নায়িকা, ভাবি পেরিয়ে ‘জাতীয় ফুফু’ দীপা, করতে চান দাদিও
‘এটা আমাদেরই গল্প’–এর কল্যাণে দীপা খন্দকারের জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ব্যস্ততা। আর ঈদের আগে তো ব্যস্ততা আরও বেশি। গত শুক্রবার শুটিং না থাকলেও অবসর ছিল না। উত্তরায় এ–লেভেল পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে ছেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা দীপা খন্দকার–এর অভিনয়জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসের গল্প শুনলেন মনজুর কাদের
ছেলের অভিভাবকদের কেউ তাঁকে ‘দীপা আপা’, কেউ ‘দীপা ভাবি’ বলে ডাকেন। ‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের জনপ্রিয় ‘ফুফু’ চরিত্রের কারণে ইদানীং কেউ কেউ ফুফু বলেও ডাকেন। শুধু ছেলের স্কুলেই নয়, শুটিং সেট কিংবা আড্ডা—যেখানেই যান, শুনতে হয়, ‘ফুফু আসছে।’ দীপা মজা করেই বলেন, ‘আমি এখন জাতীয় ফুফু হয়ে গেছি।’
এই ডাক তাঁর অনেক দিনের একটা ব্যক্তিগত আক্ষেপও পূরণ করেছে, ‘আমার বয়স যখন ৯ বছর, তখন একমাত্র বড় ভাই মারা যান। ফলে বাস্তব জীবনে কখনোই ফুফু হওয়ার সুযোগ ছিল না। অথচ অভিনয়জীবনের ২৭ বছর পর এসে দেশে-বিদেশে সবাই আমাকে ফুফু বলে ডাকছে। (মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল) রাজ আমাকে এমন একটি উপহার দিয়েছে, যা হয়তো আমার জীবনে কখনো পাওয়ার কথা ছিল না। এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার।’
দ্বিতীয় ইনিংস
১৯৯৯ সালে কাজী শাহেদুল ইসলামের ‘কাকতাড়ুয়া’ নাটক দিয়ে দীপার পেশাদার অভিনয়জীবন শুরু। এরপর আর থেমে থাকেননি, নিয়মিত অভিনয় করেছেন। প্রতি মাসে গড়ে পাঁচ–সাতটি নাটকে অভিনয় করেছেন। সেই হিসাবে ২৭ বছরের ক্যারিয়ারে তাঁর অভিনীত নাটকের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলেই মনে করেন এই অভিনেত্রী।
দীর্ঘ এই পথচলায় অনেক চরিত্রে অভিনয় করলেও এ বছর ‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের ‘ফুফু’ চরিত্র তাঁকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এটাকে নিজের অভিনয়জীবনের ‘দ্বিতীয় ইনিংস’ বলেই মনে করেন দীপা।
দীপা বলেন, ‘অনেক বছর আমাকে নায়িকার চরিত্রে দেখা গেছে। পরে বোন, ভাবিসহ বিভিন্ন ধরনের চরিত্র করেছি। কিন্তু ফুফু চরিত্রটি যেন অন্য রকম একটা হইচই ফেলে দিয়েছে।’
তবে এই ভালোবাসার সঙ্গে একধরনের চাপও অনুভব করেন দীপা, ‘মানুষ এখন আমাকে এত ভালোভাবে দেখে যে কখনো কখনো ভয়ও লাগে। আমি তো মানুষ—কোনো কারণে বিরক্ত হতে পারি, রাগ হতে পারে। কিন্তু মানুষ যদি সেটাই দেখে, তাহলে হয়তো ভাববে, পর্দায় যেভাবে দেখেছে, বাস্তবে আমি তেমন নই। তাই এখন অনেক ভেবেচিন্তে চলতে হয়।’ বললেন দীপা খন্দকার।
নাটকটির সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীপা বলেন, ‘মানুষের প্রতিদিনের জীবনে যে ছোট ছোট ঘটনা ঘটে, নাটকে সেগুলোই উঠে এসেছে। মুড়িমাখা খাওয়া, টোস্ট বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খাওয়া, সালাম করলে সালামি দেওয়া, পরিবারে ঝগড়া হওয়া আবার মিল হয়ে যাওয়া—এসব তো আমাদের ঘরের গল্প। ভাইবোন, মা-বাবা কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে এমন ঘটনা প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ঘটে।’
তাঁর মতে, দর্শক নিজেদের জীবনকে এই গল্পে খুঁজে পেয়েছেন বলেই নাটকটি এতটা জনপ্রিয় হয়েছে।
‘প্রত্যেকের ঘরেই এমন একজন ফুফু, মা–বাবা, ভাইবোন, খালা বা আত্মীয় আছেন, যাঁর সঙ্গে চরিত্রের মিল পাওয়া যায়। মানুষ নিজেদের গল্পকে পর্দায় দেখতে পেয়েছেন বলেই নাটকটি তাঁদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।’
বেড়েছে ব্যস্ততা
দীর্ঘ ২৭ বছরে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন দীপা খন্দকার। অভিনয়টাই তাঁর পেশা, এটাই তিনি করেন। তবে গত এক দশকে তাঁকে কম শুনতে হয়নি, ‘আপনাকে তো এখন দেখা যায় না।’
ভিউ-নির্ভর সময়ে কখনো কখনো তাঁরও মনে হয়েছিল, হয়তো আগের প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য সুযোগ কমে আসছে।
কিন্তু ‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের ফুফু চরিত্র সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। ‘এই কাজটার জন্য এত বেশি ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি যে নতুন করে অনেক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ এখন আমাকে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে ভাবতে শুরু করেছে।’
