ঋত্বিক বাবু শুধু বললেন, তোমারে লাগবো, কালকে। থাকো। রাতে থাকতে হবে। আমাদের নিয়ে আরিচায় পদ্মার পাড়ে একটা কাঠের হোটেলের দোতলায় রাখার ব্যবস্থা হলো। সহকারী পরিচালক তখন ফখরুল হাসান বৈরাগী, সে আবার আমার খুব ভালো পরিচিত আগে থেকে, বুয়েটে পড়ার সময় থেকে। সে আবার আমাকে বলল, থেকে যান। পটায়ে পটায়ে রেখে দিলো আমাদের। আমি জীবনে কোনো দিন ভুলব না, নিচে ছারপোকা, ওপরে মশা। সারা রাত আমরা তিনজন জেগে আছি আরকি। কাকে বলব, কী বলব। থাকলাম কষ্ট করে। পরদিন সকাল থেকে রেডি হয়ে বসে আছি। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বসে আছি। সন্ধ্যাবেলায় বলল, আজকেও হবে না। তুমি আগামী সপ্তাহে আসো। আগামী সপ্তাহে আবার গেলাম। সারা দিন বসে আছি। সন্ধ্যাবেলায় কাঁচুমাচু করে দাদা বললেন, আজকেও তো পারলাম না। আরেক দিন আইতে অইবো। আমি বললাম, ঋত্বিকদা, আই অ্যাম সরি। আমার বোধ হয় এই ছবিতে আর অভিনয় করা হবে না। কারণ, আমি আর ছুটি পাব না। তিনি বললেন, আরে হবে হবে। আসো আসো। চলে গেলাম মন খারাপ করে। আরেক দিন গেলাম আবার।

default-image

সেদিন আমাকে সকাল থেকে বসিয়ে রেখে দুপুরবেলা কানে কানে এসে ঋত্বিকবাবু বললেন, আমি খুব দুঃখিত, রোজীর শরীরটা খারাপ। আইজকা পারব না। তখন আমি বললাম, বারবার এভাবে ক্যাজুয়াল লিভ নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় দাদা। দাদা একটু চিন্তা করে বললেন, আইচ্ছা বসো। দেখি। এরপর রোজীর কাছে গেলেন। আলাপ করলেন। এসো বললেন, আইচ্চা চলো, তোমারটাই কইরা দিব আইজকা। এই দাঁড়ালাম ক্যামেরার সামনে। বেবী ইসলাম ক্যামেরাম্যান। ঋত্বিকদা ডিরেক্টর। আমার কো-অ্যাক্টর হলেন রোজী, খায়ের ভাই আর রানী সরকার।

default-image

দৃশ্যটা হচ্ছে, রোজী ঘাট থেকে পানি নিয়ে আসছেন। আমি বাবুমশাই, জমিদারের বখাটে লোক। ‘ঘরে নাই ননদিনী, ঘরে নাই শাশুড়ি’—এ ধরনের একটা গান গাইতে গাইতে তার পিছে পিছে আসছি, তাকে উত্ত্যক্ত করার জন্য। রোজীর ঘরের সামনে যখন এলাম, তিনি কলস রেখে আমার গলা চেপে ধরেন। বলেন, আয়, আমার ঘরে আয়। ঘরে শাশুড়িও নাই, ননদিনীও নাই। আয়। আমি তো তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এই দৃশ্যটাই আমার প্রথম সিনেমার শুটিং। এবং মারাত্মক একটা দৃশ্য। রোজীর চরিত্রটিও ছিল খুব প্রতিবাদী নারীর। গরিব, কিন্তু প্রচণ্ড প্রতিবাদী। সিনটা আমরা এক শটেই ওকে করলাম। সবাই খুব হাততালি দিল। বলল, ফার্স্টক্লাস দৃশ্য হলো। কিন্তু আমি তো সাংঘাতিক ঝাঁকি খেলাম। কারণ, রোজীর শক্তিও ছিল। আমি দেখলাম, সিন শেষ হওয়ার পর আমার পাঞ্জাবি ছিঁড়ে সামনের ঝুলছে। বুকে দেখি রক্ত। নখের আঁচড়ে ছিঁড়ে গেছে আরকি। পাশে ছিলেন ঋত্বিকদা, বললাম, দাদা দেখেছেন অবস্থা আমার। তিনি শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শক্তিশালী অভিনেত্রী তো। (হাসি)। এই হলো আমার ঋত্বিক বাবুর সাথে প্রথম দিনের শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা। পরে আরও তিন থেকে চার দিন শুটিং করেছিলাম অবশ্য।

default-image

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রে অভিনয় আমার জীবনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। এ ছবির শুটিংয়ে সবচেয়ে ভালো লাগত, ভোরবেলা আর্টিস্টরা সবাই যেতাম একসঙ্গে। তখন তো মাইক্রোবাস ছিল না, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে আরিচা পর্যন্ত সার্ভিস ছিল। বড় বড় সিডান গাড়ি ছিল, ওই গাড়িতে যেতাম সবাই। যে কদিন গিয়েছি, প্রায় সঙ্গী হিসেবে পেয়েছি মুস্তাফা ভাইকে। তাঁর সঙ্গে যাওয়া মানে কত কী যে জানা। তিনি তো অত্যন্ত পণ্ডিত ব্যক্তি। কত বিষয়ে যে আলাপ করতেন। সেটি ছিল আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। মুস্তাফা ভাইয়ের সঙ্গে এমনিতে ১৯৬৮ সাল থেকে পরিচয় ছিল, মঞ্চে একসঙ্গে ‘রক্তকরবী’ করার সুবাদে। সে হিসেবে আমার ভীষণ আপনও ছিলেন। জীবনে প্রথম সিনেমায় অভিনয় করা, তার ওপরও আবার ঋত্বিক ঘটক! সেই সময়ে আবার এই সিনেমার শুটিং করতে করতে আরেকটা সিনেমার প্রস্তাবও পেলাম, সেটা হলো ‘পালঙ্ক’। তখন আমি ব্যস্ত হয়ে উঠছিলাম আরকি, একাধারে মঞ্চ, টেলিভিশন, রেডিও, সিনেমা আর অফিস তো ছিলই। সত্যি বলতে, ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করাটা, সারা জীবন মনে রাখার মতো স্মৃতি।

অনুলিখন : মনজুর কাদের

টেলিভিশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন