ঈদনাটকে প্রাধান্য পারিবারিক গল্প

‘সাম্পর্কের গল্প’ নাটকে তটিনী ও জোভান। ফেসবুক থেকে

ঈদের বাকি আর মাত্র ১২ দিন। ঈদ ঘিরে ছোট পর্দায় শুরু হয়েছে তারকাদের ব্যস্ততা। বেশির ভাগ অভিনয়শিল্পীর টানা ঈদের আগপর্যন্ত শুটিংয়ের শিডিউল। শুটিংবাড়িগুলোও এখন তারকাদের পদচারণে মুখর। ঈদকে কেন্দ্র করে নির্মিত এসব নাটকে থাকছে রোমান্টিক, পারিবারিক আবেগ, সামাজিক টানাপোড়েন থেকে শুরু করে কমেডির মিশ্রণ। নির্মাতারা বলছেন, এবারের ঈদ আয়োজন শুধু তারকানির্ভর নয়; গল্পের বৈচিত্র্য ও উপস্থাপনায়ও থাকছে ভিন্নতা।

নাট্যনির্মাতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর থেকে নাটকে পরিবারকেন্দ্রিক গল্প প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রযোজকেরাও বলছেন দেশের সাংস্কৃতিক আবহের পরিবার–গল্পকে প্রাধান্য দিতে। এসব নাটকে বড় বাজেটের পাশাপাশি মধ্যম ও তুলনামূলক ছোট বাজেটের নাটকও সমানভাবে নির্মিত হচ্ছে। ফলে একই ঈদ মৌসুমে দর্শক একদিকে যেমন তারকাখচিত বড় প্রজেক্ট দেখবেন, অন্যদিকে পাবেন গল্পনির্ভর শৈল্পিক কাজের প্রাধান্য। এসব নাটক টেলিভিশন ও ইউটিউবে প্রচার হবে।
গত বছর ঈদে আলোচনায় ছিল মোস্তফা কামাল রাজের ‘তোমাদের গল্প’। নাটকটিতে জুটি হয়েছিলেন ফারহান আহমেদ জোভান ও তানজিম সাইয়ারা তটিনী। এবার তিনি নাটকের দ্বিতীয় কিস্তি ঈদে আনছেন। প্রথম পর্বে পরিবারকে খোঁজার গল্পে রাতুল (জোভান) তাঁর দাদাবাড়িতে আসে। প্রথমবার আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করে। এবার দেখা যাবে পরিবারসহ নানাবাড়ি যাওয়ার গল্প। পুবাইলে শেষ হয়েছে শুটিং। এটি ঈদে সিনেমাওয়ালা ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার হবে। পরিবার নিয়ে গল্প করলেও এবার পরিবারের বাইরের প্রেক্ষাপট নিয়েও গল্প বলছেন এই নির্মাতা।

‘মনদুয়ারী’ নাটকের পোস্টার। ফেসবুক থেকে

মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা দেশ-বিদেশের সিরিজে যতই ব্যাংক ডাকাতি আর নানা রকম থ্রিলার গল্প দেখি না কেন, দিন শেষে আমাদের দর্শকেরা আমাদের পরিবারের গল্পই দেখতে চায়। কারণ, আমাদের পরিবার মানেই ইমোশন জড়িত। মানুষের আবেগ–ভালোবাসার জায়গা পরিবার। তবে আমি এবার পরিবারকে কেন্দ্র করে যেমন গল্প করছি, তেমনি বন্ধুত্ব ও কমেডি ধারার গল্পকে প্রাধান্য দিয়ে কক্সবাজারে বন্ধুদের মিশনের গল্প নিয়ে শুটিং করতে যাচ্ছি। আশা করছি এটাও দর্শকদের ভালো লাগবে।’
ঈদ ঘিরে তারকাদের মধ্যেও বাড়তি আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই একাধিক নাটকে কাজ করছেন এবং কেউ নতুন জুটি নিয়ে পরীক্ষামূলক গল্পেও অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম থেকে সব শ্রেণির দর্শককে টার্গেট করে নির্মিত নাটকগুলো এবারও আলোচনায় থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন তৌসিফ মাহবুব। তিনি জানান, সব ধরনের দর্শক উপভোগ করবেন এমন নাটকগুলোই প্রাধান্য দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন

