লন্ডনে থাকা মেয়ের কথা মনে পড়লে কান্না পায় জাহিদ হাসানের
‘বয়স কত হলো জাহিদ ভাই?’
‘৬০।’
কথোপকথন যত সহজ, সংখ্যাটা যেন ততটাই অবিশ্বাস্য জাহিদ হাসানের কাছে। আজ ৪ অক্টোবর ২০২৬, ৬০ বছরে পা রাখছেন মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই অভিনয়শিল্পী। নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয়তা পাওয়া জাহিদ হাসান এখনো অভিনয় দিয়ে মানুষকে হাসান, কাঁদান। তবে ৬০ বছরে এসে পেছন ফিরে জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে তাঁর উপলব্ধিতে এসেছে ভুল, অনুতাপ আর মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ।
পরিবারের সব ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট জাহিদ। তাই বয়স বাড়লেও পরিবারের কাছে এখনো ছোটই রয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছে আমি বড় হলেও পরিবারের সবার ছোট, তাই আজীবনই সবার কাছে ছোটই থেকে গেলাম। বয়স যে এতটা বেড়েছে, তা ভাবনার মধ্যে আসে না।’
এই বয়সে এসে নিজের ভুলের কথাও অকপটে বলছেন জাহিদ। তাঁর মতে, ‘জীবনে অনেক ভুল করেছি। মানুষ ভুল করবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমিও মানুষ। বিগত দিনের ভুলের জন্য কিংবা কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে দুঃখিত। আগামী জীবনটা যেন মানুষের জন্য কিছু করতে পারি। জীবনটা যেন মানুষের কাজে আসে।’
শুধু নিজের ভালো থাকার চিন্তা কখনো ছিল না জানিয়ে জাহিদ বলেন, ‘আমি সব সময় চেয়েছি, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে। সেই চেষ্টা এখন আরও বেশি। আমার কাছে মনে হয়, সবাইকে নিয়ে এগোনোর চিন্তা করলে দেশেরও উন্নতি হবে।’
দুই সন্তানের বাবা জাহিদ হাসান। বড় মেয়ে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে পড়ছেন। ছেলে এ লেভেল শেষ করেছেন। শিগগিরই তিনিও দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য যাবেন বলে জানিয়েছেন জাহিদ।
দেশের বাইরে থাকা মেয়েকে প্রায়ই মনে পড়ে জাহিদ হাসানের। ফোনে কথা হলে মেয়ে যখন বলে, ‘বাবা, এই খাবারটা মিস করছি, তোমাকে মিস করছি, বাসার সবাইকে মিস করছি’—তখন মন খারাপ হয়ে যায় জাহিদের। মেয়ের কথা মনে করে কখনো কখনো কান্নাও পায় তাঁর। এমনিতেও তিনি আবেগপ্রবণ। ভালো কিছু শুনলেও যেমন চোখে পানি আসে, তেমনি কারও কষ্ট দেখলে আরও বেশি আবেগতাড়িত হন।
জন্মদিনের স্মৃতিতেও ফিরে যান জাহিদ হাসান। পরিবারের ছোট ছেলে হওয়ায় এই দিনে বিশেষ আয়োজন থাকত। মা পায়েসসহ নানা খাবার রান্না করতেন, কেক আসত, থাকত চানাচুর, কলা আরও কত কিছু। আশির দশকের শেষ দিকে ঢাকায় আসার পর বদলে যায় সেই চিত্র। তখন মেসজীবন। ১৯৮৯ সালের এক জন্মদিনে ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের একটি মেসের ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলেন জাহিদ। চার-পাঁচজন মিলে একটি ঘরে থাকতেন। রান্নার জন্য বুয়া থাকলেও সব সময় খাবার মুখে তোলার মতো হতো না। তখন নিজেরাই ভাজি-তরকারি রান্না করে খেতেন।
সেই জন্মদিনে মেসের এক রুমমেটের বাবা, পেশায় আইনজীবী, জাহিদের জন্মদিনের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘মন খারাপ কোরো না পুলক (জাহিদ হাসানের ডাক নাম), এমন একটা দিন আসবে, যেদিন সারা দেশের মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করবে।’ অভিনয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা হলে সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে জাহিদের।
অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়েই সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জাহিদ হাসান। থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে শুরুতে দলের ঘর মোছা থেকে শুরু নানা কাজ করতে হয়েছে। পরে গড়ে ওঠে নাট্যকেন্দ্র। মেসজীবনের সেই কষ্টও তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বলে মনে করেন জাহিদ। তিনি বলেন, ‘কষ্টের মধ্যেও একধরনের শান্তি আছে, আবার কষ্টের মধ্যে অশান্তিও আছে। জীবনে কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। তাই কষ্টের পরের সুখটা আসলে অন্য রকম।’
সেই সময় থেকেই শিখেছেন ছাড় দেওয়া ও ভাগাভাগি করে নেওয়া। মেসজীবনের একটি মজার স্মৃতি মনে করে জাহিদ বলেন, বাথরুমে সাবান-শ্যাম্পু রেখে এলে অন্যরা ব্যবহার করত। এতে তাঁর আপত্তি ছিল না। তাঁর কাছে সেটিও ছিল একসঙ্গে থাকার জীবনের স্বাভাবিক অংশ।