‘রামেন্দু, আমাকে সমীহ করে কথা বলবে...’
আতাউর রহমান শুধু একজন নাট্যব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা নাটকের এক মানবিক অভিভাবক। মঞ্চকে যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি মানুষকেও আগলে রেখেছেন হাসি, সততা ও বন্ধুত্ব দিয়ে—স্মরণসভায় এমন মন্তব্য করেন বক্তারা। তাঁদের কথায় উঠে আসে, আতাউর রহমান ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নাটককে দেখতেন জীবনের অংশ হিসেবে, আর শিল্পচর্চাকে মনে করতেন মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা।
১২ মে মারা যাওয়া এই নাট্যব্যক্তিত্বকে স্মরণ করতে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে জড়ো হন তাঁর সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও প্রিয়জনেরা। প্রায় দুই ঘণ্টার স্মরণসভায় উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ নাট্যজীবনের নানা অধ্যায়, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, শিল্পভাবনা ও ব্যক্তিজীবনের অজানা স্মৃতি। সহকর্মীদের স্মৃতিচারণায় বারবার ফিরে আসে একজন প্রাণবন্ত, রসিক ও দায়িত্ববান মানুষের মুখ; যাঁর কাছে মঞ্চ ছিল আত্মার জায়গা আর নাটক ছিল মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির এক আজীবন সাধনা। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই তাঁর মৃত্যুতে এক ‘বটগাছ’ হারানোর বেদনার কথাও তুলে ধরেন।
অন্ধকার মঞ্চে আতাউর রহমানের ধারণকৃত কবিতার অংশ দিয়ে শুরু হয় স্মরণোৎসব। পরে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন ফারহিন খান জয়িতা। এরপরই এক মিনিট নীরবতার মাধ্যমে শুরু হয় মূল স্মরণসভা।
এই স্মরণসভায় শংসাবচন পাঠ করে নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, ৮৫ বছরের সৃষ্টিশীল জীবন তাঁকে বয়ে নিয়ে গেছে মানুষের অন্তরে। জীবনানন্দ দাশ, শেক্সপিয়ারের কর্ম এই মঞ্চসারথির জীবনকে যেমন অনেক দিয়েছে, তেমনি সেগুলো তাঁর কাজে স্থান পেয়েছে। অনূদিত অনেক নাটক আতাউর রহমানের হাতে আশ্চর্য পরিণত মঞ্চনাটকে রূপান্তরিত হতো।
দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের নাট্যজীবনে নিরন্তর কাজ করে গেছেন আতাউর রহমান। নাসির উদ্দীন ইউসুফ আরও বলেন, ‘শিল্পের রঙিন অথবা ফ্যাকাশে ফুল, আনন্দ–বেদনার প্রতীকী হয়ে দর্শকের হৃদয়ে উদ্বেলিত হয়েছে। শিল্প সব সময় মানবকল্যাণের জন্য সেটা আতাউর রহমান মানতেন এবং জানতেন। জীবন ও শিল্প একসুতায় বেঁধে আতাউর রহমান সৃষ্টিশীল অভিযাত্রায় নিমগ্ন ছিলেন। মানুষের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু মানুষের সৃষ্টি শিল্প অবিনশ্বর। মৃত্যুর সাধ্য নাই তাকে স্পর্শ করে। মঞ্চসারথি আতাউর রহমান আমাদের মঞ্চে চিরজীবী এক শিল্পসাধকের নাম।’
শংসাপত্র পাঠের পর প্রদর্শিত হয় তথ্যচিত্র, যাতে তুলে ধরা হয় আতাউর রহমানের জীবন ও কর্ম, তথা দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের ক্যারিয়ারের নানা ঘটনা। মঞ্চে কাজ শুরু। নাট্যদল প্রতিষ্ঠা, দেশ–বিদেশে মঞ্চে দেশকে তুলে ধরার পাশাপাশি স্থান পায় সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডার মুহূর্ত।
এই স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন আতাউর রহমানের স্ত্রী শাহিদা রহমান। স্বামীকে স্মরণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আতাউর ভেতরে ও বাইরে একই রকম ছিলেন। তাঁর হিউমার ছিল অনেক বেশি। বাসায় আমাদের হাসাতেন। এমনকি বাসার কাজের মানুষ যাঁরা আমাদের দেখাশোনা করেন, তাঁদের সঙ্গে একই রকম ব্যবহার করতেন। তাঁদের হাসাতেন, শেখাতেন। এই সহজ–সরল জিনিসগুলো খুবই ভালো লাগত। এগুলো এখন মিস করছি।’
