‘তাঁরা যদি জেলে থাকেন তাঁদের সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে’
ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি অভিনেতা আজাদ আবুল কালাম মনে করেন, শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে শিল্পী পরিচয়টাই আসল। এমনকি রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও শিল্পী হিসেবে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। শিল্পী পরিচয়ে তাঁদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। গতকাল অভিনয়শিল্পী সংঘের কার্যনির্বাহী পর্ষদের এক বছর পূর্তি ও সংগঠনটির ওয়েবসাইট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
শিল্পী সংঘের এই নেতা শুরুতেই বলেন, ‘একটি বড় আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থানের পরে এই কমিটি গঠিত হয়েছিল। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন। আমরা একটা ভীষণ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। ধীরে ধীরে সেই অনিশ্চয়তা থেকে আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষার গণতন্ত্রের দিকে দেশ যাত্রা করছে মাত্র।’
যাঁরা অভিনয় করেন সব অভিনয়শিল্পীকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একসঙ্গে দুঃখ–বেদনা ভাগাভাগি করে নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘আজকের এই মিলিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের একটি বড় আকাঙ্ক্ষার জায়গা ছিল, একই ছায়ায় আমরা সবাই যাতে থাকতে পারি, একসঙ্গে কাজ করতে পারি। কে বড় পর্দার, কে ছোট পর্দার, কে ইউটিউবার, কে কোথায়, তা বিবেচ্য বিষয় নয়। আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে আমাদের দুঃখ–বেদনার কথা যেন বলতে পারি।’
অভিনয়শিল্পীদের পেশার স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ রয়েছে। ‘আমরা অভিনয় করি কিন্তু আমাদের শিল্পীদের কোনো স্বীকৃতি নেই। আপনি যদি ব্যাংকে যান অথবা পাসপোর্ট করতে যান, সেখানে কোথাও অভিনয়শিল্পী লেখার সুযোগ নেই। আপনাকে লিখতে হবে আর্টিস্ট মানে আমরা আসলে স্বীকৃত কোনো পেশার অংশীদারি নই। এটি যেমন একদিকে বেদনার অন্যদিকে আমাদের প্রতি রাষ্ট্রের অবজ্ঞা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সোচ্চার হতে হয়েছে বারবারই। আমরা কি স্বীকৃতি না পাওয়া পেশাজীবী? এটি আমাদের সবার প্রশ্ন হওয়া উচিত। আমি মনে করি, একধরনের আন্দোলনের দিকেও আমাদের যাওয়া উচিত, যেন আমরা পেশার স্বীকৃতি পাই।’
এ ছাড়া দিন দিন অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। অনেক অভিনয়শিল্পী যোগ্যতা থাকলেও নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না। সেই চিত্র তুলে ধরে এই সভাপতি তাঁর বক্তব্য বলেন, ‘আমাদের ১০০ জনের মধ্যে আটজন অভিনয়শিল্পী শুধু অভিনয়ে নির্ভর করে বেঁচে আছেন। অন্যরা দুর্বিষহ বা কখনো কখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে।’
উপস্থিত সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে যাঁরা উপস্থিত আছি, আপনাদের কাছে একটি অনুরোধ, সবাই শুধু নিজের দিকে না তাকিয়ে চারপাশে একটু তাকাই এবং সত্যিকার অর্থে দেখার চেষ্টা করি যে তিনিও অভিনেতা অথবা অভিনেত্রী। নিজেরাই একত্র থাকার অর্থ হচ্ছে পাশের অভিনেতার দিকে ভালো করে একটু তাকানো। তাঁকে কীভাবে আপনি সহযোগিতা করতে পারেন, সেই পথ আমাদেরই খুঁজে নিতে হবে। এটি একটি মানবিক দিক, যেই দিকটার প্রতি আমি আপনাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ এভাবে আমরা সবাই ভালো থাকার চেষ্টা করতে পারি।’ অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে তিনি জানান, আয়োজনে এসেও তাঁকে সহকর্মীদের কাছ থেকে নিয়মিত কাজ পাইয়ে দেওয়ার আকুতি শুনতে হয়েছে।
কোনো শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড় তাঁর অভিনয়শিল্পীর পরিচয়। তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটি নিশ্চয় অনস্বীকার্য বিষয় যে অভিনয়শিল্পীরা যাঁরা আছেন তাঁরা কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, কি ছিলেন না, তার চেয়ে আমাদের কাছে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তিনি অভিনয় করতেন। এই পরিচয় আমাদের তুলে ধরতে হবে। এই পরিচয় যাঁদের আছে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এটি একেবারে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি, তাঁরা যদি জেলে থাকেন তাঁদের সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে। তাঁদের প্রতি আমাদের ভরসার হাত বাড়াতে হবে।’
গতকাল ১৪ জুলাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন। এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গুণী অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। তিনি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে সংগঠনটির ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়। ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন অভিনেতা ও সংগঠনের উপদেষ্টা মামুনুর রশীদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অভিনেতা শাহাদাৎ হোসেন। এতে উপস্থিত ছিলেন দিলারা জামান, খায়রুল আলম সবুজ, সারা যাকের, ফারুক আহমেদ, শহীদুজ্জামান সেলিম, আজিজুল হাকিম, তৌকীর আহমেদ, আলী রাজ, সুব্রত, শিবা শানু, কচি খন্দকার, রাশেদ মামুন অপু, রওনক হাসান, আহসান হাবীব নাসিমসহ অনেকে।