শুধু স্কুলের বই পড়ে মানুষ বড় হয়নি, হতে পারে না: আফজাল হোসেন
‘শুধু স্কুলের বই পড়ে মানুষ বড় হয়নি, হতে পারে না’—বলেছেন অভিনেতা, পরিচালক ও চিত্রকর আফজাল হোসেন। তাঁর অভিনীত ও পরিচালিত শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘ছোটকাকু’কে ঘিরে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’-এর উদ্বোধনী দিনে এ কথা বলেন তিনি। আজ সোমবার ঢাকার গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি কনভেনশনে শুরু হয়েছে এই আয়োজন। উৎসব চলবে কাল মঙ্গলবারও।
‘ছোটকাকু’ বইয়ের পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দায় এসেছে ১৫ বছর আগে। চরিত্রটির স্রষ্টা ফরিদুর রেজা সাগর। বইয়ের ছোটকাকুকে পর্দায় প্রাণ দিয়েছেন আফজাল হোসেন। দীর্ঘদিনের এই পথচলার পর এবার চরিত্রটিকে ঘিরে প্রথমবারের মতো এমন আয়োজন করা হয়েছে। দুই দিনের উৎসবে শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছে তাদের পরিবারও।
উৎসবের প্রথম দিন সকালে ঢাকার কয়েকটি স্কুলের শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আনন্দ র্যালির মধ্য দিয়ে আয়োজন শুরু হয়। র্যালিতে আফজাল হোসেনও অংশ নেন। পরে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী আয়োজন। এতে উপস্থিত ছিলেন ‘ছোটকাকু’র লেখক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
উৎসবের আয়োজন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বই পড়ার গুরুত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকে যাঁরা এখানে (আলোকি মিলনায়তনে) প্রবেশ করবেন, এখানে যে বিষয়গুলো দেখবেন চারদিকে, সবই বইকেন্দ্রিক। বই নিয়ে এখন আমরা কথা বলি? আমরা বলি না। কিন্তু বই আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পড়া আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু স্কুলের বই পড়ে মানুষ বড় হয়নি, হতে পারে না। তাহলে পৃথিবীতে অসংখ্য লেখক জন্ম নিতেন না, পৃথিবীতে অসংখ্য বইঘর থাকত না। বইঘরে বাচ্চা থেকে বুড়োরা সবাই ভিড় করে সারা দিন কাটাত না।’
বই পড়ার সঙ্গে একটি দেশ ও দেশের মানুষের মেধা–মননের উন্নয়ন এবং অগ্রগতির সম্পর্কের কথাও বলেন আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বইয়ের কাছে মানুষ যত আসবে, সেই দেশ, সেই মানুষ তত উন্নত হবে। আমরা অনুভব করেছি, পড়ার ওপর জোর দেওয়া দরকার।’
তাহলে ‘ছোটকাকু’ কেন—এই প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দেন তিনি। আফজাল বলেন, ‘হয়তো অনেকে বলবেন, তাহলে ছোটকাকু কেন? আমরা তো ছোটকাকুকে একটা আন্দোলন হিসেবেই শুরু করেছি। একটা অভিযানের মধ্য দিয়ে, একটা রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে মানুষকে দেশপ্রেমের কথা বলব, মানুষকে বুদ্ধিমত্তার কথা বলব, মানুষকে কৌতূহলী হওয়ার কথা বলব।’
শিশুদের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মনে যখন প্রশ্ন জাগবে, একটা শিশুর মনে যখন প্রশ্ন জাগবে, তখন কেবল সে উত্তর পাবেই। যে উত্তর খোঁজে না, সে আসলে কখনো উত্তর পাবে না। আর পুরো জীবনটাই কিন্তু প্রশ্ন আর উত্তরের। সেই প্রশ্ন আর উত্তরের জন্যই ছোটকাকু উৎসব।’
উৎসবে থাকা বিভিন্ন প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য নিয়েও কথা বলেন আফজাল। তিনি বলেন, ‘দুই দিনব্যাপী এখানে অনেক খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। সেই খেলায় অনেক পুরস্কার আছে। কিন্তু এই খেলা কি শুধুই খেলা, শুধুই উপভোগের জন্য? না, এটা নিজেকে পরীক্ষা করার একটা কেন্দ্র। আমার কতটুকু সাহস আছে, আমার মাথায় কতটুকু বুদ্ধি আছে। আমি কতটুকু পারি, আরেকজনের তুলনায় আমি কতটা এগিয়ে—এই প্রতিযোগিতাগুলো আছে।’
তবে প্রতিযোগিতাকে জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখানে হেরে যাওয়া নেই, আছে আনন্দ। আনন্দ নিয়ে এখানে আসা, নতুন আনন্দের সঙ্গে এখানে সাক্ষাৎ এবং আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরে যাওয়া।’
উৎসবের আয়োজন নিয়ে নিজের অনুভূতি জানিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, ‘এখানে ছোটরা হচ্ছে মূল দর্শক, যাঁরা উপভোগ করতে এসেছেন এই উৎসব। যদিও এটা শুধু ছোটদের জন্য, এটা ছোট-বড় সবার উৎসব। আমরা বলছি, এটা নতুন অভিজ্ঞতার উৎসব। যে অভিজ্ঞতা আমরা দাবি করতে পারি, আগে হয়নি।’
শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে প্রথম দিনের আয়োজন নিয়ে সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেন আফজাল। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ভালো লাগছে। আজকের আয়োজনে আমরা আশা করেছিলাম, স্কুল থেকে বাচ্চারা আসবে, শিক্ষকেরা আসবেন, অভিভাবকেরা আসবেন—তাঁরা এসেছেন। তাঁদের আসাতে উৎসব উৎসবমুখর হয়েছে। অনেক ছোট বাচ্চা এসেছে, ওরা ওদের মতো উপভোগ করুক।’
উৎসবের মূল মঞ্চে প্রথম দিন সকালের সেশনে উপস্থিত ছিলেন ফরিদুর রেজা সাগর, আফজাল হোসেন, মাজহারুল ইসলাম, কোনাল, সীমান্ত ও উপস্থাপক সামান্থা শারমীন। উপস্থাপক ছাড়া অন্যরা কোনো না কোনোভাবে ‘ছোটকাকু’র বই বা নাটকের সঙ্গে যুক্ত।
‘ছোটকাকু’র যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’ বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে। শুরু থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরকে গল্পের পটভূমি করার পরিকল্পনা ছিল। এখন পর্যন্ত চরিত্রটিকে নিয়ে ৪৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি বইয়ের গল্পে বাংলাদেশের ৪৫টি জেলা উঠে এসেছে।
এর আগে শনিবার চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুই দিনের এই উৎসবের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর আলোকি কনভেনশন হলে আয়োজিত উৎসবে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, পুরস্কার, আড্ডা, আলোচনা ও বিনোদনমূলক আয়োজন। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি পুরো পরিবার নিয়ে এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।