আতাউর রহমান শেষ দুই বছর অসুস্থ ছিলেন। এই সময়েও তিনি অভিপ্রায় করেছিলেন লাঠি হাতেই ‘রক্ত করবী’ নাটকে অভিনয় করবেন। কীভাবে সেই নাটকের ডিজাইন করবেন, সেটাও ভেবে রেখেছিলেন। পারেননি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই নাট্যব্যক্তিত্ব ১২ মে মারা যান।
স্বামীকে স্মরণ করে শাহিদা রহমান বলেন, ‘তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের তিনি সন্তানের মতো মনে করতেন। তাঁদের শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে ধারণা দিতেন। আমাদের সেটাই শেখাতেন। তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। চলে যাওয়াটা খুবই কষ্টের। আতাউরের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তাঁর নাটক আর দেখা হলো না। মঞ্চে দেখতে পারব না। তিনি যেখানে আছেন, যেন ভালো থাকেন।’
স্মরণানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রামেন্দু মজুমদার। তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘তিনি ছিলেন সাংগঠনিক মানুষ। তাঁর জন্য শোক করতে চাই না, উদ্যাপন করতে চাই। তিনি নিজের জীবন নিয়ে তৃপ্ত ছিলেন। তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। তিনি ছিলেন আনন্দদায়ক মানুষ। দেশে কিংবা আমরা বিদেশে গেলেও তিনি একই রকমভাবে কৌতুকের মধ্য দিয়ে আনন্দ দিতেন। আবার আমরাও আতাউর রহমানকে নিয়ে ঠাট্টা করেছি। তিনি জীবনভর আনন্দে মধ্য দিয়ে গেছেন। আমি মনে করি, আমাদের স্মৃতিতে আতাউর কখনো ঝাপসা হবেন না।’
রামেন্দু মজুমদারের চেয়ে আতাউর রহমান দুই মাসের বড় ছিলেন। এই নিয়েও তাঁদের মধ্যে মজার সব ঘটনা ঘটত। সেই প্রসঙ্গে টেনে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘তিনি ছিলেন আমার দুই মাসের বড়। সব সময় বলতেন, “রামেন্দু, আমাকে সমীহ করে কথা বলবে।” তিনি আমাদের মাঝে দীর্ঘজীবী হোন। আতাউর বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।’
এ সময় মজার ঘটনা স্মরণ করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে অনেক মজা করতাম। একবার মফিদুল হক আতাউর রহমানকে বললেন, “আতাউর, তোমাকে মঞ্চসারথি টাইটেল (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) বাচ্চুর ষড়যন্ত্র করে দেওয়া। বাচ্চু নিজের জন্য বাংলা নাটকের সুবর্ণপুত্র নাম নিয়েছে। সারথি মানে কি জানেন? ড্রাইভার। নাটকের ড্রাইভার।” এগুলো নিয়ে আমরা মজা করতাম। একসময় তিনিও উপাধিটা বেশ উপভোগ করতেন। এমনও হতো, নামের আগে কখনো সারথি না বললে তিনি বক্তব্যেও দিতে চাইতেন না।’
আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম তিনি আরও অনেক দিন বাঁচবেন। ভাবতাম, আমরা যখন চলে যাব, তারপরও অনেক দিন তিনি বাঁচবেন। কিন্তু তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নাটক–সংগঠন নিয়ে প্রাণচঞ্চল মানুষটার শেষ দিনগুলোতে একটা নিঃসঙ্গতা থাকত। এই মহিলা সমিতি মঞ্চে অনেক নাটক করেছি। সেগুলোর সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে। আমাদের আদর্শের দ্বন্দ্ব হতো।
