সত্যিই কি গরুর গলায় প্রেমের চিঠি পাঠাতেন রনি

আবু হেনা রনিছবি : প্রথম আলো

সোমবার দুপুরে প্রথম আলোর কারওয়ান বাজার কার্যালয়ে হঠাৎ দেখা গেল এক ডাকপিয়নকে! খাকি পোশাক, মাথায় লম্বা টুপি, দুই হাতে চিঠির বান্ডিল। লিফটে তাঁকে দেখে কেউ অবাক, কেউ নিশ্চিত হতে দ্বিতীয়বার চোখ ফেরালেন। মুখটা যে বেশ চেনা! পাশ থেকে প্রশ্নও এল, ‘উনি কি মীরাক্কেলের রনি?’

সত্যিই তিনি কৌতুক অভিনেতা আবু হেনা রনি। কিন্তু ডাকপিয়নের বেশে কেন ঘুরছেন? হাসতে হাসতে রনি জানালেন, ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব চিঠি দিবস। দিনটি উপলক্ষে তাঁর কমেডি স্কুল ‘হেডমাস্টার’ আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘লাফ লেটার’। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠেয় সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র দিতেই তাঁর এই ব্যতিক্রমী সাজ।

আবু হেনা রনি
ছবি : মনজুর কাদের

অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে, ‘হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় যে আবেগ, যার গা থেকে ভেসে আসে নতুন কাগজের সুবাস—সেই চিঠি আজ বড়ই দুর্লভ। অথচ এক টুকরো কাগজই একসময় কত আবেগ, অপেক্ষা ও স্মৃতির চাবিকাঠি ছিল।’ চিঠিকে ঘিরে মানুষের ব্যাকুলতা, অপেক্ষা ও সম্পর্কের গল্পগুলোকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসতেই হেডমাস্টারের এই আয়োজন।

আবু হেনা রনি জানালেন, একসময় চিঠির জন্য অপেক্ষা করার মধ্যেও ছিল আলাদা আনন্দ। ডাকপিয়নের হাতে চিঠি দেখলেই তৈরি হতো কৌতূহল—চিঠিটি কার, কে লিখেছেন, ভেতরে কী আছে? সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘একসময় আমরা চিঠি দিতাম, নিতাম; চিঠির জন্য অপেক্ষা করতাম। সেটা ছিল মধুর একটা সময়। চিঠি হাতে পেলে অন্য রকম এক অনুভূতি হতো।’

আবু হেনা রনি
ছবি : প্রথম আলো

বিশ্ব চিঠি দিবস ঘিরে তেমন কোনো আয়োজন চোখে না পড়ায় নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন রনি। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ মনে হলো, বিশ্ব চিঠি দিবসে সারা দেশে কোনো আয়োজন নেই। এমনকি ডাক বিভাগেও কোনো আয়োজন অন্তত আমার চোখে পড়েনি। ভাবলাম, কোথাও যখন কিছু হচ্ছে না আর চিঠির প্রতি আমার ভালোবাসাও আছে, তখন আমিই একটা আয়োজন করে ফেলি। আমি আমার শিল্পমাধ্যম নিয়ে সেখানে হাজির হব। কৌতুক, গান, কবিতায় ভরপুর হবে আয়োজন।’

চিঠি নিয়ে রনির নিজের জীবনেও রয়েছে কত স্মৃতি। প্রেমিকার কাছে মুঠ পাকিয়ে ঢিলের মতো চিরকুট ছুড়ে দিতেন রনি, ‘কোনোবার সেটা (প্রেমিকার) বাবা পেতেন, কখনো বাড়ির ভৃত্য। শেষে ওদের বাড়ির একটা গরু হয়ে উঠল চিঠি পৌঁছানোর মাধ্যম। গরুর গলার দড়িতে চিরকুট আটকে দিতাম, প্রেমিকা সেটা জানত।’

আবু হেনা রনি
ছবি : সংগৃহীত

অভিজ্ঞতার সঙ্গে কৌতুক মিশিয়ে চিঠি নিয়ে আরেকটি ঘটনার কথাও শোনালেন রনি, ‘একবার চিঠি পেয়ে একজন আমাকে বকাঝকা শুরু করলেন, “আমার সংসার ভাঙতে চাও নাকি?” বললাম, তোমার নম্বরে কল করেছিলাম। বলা হলো, “ফোন সুইচড অফ, ট্রাই লেটার।” তাই আমি লেটারে ট্রাই করেছি।’ কথাটি বলেই হেসে উঠলেন রনি। নিজের চিঠি পাওয়ার অভিজ্ঞতাও শোনালেন, ‘বিটিভি বা বিভিন্ন জায়গা থেকে আমার কিছু চেক ও চিঠি আসে। কিন্তু সেগুলো আমার ঠিকানায় পৌঁছায় না। পোস্ট অফিসে গিয়ে খোঁজ করে সংগ্রহ করতে হয়। হয়তো আগের মতো চিঠি আসে না বলে ডাকপিয়নদেরও সেই অভ্যাসটা চলে গেছে। আমি এই বিষয়টিও মনে করিয়ে দিতে চাই।’

চিঠির যুগ আর ইনবক্সে বার্তার এই সময়—দুই প্রজন্মের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে মুখোমুখি করাও আয়োজনটির অন্যতম উদ্দেশ্য। রনি বলেন, ‘চিঠির সময়ের সেই দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে চাই। সবাইকে এক জায়গায় করতে চাই। আগে আমরা হাতে চিঠি পেতাম, এখন ইনবক্সে বার্তা পাই। দুই সময়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তির বিনিময় করতে চাই। দুই প্রজন্মের মানুষকে হাজির করতে চাই। কোথায় ঘাটতি, কোথায় ভালোবাসা—সেটা দেখতে চাই। নতুন-পুরোনো অনেকেই আসবেন বলে কথা দিয়েছেন।’

বিশ্ব চিঠি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক।