‘এটা আমাদেরই গল্প’–এর এই জনপ্রিয়তা কি অন্য ধারাবাহিকে থাকবে
একসময় টেলিভিশন বিনোদনের কেন্দ্রে ছিল ধারাবাহিক নাটক। ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘সংশপ্তক’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘রঙের মানুষ’, ‘ভবের হাট’, ‘সাকিন সারিসুরি’, ‘৫১বর্তী’, ‘বন্ধন’—এসব নাটক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। পরিবার নিয়ে এসব নাটক দেখার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় টিভির সামনে বসা ছিল রেওয়াজ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ধারাবাহিক নাটকই ধীরে ধীরে দর্শকের আগ্রহ হারাতে থাকে। একঘেয়ে গল্প, দুর্বল নির্মাণ, অযথা কাহিনি টেনে লম্বা করা এবং ইউটিউব ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান দর্শককে টেলিভিশন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এমন বাস্তবতার মধ্যেই সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘এটা আমাদেরই গল্প’। পারিবারিক গল্পভিত্তিক ধারাবাহিকটি প্রচারের পর থেকেই প্রশংসা কুড়ায়। চলতি মাসের শুরুতে ৫২ পর্ব প্রচারের মধ্য দিয়ে নাটকটি শেষ হয়েছে।
ধারাবাহিকের এই সাফল্য ধরে রাখা যাবে কি না—এই প্রশ্ন এখন বিনোদন অঙ্গনে আলোচনার বিষয়। নাট্যজন আবুল হায়াত মনে করেন, ধারাবাহিক নাটকের মূল শক্তি হলো গল্পের গাঁথুনি। তাঁর মতে, শুধু ভালো গল্প থাকলেই হবে না, প্রতিটি পর্ব এমনভাবে শেষ করতে হবে, যাতে পরবর্তী পর্ব দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকেন দর্শক। তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবনের গল্পই আসল—শুধু তরুণ নয়, বয়োজ্যেষ্ঠদের সংকট, পরিবারের টানাপোড়েন, বাস্তব জীবনের সম্পর্কের গল্পই মানুষকে আকৃষ্ট করে। বাস্তবধর্মী ও সম্পর্কভিত্তিক কাহিনিই এখনকার দর্শকের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।’
একই সঙ্গে আবুল হায়াত ভাষার ব্যবহারের দিকেও জোর দেন। কৃত্রিম ভাষা বা অস্বাভাবিক সংলাপ মানুষকে নাটক থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। চরিত্র ও পটভূমি অনুযায়ী স্বাভাবিক ভাষা ব্যবহার করা জরুরি। আবুল হায়াত মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা কিংবা উপযুক্ত আঞ্চলিক ভাষার বদলে অদ্ভুত একধরনের ভাষা তৈরি হয়েছে, যা দর্শকের সঙ্গে সংযোগ নষ্ট করছে। মধ্যবিত্ত ও পরিবারকেন্দ্রিক দর্শক মূলত ভাষার কারণেই অনেক সময় নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
‘রঙের মানুষ’, ‘ভবের হাট’, ‘সাকিন সারিসুরি’, ‘হাড়কিপ্টে’ ইত্যাদি আলোচিত ধারাবাহিক নির্মাণ করেছেন সালাহউদ্দিন লাভলু। এই পরিচালক মনে করেন, ধারাবাহিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিশালী চিত্রনাট্য। তাঁর অভিজ্ঞতা, এখন অনেক নাটক পূর্ণাঙ্গ স্ক্রিপ্ট ছাড়াই নির্মাণ শুরু হয়। ফলে গল্পের গতি ও ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। আগে ২৬ বা ৫২ পর্বের পুরো স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ শুরু হতো, এখন সেই পরিকল্পনা খুব একটা দেখা যায় না। পাশাপাশি সীমিত বাজেটকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন তিনি।
লাভলু বলেন, আগের নাটকে ১৭-১৮-২০ জন বড় মাপের অভিনয়শিল্পী অভিনয় করতেন। আর এখন একেকটা ধারাবাহিক নাটকে দেখা যায়, এক বা দুজন পরিচিত শিল্পী, বাকি সবাই নতুন। সম্মানীর কারণে বড় মাপের শিল্পীদের দেখা যায় না। আবার এখন ইউটিউবের একটা নাটকের বাজেট যদি থাকে ৫ লাখ টাকা, টেলিভিশনের জন্য দেড় লাখ! এতে সব ক্ষেত্রে বাজেট কমে। কম সম্মানীতে শিল্পীও তো কাজ করতে চান না। তাঁর মতে, বাজেট ও পৃষ্ঠপোষকতা না বাড়ালে টেলিভিশন ধারাবাহিক নাটক টিকে থাকা কঠিন হবে।
পেশাদার চিত্রনাট্যকার সিদ্দিক আহমেদের মতে, ভালো স্ক্রিপ্ট থাকলেও সঠিকভাবে উপস্থাপন না হলে দর্শকের কাছে পৌঁছায় না। পরিচালক এখানে মূল ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সৃজনশীল মানুষদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। শিল্পীদের যথাযথ সম্মানী ও স্বীকৃতি না দিলে মানসম্মত কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব নয়।’
একই সঙ্গে সিদ্দিক আহমেদ উল্লেখ করেন, পারিবারিক দর্শককে লক্ষ্য করে কনটেন্ট তৈরি করা দরকার। কারণ, এখনো বড় একটি দর্শকশ্রেণি পরিবার নিয়ে নাটক দেখতে চায়, কিন্তু উপযুক্ত কনটেন্টের অভাবে তারা দূরে সরে গেছে।’
‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘টান’ ও ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’-এর মতো সফল কনটেন্টের চিত্রনাট্যকার আরও বলেন, ‘একটি জনরা জনপ্রিয় হলেই সেটির অতিরিক্ত পুনরাবৃত্তি শুরু হয়, ফলে দর্শক ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাই বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একই ধরনের গল্প বারবার না করে নতুন ধরনের উপস্থাপন ও নতুন ভাবনা নিয়ে আসতে হবে। তাঁর মতে, তিনি ও মোস্তফা কামাল রাজ এখন সেই দিকেই এগোচ্ছেন, যাতে পারিবারিক দর্শক আবারও ফিরে আসেন। তবে কোনোভাবেই অশালীন বা অস্বস্তিকর কনটেন্ট তৈরি না করে।’
মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ মনে করেন, গল্পই প্রথম এবং প্রধান, তারপর বাজেট। তাঁর মতে, পৃথিবীর সব পারিবারিক গল্প মূলত একই ধরনের আবেগ নিয়ে তৈরি, পার্থক্য শুধু উপস্থাপনে। তাই উপস্থাপনে নতুনত্ব আনতে পারলে একই ধরনের গল্পও দর্শক গ্রহণ করেন। তিনি জানান, তাঁর পরিচালিত ‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের প্রতি পর্বে ৫–৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
নাটকসংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন নির্মাতা, প্রযোজক ও শিল্পীদের মতে, ধারাবাহিক নাটকের সাফল্য ধরে রাখতে গল্পে বৈচিত্র্য আনতে হবে, চিত্রনাট্যে বিনিয়োগ ও সময় দিতে হবে। তাড়াহুড়া করে নির্মাণ নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে গল্প তৈরির ওপরও জোর দেন তাঁরা।