একই ভুল বারবার করা এড়িয়ে চলা সম্ভব

শুটিংয়ে থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন তৌসিফ মাহবুব। একফাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে স্বাস্থ্যটাও পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছেন। ব্যাংককের হাসপাতাল থেকেই গত বুধবার কাজসহ নানা প্রসঙ্গে প্রথম আলোর মুখোমুখি হলেন এই অভিনেতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল আলম

প্রথম আলো:

ফেসবুকে পোস্ট করা ছবিতে দেখলাম আপনি আর তাসনিয়া ফারিণ। আপনার কোথায়?

তৌসিফ মাহবুব : আমরা থ্যাইল্যান্ড, দুটি নাটকের শুটিং করেছি। সঙ্গে ডাক্তার দেখাতেও এসেছিলাম। দেখিয়েছি, রিপোর্ট দেখে কিছুটা মন খারাপ। যে কারণে আমি আর ফারিণ একসঙ্গে একটু মন ভালো করার চেষ্টা করছিলাম। হাসপাতাল–জগৎটাই কেমন যেন, মন খারাপ করে দেয়, তাই নিজেদের একটু রিফ্রেশ করলাম এই আরকি। আমার আর ফারিণের সেই ছবি পোস্ট করেছি।

প্রথম আলো :

ফারিণের সঙ্গে শুটিং ছিল?

তৌসিফ মাহবুব : না, আমাদের দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংককে ট্রিটমেন্ট করাব। সে জন্যই আসছিলাম। সঙ্গে আমার স্ত্রীও এসেছে।

তৌসিফ মাহবুব। খালেদ সরকার
প্রথম আলো:

প্রথমে নাটকে, পরে ওয়েব সিরিজেও আপনাদের জুটিকে দর্শক পছন্দ করেছেন। আবার কবে একসঙ্গে দেখা যাবে?

তৌসিফ মাহবুব : ফারিণ মাশা আল্লাহ এখন পুরোদস্তুর সিনেমার অভিনেত্রী। চক্রতেই আপাতত শেষবার একসঙ্গে আমাদের পর্দায় দেখা যায়। এর পর থেকে আমি নিজেই অপেক্ষায় আছি, কবে তাঁর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করতে পারব। হয়তো সামনে কোনো কাজ হয়ে যেতে পারে।

প্রথম আলো :

আপনার বেশির ভাগ নাটকের ভিউই কোটির ওপর, রহস্য কী?

তৌসিফ মাহবুব : রহস্য না বলে এটাকে একটা সচেতন সিদ্ধান্ত বলা ভালো। একটা সময় অনেক কাজ করার মধ্যে একটা ব্যস্ততা ছিল। এখন কম কাজ করতে চেষ্টা করি। কিন্তু প্রতিটি কাজের প্রতি আগের চেয়ে বেশি সময়, মনোযোগ দিই। একটা দায়বদ্ধতার প্রশ্ন চলে আসে। আমার কাছে এখন সংখ্যার চেয়ে কাজটা কেমন হলো, চরিত্রটা আমাকে কতটা নতুনভাবে দেখাচ্ছে, দর্শকের মনে কতটা জায়গা করতে পারল—সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর দর্শক শেষ পর্যন্ত খুব সহজেই বুঝতে পারেন, কোনো কাজ কতটা মন দিয়ে করা হয়েছে। তাই হয়তো কাজের সংখ্যা কমেছে, কিন্তু কাজগুলোর প্রতি আমার বাছাই এবং দায়িত্ববোধটা বেড়েছে। আর কোনো রহস্য নেই।

তৌসিফ মাহবুব
শিল্পীর ফেসবুক থেকে
প্রথম আলো:

১৩ বছরের ক্যারিয়ারে কোনো অপ্রাপ্তি আপনাকে পীড়া দেয়?

