দুই দশকের অভিনয়জীবনে একসময় মানুষ আপনাকে যেভাবে চিনত, এখন নিশ্চয়ই তার চেয়ে অনেক আলাদাভাবে নিজেকে দেখেন...
রুনা খান : পেশাদার অভিনেত্রী ও মডেল হিসেবে কাজ করছি দুই দশক হয়ে গেল। ‘সিসিমপুর’ থেকে ধরি; সেই ২০০৪ সাল থেকে। দুই দশকে আমার কাজ করার ধরন, গতি একই রকম। এ সময়ে অভিনেত্রী ও মডেল হিসেবে যখন যে মাধ্যম থেকে কাজের প্রস্তাব এসেছে, আমি কেবল প্রস্তাব পাওয়া কাজের যেগুলো আগ্রহবোধ করেছি, সেখানে যুক্ত হয়েছি। আমাকে যে আলাদাভাবে দেখা যাচ্ছে, এতে আমার নিজের কোনো একক কৃতিত্ব নেই। যাঁরা আমাকে আলাদাভাবে কাজে ভেবেছেন, এই কৃতিত্ব তাঁদের। সে জন্যই হয়তো দুই দশক ধরে নানাভাবে নানা চরিত্রে, নানা লুকে দেখতে পাওয়া ভালো।
একই ধরনের চরিত্রে আটকে না থেকে ভিন্ন মানুষকে পর্দায় তুলে ধরার আগ্রহটা কোথা থেকে আসে?
রুনা খান : আগ্রহটা খুব গভীরভাবে আমার মধ্যে আসে। কারণ, আমাদের দেশ ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে বিশ্বাস করি, শ্রদ্ধা করি। সব ধরনের চরিত্র নিয়ে পর্দায় আসতে চাই। আর দশটা গতানুগতিক পেশার চেয়ে আমার পেশায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও চ্যালেঞ্জিং দিক—আমি একজন মানুষ হলেও অভিনেত্রী হিসেবে চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমাজের সব মানুষের জীবন যাপন করার সুযোগ পাই। আমার মতে, প্রত্যেক মানুষ আদতে ধূসর। সব সময় এমন চরিত্র নিয়ে পর্দায় আসতে চাই, যে চরিত্রের মধ্যে মানুষের গুণাবলি—ভালো–খারাপ, ইতিবাচক–নেতিবাচক সবকিছুর অংশ থাকে। মানুষ আদতে পুরোপুরি মনীষী নয়, দানবও নয়। তাই আমার কর্মের মধ্যে যেহেতু সুযোগটা আছে, যখন ভিন্ন রকম চরিত্রের প্রস্তাব পাই, তখন ভালোবেসে সেই চ্যালেঞ্জটা নিই।
কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে—গল্প, চরিত্রের গভীরতা, নাকি এমন কিছু করার সুযোগ, যা আগে করেননি?
রুনা খান : এখন আসলে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে চরিত্রের গভীরতা। ধরুন, একটা ওয়েব সিরিজ কিংবা ফিল্মের চরিত্রের উপস্থিতি কতক্ষণ—তা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করে না। খুব অল্প সময়ের উপস্থিতিতে যদি চরিত্রের গভীরতা থাকে, সেটা আমাকে বেশি টানে। কয়েক বছর আগে ‘সাপলুডু’ নামে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলাম, যেখানে আমার উপস্থিতি ১০ মিনিটের কিন্তু ভীষণ আগ্রহ নিয়ে কাজটা করেছিলাম। একই চরিত্র নিয়ে বারবার আসতে চাই না। যখন চরিত্রের গভীরতার সঙ্গে বৈচিত্র্য যোগ হয়, সেটা আমাকে বেশি টানে। আর হ্যাঁ, গল্প তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি সিলেটের হাওর অঞ্চলে ‘জলপবন’-এর শুটিং করেছেন। এই সিনেমার কাজের অভিজ্ঞতা কেমন? চরিত্র নিয়ে কতটুকু বলতে চান?
