৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন শর্মিলী আহমেদ। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী। পরবর্তীকালে ছোট পর্দার মা, দাদি কিংবা ভাবির চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকমনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

টেলিভিশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন