মায়ের সঙ্গে কাঁদলেন জোভানও

মায়ের সঙ্গে জোভান। ছবি: ফেসবুক

রোববারের ঘটনা। ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছেন। উদ্দেশ্য সবাই মিলে নাটক দেখা। নাটকের অভিনেতা জোভান। তিনি তখনো বুঝে উঠতে পারছিলেন না পরিবারের সঙ্গে নাটকটি দেখবেন কি না। কারণ, কয়েক দিন আগেও শত শত ভক্তের সামনে এই নাটকের শুটিংয়ের সময় তিনি কেঁদেছেন। কিন্তু এবার মায়ের জন্য একসঙ্গে দেখতে হলো নাটকটি। একসময় সেই নাটকের গল্পে ডুবে গেলেন সবাই। নাটকের গল্পের শেষে পর্যায়ে রুমে নেমে এল নীরবতা। ভিজে গেল সবার চোখ। মনের অজান্তেই মা, নানি, মামার সঙ্গে কাঁদলেন জোভান। এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম।

জন্মের পরই একটি শিশু মারা যায়। সেই শিশুকে দাফন করা নিয়েই নাটকের গল্প। ‘কবর’ নামের মানবিক এই গল্পের চিত্রনাট্য পাওয়ার পর থেকেই শেষ দৃশ্যটি কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না এই অভিনেতা। কবরে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে একটি শিশুকে। হঠাৎ সেই শিশু কবরে রাখার পর কান্না করতে থাকে। ২০১৬ সালে এই ঘটনা প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। ঘটনা ঘটেছিল ফরিদপুর শহরের আলীপুরস্থ পৌর কবরস্থানে।

নাটকের দৃশ্যে জোভান। ছবি: ফেসবুক

সত্য ঘটনাটা ছিল এমন, ‘রাত সাড়ে ১২টায় জন্ম হওয়ার কিছুক্ষণ পর নবজাতকটিকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। এরপর শিশুটিকে কবর দিতে কার্টনে করে নিয়ে আসা হয় কবরস্থানে। সকাল ছয়টায় কবর দেওয়ার আগে মৃত নবজাতকের মাথা কোন দিকে রয়েছে, তা দেখার জন্য কার্টনটি খোলা হয়। আর তখনই কেঁদে ওঠে নবজাতক।’ সেই ঘটনার অনুপ্রেরণায় এবার ঈদে প্রচারিত হয়েছে ‘কবর’ নাটকটি। সেই নাটক ১১ দিনে ৫০ লাখের বেশি দর্শক দেখেছেন।
জোভান বলেন, ‘দিনটি আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা এই প্রথম। গল্পে কোথায় কী ঘটবে, আমি তো সবই জানি। একসময় আমি দর্শক হয়ে গল্পে ডুবে যাই। আমি কবরে শিশুটিকে যখন শুইয়ে দিচ্ছিলাম, তখন ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিলাম। এই দৃশ্যগুলো আমাকে দারুণভাবে ছুঁয়ে যায়। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার মা, নানি, মামা কাঁদছেন। সবাইকে কাঁদতে দেখে আমি নিজে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমারও কান্না চলে আসে।’

নাটকের একটি দৃশ্যে পরিচালক, জোভান ও অন্যরা
ছবি: ফেসবুক

জোভান আরও বলেন, ‘এই ঘটনা সত্য। খবরটি সেই সময়ই চোখে পড়েছিল। তখনই খারাপ লেগেছিল। অভিনয় করতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। শুটিংয়ের জন্য পাঁচ দিনের এক শিশুকে নিয়ে আসা হয়েছে। শিশুটি ঘুমাচ্ছে। সেই শিশুটিকে কবর দিতে যাচ্ছি, এটা আমাকে খুবই ইমোশনাল করে দিচ্ছিল। আমি তখন ভাবছিলাম, এভাবেই একটি শিশুকে তাঁর বাবা কবরে শুইয়ে দিয়েছিল। তাঁর ফিলটাই হয়তো আমি পাচ্ছিলাম। ইমোশনাল দৃশ্যে সব সময় কান্নার জন্য চোখে গ্লিসারিন বা অন্য কিছু ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সেদিন কিছুই দরকার ছিল না। আমি ২০১৬ সালের সেই ঘটনা, চরিত্রের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলাম।’

একসঙ্গে নাটকটি দেখা শেষ হওয়ার পর কিছু সময় জোভানরা কেউই কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। সবাই চুপ ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ জোভানের মামা তাঁকে আশীর্বাদ করেন। তাঁর অভিনীত চরিত্র, অভিনয়, গল্প নিয়ে প্রশংসা করেন তিনি। জোভান বলেন, ‘আমার মা এমন এক মানুষ, যিনি আমার বড় সমালোচক। খারাপ হলে মুখের ওপর বলে দেন, নাটকটি ভালো লাগেনি। আরও ভালো হতে পারত, ভুল ধরিয়ে দেন। আবার ভালো হলে সরাসরি বলে দেন। এবার যখন মা বললেন, নাটকটি খুবই সুন্দর হয়েছে। প্রশংসা করছিলেন, তখন মনে হলো হয়তো অভিনয়ে এসে কিছুটা অর্জন করতে পেরেছি। এই ভালোবাসাগুলো অনুপ্রেরণা।’

পরিচালক রাফাত মজুমদার। ছবি: ফেসবুক

শুটিংয়ের জন্য নিয়ে আসার পর সেই শিশুর মা–বাবা জানতে পারেন শিশুটিকে প্রথম মৃত দেখানো হবে। পরে দেখা যাবে জীবিত। এসব শুনেই বেঁকে বসেন শিশুর দাদা। তখন নাটকটির পরিচালক রাফাত মজুমদার রিংকু তাঁদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করেন। কারণ, দৃশ্যটির শুটিং করতে না পারলে তাঁরা ফেঁসে যাবেন। শিশুটির পরিবারের সদস্যরা শর্তে রাজি হয় যে কান্না করার সময় কবর থেকে তোলা দৃশ্য দেখানো হবে। সেভাবেই পরিকল্পনা করা হয়।
জোভানের হাতে একটি শিশু। সেই শিশুকে কবর থেকে তোলা হচ্ছে, সেই দৃশ্য দেখে শুটিং ইউনিটের সবার চোখ ভিজে যাচ্ছিল। পাশে কাঁদছিলেন পরিচালক। সেই ছবি ফেসবুকে নাটকসংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোয় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিচালক বলেন, ‘দৃশ্যটা দেখে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমার সামনে ঘটনাটি ঘটছে। এই পাঁচ দিনের শিশুটির পরিবারের লোকজনও কাঁদছিলেন। পরে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এটা সত্য গল্প। এটা সবার ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। তাই আর মন খারাপ করেননি। নাটক প্রচারের পর শুনলাম, নাটকটি দেখে বস্তির সেই শিশুটিকেও আশপাশের অনেকে দেখতে আসছেন। তাঁরা খুবই খুশি।’

‘কবর’ নাটকে ধনী ও গরিবের বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছে। নাটকটিতে জোভানের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তাসনিয়া ফারিণ। আরও রয়েছেন মিলি বাসার, সমাপ্তি মাসুক প্রমুখ। নাটকটি ঈদে প্রচারিত হয়। এটি রচনা করেছেন জোবায়েদ আহসান।