কিন্তু নাটক নিয়ে যখন কোনো আলোচনায় বসেছি, তখন আমরা কখনোই কোনো বিষয়ে কথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করিনি। একে অন্যের পাশে থেকেছি। বন্ধুত্বের সম্পর্ক গাঢ় হয়েছে। এভাবে আমাদের থিয়েটার, সংগঠন টিকে আছে। দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে নাটক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন আমরা একসঙ্গে শামিল হয়েছি। রাজপথে নেমে লড়াই করেছি, প্রতিবাদ করেছি। সব সময়ই আমরা একের অন্যের হাত ধরে এগিয়ে চলেছি। আতাউর ভাই, আমরা আপনাকে ভুলব না।’
আতাউর রহমান ছিলেন সত্যের সন্ধানী। সততার সঙ্গে শিল্পচর্চা করছেন। এই মানুষেরা কখনোই অসৎ কাজ করতে পারেন না। এমনটাই বলছিলেন সারা যাকের। তিনি বক্তব্যে বলেন, ‘আতা (আতাউর রহমান) ভাইয়ের চলে যাওয়াটা স্বাভাবিক মনে হয়নি। মনে হয়েছিল, আতা ভাই অনেক বছর বাঁচবেন। তিনি ছিলেন আমাদের গুরুজন। একটি দল পরিবারের মতো। সেই পরিবার থেকে গুরুজন চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়াটা মন মেনে নিতে চায় না। কারণ, তিনি শিল্পী ছিলেন। আতা ভাই অত্যন্ত সৎ মানুষ ছিলেন। দায়িত্ববান ছিলেন। ওপরে ভালো থাকবেন।’
স্মরণসভায় কবিতার মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লাকি ইনাম। তিনি আতাউর রহমানের নির্দেশনায় প্রথম নাটকে অভিনয় করেন। নাটকটি ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। তাঁরা ছিলেন নোয়াখালীর মানুষ। কবিতা পাঠের আগে লাকি ইনাম বলেন, ‘আতা ভাই আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবেন, তাঁকে ভোলা যাবে না।’
সমাপনী বক্তব্যে আবুল হায়াতের কথায় উঠে আসে কৈশোর থেকে আতাউর রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামে পড়াশোনার সময়ে পরিচয় ও একসঙ্গে নাট্যচর্চার কথা। যাঁরা সব সময় একসঙ্গে দেশের নাটককে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেখানে অগ্রণী ভূমিকা ছিল প্রয়াত অভিনেতা আতাউরের। তাঁর চলে যাওয়াটা বেদনার বললেন আবুল হায়াত।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে শুরু হওয়া এই স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন নাট্যব্যক্তিত্ব মফিদুল হক, আবদুস সেলিম, কেরামত মাওলা, দেবপ্রসাদ দেবনাথ, কামাল বায়োজিদ, আতাউর রহমানের মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান।
এ ছাড়া পাঠাভিনয় করেন তারিক আনাম খান, কবিতা আবৃত্তি করেন গোলাম সারোয়ার, নায়লা তারান্নুন চৌধুরী, ত্রপা মজুমদার। স্মরণোৎসবে নাচের মধ্য দিয়ে এই মঞ্চসারথিকে স্মরণ করেন তামান্না রহমান। স্মরণসভায় ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘রক্তকরবী’ নাটকের কিছু অংশের ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
আতাউর রহমান সত্তরের দশকে ব্যস্ত হয়ে যান সাংস্কৃতিক চর্চায়। সেই সময় থেকেই তিনি একাধিক নাটকে অভিনয় করেন। তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তর ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটির মাধ্যমে নাট্যনির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রতিষ্ঠাতা ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’-এর মতো নাটকগুলোও নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সব সময়ই বলতেন, ‘অভিনয় খুবই কঠিন। তবু আমি সাহস করে এগিয়েছি। জীবনের প্রতিটি স্তরে শিখেছি।’
অভিনেতা ও নির্দেশক আতাউর রহমানের জন্ম নোয়াখালীতে। তাঁর স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। ‘মঞ্চসারথি আতাউর রহমান স্মরণ অনুষ্ঠান’ শীর্ষক আলোচনাটি হয় বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে। এটি আয়োজন করে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাসিরুল হক।