কদিন আগেই ব্যাচেলর পয়েন্ট ধারাবাহিকের শুটিং শেষ করে নেপাল থেকে ফিরেছেন। এখন টানা ব্যস্ত ঈদের নাটকের শুটিং নিয়ে। সব মিলিয়ে পাঁচটি নাটকে তাঁকে দেখা যাবে। এই নাটকগুলো বেছে নিয়েছেন ৪০টির মতো চিত্রনাট্য থেকে।
তৌসিফ বলেন, ‘ঈদের গল্পগুলো একটু বিশেষ। আমি সময় নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। যে কারণে সংখ্যা কম। তবে পরিবারকেন্দ্রিক গল্প যেমন রয়েছে তেমনি তরুণদের টার্গেট করে; যাঁরা আমার নাটকের দর্শক তাঁদের জন্যও রোমান্টিক নাটকে অভিনয় করেছি। অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হচ্ছে পাঁচটি নাটকই এবার দর্শক পছন্দ করতে পারেন। সবগুলো গল্পেই বৈচিত্র্য রয়েছে।’

ঈদের নাটক ঘিরে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে আরও আলোচনায় রয়েছেন মোশাররফ করিম, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, নিলয় আলমগীর, ইরফান সাজ্জাদ, মুশফিক আর ফারহান, খায়রুল বাসার, ইয়াশ রোহান, আরশ খান, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল, জান্নাতুল হিমি, কেয়া পায়েল, নাজনীন নীহাসহ অনেকে। বেশির ভাগ অভিনয়শিল্পীই ঈদনাটক ঘিরে প্রচারণার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘এবারের ঈদে আসছে আমাদের মায়াপাখি, যা আপনার ধারণার বাইরের কিছু হবে। এই নাটকটি ‘মনদুয়ারী’ ও ‘মেঘবালিকা’ টিমের তৃতীয় গল্প।’ এর আগের দুটি নাটকও আলোচনায় এসেছিল।

অভিনয়শিল্পীরা কেউ কেউ মনে করেন, ঈদ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি নাটকের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের আলোচিত গল্পের ধারাই বছরজুড়ে চর্চা হয়। যে কারণে দর্শকের প্রত্যাশাও থাকে বেশি, আর সেই চাহিদা পূরণে প্রতিটি নাটকেই বাড়তি যত্ন নেন শিল্পী। কেউ কেউ ৫ থেকে ১০ দিন একটি নাটকের শুটিং করেন। অভিনেত্রী কেয়া পায়েল বলেন, ‘ঈদের নাটকে বাড়তি একটি যত্ন থাকে। একসঙ্গে অনেকের নাটক প্রচার হয়। সেখানে নিজের কাজটা যেন আলাদা করা যায়, দর্শক দেখেন সেই চেষ্টা করি। পারিবারিক কিংবা রোমান্টিক গল্প আমার কাছে ম্যাটার করে না, ভালো মানসম্মত গল্পের দিকেই নজর থাকে বেশি।’

ঈদ ঘিরে বিরূপ অভিজ্ঞতার কথাও শোনালেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন পরিচালক বলেন, ‘তাঁর একটি নাটকের কাজ বেশ আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে সময়ের আলোচিত তারকা জুটি কাজটি করবেন না বলে দিয়েছেন। এখন আমি কী করব? একই নাটকের বাজেট আগে ছিল ৮ লাখ এখন অন্য অভিনয়শিল্পী দিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকায় শুটিং করছি।’ শিডিউল জটিলতায় তিনি একটি প্রজেক্ট বাদও দিয়েছেন।

এদিকে টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টেলিপ্যাব)–এর তথ্য মতে, নাটকের সংখ্যা গত ঈদের তুলনায় ১০ শতাংশ কম হতে পারে। এর কারণ বেশির ভাগ প্রযোজক লগ্নি ফিরে না পেয়ে হতাশ। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি মনোয়ার পাঠান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাটকের বেশির ভাগ আয় তুলতে হয় ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। সেখান থেকে আয় আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। লগ্নি করে বেশির ভাগ প্রযোজক অর্থ তুলতে পারছেন না। এদিকে দিন দিন নাটকের বাজেট বাড়ছে। এখানে সব মিলিয়ে কোণঠাসা অবস্থা তৈরি হয়েছে। ঈদনাটক ঘিরে আলোচিত কিছু শিল্পী ভালো আছে। আর আশার কথা, এখনো পরিবারকেন্দ্রিক নাটক নির্মাণ বেশি হচ্ছি।’