তাঁর মতে, এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাওয়া শিল্পীদের জন্যও একটি বার্তা। দীপা বলেন, ‘আমাদের অনেকেরই মনে হচ্ছিল, সময় বুঝি শেষ। কিন্তু এই চরিত্র প্রমাণ করেছে, প্রকৃত শিল্পীর কাজ কখনো শেষ হয় না।’
সম্প্রতি মীর সাব্বিরের ‘ম্যাডামের ড্রাইভার’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা ভালো সাড়া পাচ্ছে। শেষ করেছেন মুরাদ পারভেজের ‘শেষের গল্প’। ঈদেও প্রধান চরিত্রে একাধিক কাজ আসছে। এর মধ্যে আফজাল হোসেনের বিপরীতে ‘আবার হবে দেখা’ টেলিছবির কথা উল্লেখ করলেন। ফারিয়া হোসেনের লেখা টেলিছবিটির পরিচালক চয়নিকা চৌধুরী।
উত্থান-পতন পেরিয়ে
অভিনয়জীবনের ২৭ বছরে নানা উত্থান-পতনের মুখোমুখি হয়েছেন দীপা খন্দকার। তবে কখনোই এই পেশা ছেড়ে অন্য পথে হাঁটার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেননি। তাঁর কাছে অভিনয় শুধুই পেশা নয়, একধরনের প্রেম–ভালোবাসা।
দীপা বলেন, ‘আমি যদি বলি, এটা একটা প্রেমের গল্প—তাহলে ভুল হবে না। মানুষ যেমন কারও প্রেমে পড়ে, সম্পর্কের মধ্যে যত উত্থান-পতনই আসুক, সহজে তা ভাঙতে চায় না। অভিনয়ের সঙ্গেও আমার সম্পর্কটা ঠিক তেমন। চাইলে অন্য পেশায় যেতে পারতাম, সেই যোগ্যতা বা সুযোগ আমার ছিল। কিন্তু কখনো মন থেকে তা করতে চাইনি।’
তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়েছে। মনে হয়েছে, এটাই তাঁর সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা। এত বছরের চেনা পথ, চলার পথ—সব ছেড়ে নতুন কোনো পথে নিজেকে আবার নতুন করে গড়ে তোলার মানসিকতা তাঁর কখনো তৈরি হয়নি। অবশ্য পথচলাটা সব সময় মসৃণ ছিল না।
কাজের চাপ, জনপ্রিয়তার ওঠানামা, অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিই তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি। বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, লেগে থাকলে ফলাফল একদিন না একদিন আসবেই। আমি কোনো কিছু সহজে ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নই। ব্যক্তিগত জীবন হোক কিংবা পেশাগত জীবন—কখনো মনে হয়নি, ধুর, ছেড়ে দিই; বরং মনে হয়েছে, হয়তো আমি ঠিকভাবে পারছি না, হয়তো আমার কোনো দুর্বলতা আছে। সেটাকে কাটিয়ে উঠতে হবে।’
দীপার মতে, প্রতিকূল সময়ে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। ‘আমি সব সময় ভাবি, আজ যেটা করছি, সেটি ছেড়ে অন্য কিছু শুরু করলেও তার চেয়ে ভালো হবে—এমন নিশ্চয়তা তো নেই। তাই আমি চেষ্টা করে যাই, লেগে থাকি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, চেষ্টায় একদিন না একদিন ফলাফল আসে’, বলেন দীপা।
নারীপ্রধান গল্পের অপেক্ষায়
এখন কোন ধরনের চরিত্র তাঁকে বেশি টানে? উত্তরে দীপা বলেন, ‘যে গল্পে নারীর যাত্রা, সংগ্রাম বা প্রভাবশালী উপস্থিতি থাকে, সেই গল্পগুলো আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। নারীপ্রধান গল্পে কাজ করার আগ্রহ সব সময়ই বেশি।’
তবে শুধু টেলিভিশন নয়, ওটিটি ও চলচ্চিত্র—সব মাধ্যমেই ভালো গল্পে কাজ করতে চান তিনি। বিশ্ব সিনেমা, ওটিটির বিভিন্ন নারীপ্রধান গল্প তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। ‘নেটফ্লিক্স বা হলিউডে কোনো শক্তিশালী নারী চরিত্রের গল্প দেখলে মনে হয়, আমাদের দেশেও এমন গল্পে কাজ করতে চাই’, বলেন দীপা। সর্বশেষ ‘বদ ২’ এবং ‘একসাথে আলাদা’ এই দুটি কনটেন্ট দেখে দীপার খুব ভালো লেগেছে।
নায়িকা থেকে ফুফু, এরপর দাদি
অভিনয়জীবনের শুরুতে নায়িকা চরিত্রে দেখা গেছে—পরে বড় বোন, ভাবিসহ নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন দীপা খন্দকার। আর ‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের ফুফু চরিত্র তাঁকে এনে দিয়েছে নতুন পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা। তবে তাঁর অভিনয়যাত্রার স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। অভিনয়ে দিলারা জামানকে আদর্শ মানেন দীপা।
বললেন, ‘দিলারা জামান শেষনিশ্বাস পর্যন্ত অভিনয় করতে চান, আমিও তেমনটাই চাই। সুস্থ থাকলে, ভালো থাকলে আমিও অভিনয়ের মধ্যেই থাকতে চাই।’ হাসতে হাসতে যোগ করেন, ‘নায়িকা থেকে ভাবি, ফুফু হয়েছি। সামনে মা হব, এরপর দাদি।’ দীপার কাছে অভিনয় মানে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চরিত্রে নিজেকে আবিষ্কার। আর সেই কারণেই ফুফুর পর তাঁর অপেক্ষা এখন দাদি চরিত্র পর্যন্তও।