রুনা খান : গত ১৫ আগস্ট থেকে জলপবন সিনেমার শুটিং শুরু করি। রাজন তালুকদারের এটি প্রথম সিনেমা। এই সিনেমার সঙ্গে যুক্ত অনেকে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা করে এসে সিনেমা বানাচ্ছেন। এটা তরুণদের দল, যাঁরা সিনেমা নিয়ে পড়েছেন, স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বাস করেন এবং সিনেমাটা ঠিকঠাক বানাতে চান। আমার ভালো লেগেছে, খুব সাধারণভাবে হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, দৈনন্দিন জীবন, শিল্পবোধ আছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আছে, সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটা সাধারণ গল্প বলে যাওয়ার চেষ্টা। আমার চরিত্রের নাম নিরালা। আমি আসলে ভীষণ আনন্দিত হয়েছি তাঁদের সঙ্গে কাজ করে।
প্রথম আলো :
এর বাইরে এখন আর কী কী কাজ করছেন?
রুনা খান : পাঁচটি সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় আছে। ২০২৩ সালে কৌশিক শঙ্কর দাশের ‘দাফন’ শেষ করেছি। এরপর মাসুদ পথিকের ‘বক’, জাহিদ হোসেনের ‘লীলামন্থন’, সন্দীপ বিশ্বাসের ‘অসীমের পানে’। প্রথম তিনটি সিনেমার ডাবিংও শেষ হয়েছে। মুক্তির ব্যাপারে পরিচালক–প্রযোজক সিদ্ধান্ত নেবেন। নতুন একটি ওয়েব ফিল্মে কাজের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে।
আপনি কি নাটকের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন?
রুনা খান : বন্ধ করেছি বলতে চাই না, বলতে পারেন নাটকের কাজটা কমিয়ে দিয়েছি।
প্রথম আলো :
কয়েক বছরে পর্দায় ও সামাজিক মাধ্যমে আপনার উপস্থিতিতে একটা পরিবর্তন অনেকেরই চোখে পড়েছে। এই পরিবর্তনটাকে আপনি নিজে কীভাবে দেখেন?
রুনা খান : আজ থেকে ২০–২৫ বছর আগে যখন সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পাস করে থিয়েটার শুরু করেছিলাম...সেই মানুষ থেকে আজকের আমি—মৌলিক চিন্তাভাবনা একই আছে। যেটা বদলেছে, সন্তানের জন্মের পর শারীরিক একটা পরিবর্তন হয়েছিল, সেই শারীরিক পরিবর্তন বলতে অতিরিক্ত ওজনের মানুষ হয়ে যাওয়া, এরপর যখন স্বাভাবিক ওজনে ফিরলাম, তারপর আমাকে নানা রকম বৈচিত্র্যময় চরিত্রে কাজে আমার পরিচালকেরা ভেবেছেন, তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। যখন আমার ওজন ১০০ কেজি, তখনো যদি আমাকে এ রকম বৈচিত্র্যময় চরিত্রে ভাবা হতো, আমি ঠিক একইভাবে আগ্রহ নিয়ে করতাম। পার্থক্যটা হচ্ছে এভাবে কেউ ভাবেনি। যেটা গত পাঁচ বছরে ভেবেছে।
অভিনেত্রী হিসেবে রুনা খান কী চান—আরও বেশি কাজ, আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্র, নাকি এমন কিছু কাজ, যেগুলো শেষ করার পর মনে হবে, ‘এ সময়টা সার্থক হয়েছে?’
রুনা খান : অনেক বেশি কাজ আমি করতে চাই না। অভিনয়শিল্পী হিসেবেও আমার সীমাবদ্ধতা আছে। যদি অনেক বেশি কাজ করি, সব চরিত্রের প্রতি সুবিচার করতে পারব না, বিশ্বাসযোগ্য করতে পারব না। কারণ, আমার নিজের সীমাবদ্ধতা আছে। আমি বৈচিত্র্যময় চরিত্র চাই। আপনি যে বললেন, ‘এ সময়টা সার্থক হয়েছে’ কাজ করার সময় এটা আমি মনেপ্রাণে চাই। অর্থপূর্ণ কিছু একটা হলো বুঝি। আমার আসল পাওনা, অভিনয় করে আনন্দটা পাই ওটাই। যত দিন সুস্থ আছি, অভিনয়ের সঙ্গে থাকতে চাই।