কোথায় আছেন, কেমন আছেন সেই পিদিম
গ্রাম থেকে ফোনে বাবাকে বলছে এক শিশু, ‘মামণি আমার কেন কথা শোনে না, এই জন্য আমি স্কুলে যাব না। তোমার সঙ্গে কথা বলব।’ ওপাশ থেকে বাবা বলেন, ‘কথা বলতে বলতে স্কুলে যাও।’ শিশুটি গ্রামের পথে সেই ফোনে কথা বলছে। ফোনটি ধরে আছেন তার মা। শিশুটি হাঁটতে হাঁটতে তার বাবাকে বাড়ি আসতে বলে, ‘তুমি ৩০ তারিখে আসবা, না হয় ৩২ তারিখে আসবা, ঠিক আছে?’
মনে আছে সেই বিজ্ঞাপন? ছোট্ট শিশুর ভূমিকায় পিদিমের অভিনয়? সামাজিক মাধ্যমের আজকের রমরমা তখন ছিল না, সেই যুগেও ভাইরাল হয়েছিল তার সংলাপ।
পরে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘এফএনএফ’-এ পার্থ বড়ুয়া ও অপি করিমের ছেলের চরিত্রে অভিনয় করে আলোচিত হয় পিদিম। গল্পে আবুল হায়াত, মোশাররফ করিম প্রমুখ গুণী অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে পিদিম। কখনো দুষ্টুমিতে মেতে থাকা, কখনো উদ্ভট কাণ্ড করে বসা, একাই ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া, আবার বুদ্ধি খাটিয়ে ফিরে আসা—এমন বহু দৃশ্যে সে দর্শকদের মন জয় করেছিল। শিহাব শাহীনের ‘Iছুঁয়ে দিলে মন’I সিনেমায় আরিফিন শুভর শৈশবের চরিত্রে দেখা গিয়েছিল পিদিমকে। শিশু বয়সের রোমান্টিক ও ইমোশনাল দৃশ্যগুলোতে অভিনয় করে সিনেমাতেও আলোচিত হন এই অভিনেতা।
তারপর হঠাৎ করেই প্রায় এক দশক অভিনয় থেকে দূরে সেই শিশু অভিনেতা। কোথায় আছেন পিদিম, এখন কী করেন? কেন অভিনয় থেকে দূরে এই শিশুশিল্পী? পিদিমের সঙ্গে কথা হলো শনিবার। সেই ছোট পিদিম এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। জানালেন, অভিনেতা পরিচয় নাকি ভুলেই যেতে বসেছেন।
পিদিম জানান, আলী ফিদা আকরাম তোজো তাঁর বাবা। বাবা পরিচালক হওয়ার কারণে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে শুটিং সেটে যেতেন পিদিম। এভাবে দেড় বছর বয়সেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নাটকে অভিনয়। পিদিম জানিয়ে রাখলেন, ফারুকীর প্রধান সহকারী হিসেবে একসময় কাজ করতেন তাঁর বাবা।
পিদিম বলেন, ‘শৈশবেই দেখেছি বাবা শুটিং করতেন। আমি বাবার সঙ্গে যেতাম। বলা যায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কোলেই আমার একপ্রকার বেড়ে ওঠা। অভিনয়টাও তাঁর কাছ থেকেই শেখা। তিনি আমার পরামর্শক। তাঁর কাছ থেকে অভিনয়ের অনেক বিষয়ে ট্রেনিং নিয়েছি। আমি বড় হচ্ছি, আমার জন্য তিনি সেভাবেই গল্প লিখতেন। আমাকে আদর করতে করতে সহজে বুঝিয়ে দিতেন। যে কারণে অভিনয় করছি, কখনোই মনে হতো না।
পরে রেদওয়ান রনি, শিহাব শাহীন, আশফাক নিপুন, ইফতেখার আহমেদ ফাহমিসহ অনেকের নির্দেশনায় নিয়মিত নাটক-সিনেমায় অভিনয় করতে থাকেন পিদিম। জানালেন বিজ্ঞাপনের পরে তাঁকে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি দিয়েছিল ‘এফএনএফ’–এর রোহান চরিত্র। ২০১০ সাল থেকে এটির প্রচার শুরু হয়। এমন অবস্থা, তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল রোহান। নাটকটি পরিচালনা করেছেন রেদওয়ান রনি। সেই নাটকের শুটিংয়ের অনেক কিছুই তাঁর পছন্দের ছিল। হেসে বললেন, ‘আমি ছিলাম ছোট। সবাই আমাকে খুবই আদর করতেন। “এফএনএফ”–এর শুটিং করেছি জাফলং। সেখানে অনেক মজা হয়েছিল। বিশেষ করে মোশাররফ করিম আংকেল আমাকে সারাক্ষণ হাসাতেন। তিনি খুবই ভদ্র ছিলেন। এটুকু মনে আছে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুটিংয়ের সবাই আমাকে পাকনা বলতেন। আর সত্যি বলতে আমি অনেক দুষ্টু ছিলাম। চুপচাপ এক জায়গায় বসে থাকা, এটা আমার মধ্যে ছিলই না। চঞ্চল ছিলাম, যে কারণে দেখা যেত শুটিংয়ের সময়ই আমাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। সবাই মিলে আমাকে খুঁজতেন।’
শিশুশিল্পী হিসেবে সর্বশেষ ২০১৬ সালে অভিনয় করেছেন পিদিম। এরপর কেটে গেছে ১০ বছর। তাঁর কাজগুলোর বিভিন্ন দৃশ্য, কখনো সংলাপ প্রায়ই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। তিনি জানান, এখন এমন হয়, হয়তো পাশেই কেউ তাঁর কোনো ভিডিও দেখছেন; কিন্তু তাঁকে চেনেন না। পিদিম বলেন, ‘একসময় রাস্তায় বের হলে অনেকেই কথা বলতেন, “তোমাকে ওই নাটকে দেখেছি, সেই নাটকে দেখেছি।” ঘিরে ধরতেন। অভিনয়ের প্রশংসা করতেন। কিন্তু এখন বড় হওয়ার কারণে অনেকেই চেনেন না। অভিনেতা হিসেবে নিজেই নিজেকে চিনি না। তবে অনেকেই হঠাৎ বলেন, “তোমাকে কোথায় দেখেছি”, আমি কিছু বলি না। দর্শক আমার ভিডিওগুলো দেখছেন, লাইক–কমেন্ট করছেন, আমাকে ভোলেননি, আমার চেহারা মনে রেখেছেন—এটা আমাকে অবাক, বিস্মিত করে। আমি আনন্দিত হই।’
শিশুশিল্পীদের মধ্যে পিদিম ছিলেন তুমুল আলোচিত। তারপরও কেন অভিনয় থেকে সরে গেলেন? এমন প্রশ্নে পিদিম বলেন, ‘পড়াশোনার জন্য অভিনয় থেকে দূরে সরে যাই। শুধু পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে চেয়েছিলাম। একসঙ্গে দুটি হবে কি না, সেটা চিন্তায় ফেলেছিল। ও লেভেল এবং এ লেভেল শেষ করি। পরে অভিনয়ে কনটিনিউ করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তির পরে হলো না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি থাকত। স্পোর্টস থেকে শুরু করে অনেক কিছুতেই যুক্ত ছিলাম। সকাল ৬টা থেকে এগুলোতে সময় দিয়ে কখনো রাত ১২টা বাজত বাসায় আসতে। যে কারণে অভিনয় আর হয়নি।’
তবে অভিনয় না করলেও অভিনয় তাঁর মনে গেঁথে আছে। জানালেন, এখনো অভিনয় তাঁকে ভীষণ টানে। এটা বুঝতে পারেন সিনেমা দেখার সময়। তিনি জানান, মনের অজান্তেই অনেক চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে কল্পনা করেন। ‘সিনেমা দেখার সময় এমন হয়, কোনো একটি চরিত্র আমি করলে কেমন করতাম, সেটা অটো আমার মধ্যে চলে আসে। এটা আমাকে বোঝায়, অভিনয়ে আসলে আমার আগ্রহ আছে।’
তাহলে কি অভিনয়ে ফিরবেন? এমন প্রশ্নে পিদিম বললেন, ‘আমি প্রায়ই আমার কাজগুলো দেখি। দেখে নিজের প্রচুর ভুল খুঁজে পাই। আমার কাছে মনে হয় ওই ভুলগুলো এখন অভিনয় করলে আর হতো না। আরও বেটার করতে পারতাম। যাহোক, ইচ্ছা আছে। আবার কখনো যদি সে রকম ভালো সুযোগ আসে, তাহলে হয়তো আবার চেষ্টা করতে পারি।’
পিদিম আইইউবিতে অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। দেশে শেষ করে দেশের বাইরে পড়াশোনা করার ইচ্ছা রয়েছে। জানালেন, পড়াশোনার বাইরে তাঁর ভালো লাগে গান ও নাচ। ‘বাসায় পিয়ানো আছে। বেশির ভাগ সময় বাবার সঙ্গে বাজানোর চেষ্টা করি। এর বাইরে পড়াশোনা ও পরিবারকে সময় দিয়েই দিন যাচ্ছে।’