তৌসিফ মাহবুব : ক্যারিয়ারের এই ১৩ বছরে আমার অনেক বড় একটা অপ্রাপ্তি ও দুর্ভাগ্য মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে কাজ করতে না পারা।

প্রথম আলো:

একটি নাটকের শুটিং আপনি ৪–৭ দিনে করেন, একই পারিশ্রমিকে কোনো সহশিল্পী যখন একটি নাটক এক দিনে করেন, সেটা মানসিকভাবে আপনার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে?

তৌসিফ মাহবুব : আমি মনে করি, এখানে তুলনাটা শুধু এক দিনে বা চার দিনে কাজ শেষ করার নয়। প্রত্যেক শিল্পীর কাজের ধরন, প্রস্তুতি, চরিত্রের প্রয়োজন এবং নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা আলাদা। একই পারিশ্রমিকে কেউ দ্রুত কাজ শেষ করতে পারেন, আবার কেউ হয়তো একটি কাজকে আরও সময় দিয়ে তার সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই অন্য একজন কীভাবে কাজ করছেন, সেটা নিয়ে মানসিক চাপ তৈরি করার চেয়ে নিজের কাজটা কতটা সততা, যত্ন এবং মান বজায় রেখে করছি, আমার কাছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত সময়ের হিসাবের চেয়ে কাজের মানটাই তো একজন শিল্পীকে দীর্ঘ মেয়াদে আলাদা করে।

তৌসিফ মাহবুব। খালেদ সরকার

প্রথম আলো :

প্রায়ই শোনা যায়, আপনাদের পরে নির্ভর করার মতো নতুন শিল্পী আসেনি, এটার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?

তৌসিফ মাহবুব : পরবর্তী প্রজন্মের কেউ আসেনি, বিষয়টাকে আমি এভাবে দেখি না; বরং প্রত্যেক প্রজন্মের নিজস্ব সময়, নিজস্ব লড়াই এবং নিজের জায়গা তৈরি করার প্রক্রিয়া থাকে। আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের সামনে যে সুযোগ বা পরিবেশ ছিল, সেটা হয়তো আজকের প্রজন্মের জন্য একেবারেই আলাদা। আর একজন শিল্পীকে নির্ভর করার মতো হয়ে উঠতে সময় লাগে। শুধু জনপ্রিয়তা নয়, ধারাবাহিকতা, পেশাদারত্ব, ভালো কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার মানসিকতাও প্রয়োজন। আমি বরং আশাবাদী আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই ভালো কাজ করছে। তাদের সময় দিতে হবে, জায়গা দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত কে কত দূর যাবে, সেটা সময়ই সবচেয়ে ভালোভাবে বলে দেবে।

প্রথম আলো:

পরিবারেও আপনি নিয়মিত সময় দেন।

তৌসিফ মাহবুব : অবসর খুব একটা পাওয়া যায় না, তবে যখন সময় পাই, চেষ্টা করি পরিবারকে সময় দিতে। কারণ, দিন শেষে পরিবারই সব। নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি পরিবারের ছোটখাটো কাজও করি। আমার কাছে এগুলো আলাদা কোনো ‘কাজ’ নয়, পরিবারের মানুষ হিসেবে যেটুকু করা দরকার, সেটুকু করি; বরং মাঝেমধ্যে এই সাধারণ কাজগুলোই আমাকে কাজের ব্যস্ততা থেকে সবচেয়ে বেশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে।

প্রথম আলো :

এ বছরের শুরুতে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভুলের সংখ্যা কমাতে চাই।’ এই ৮ মাসে কতটা কমাতে পেরেছেন?

তৌসিফ মাহবুব : ভুলের সংখ্যা কতটা কমেছে, সেটা হয়তো নিজে বসে হিসাব করে বলতে পারব না। তবে একটা জিনিস নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আগের চেয়ে এখন ভুল করার আগে একটু বেশি ভাবি। কারণ, বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বুঝেছি, সব ভুল এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, কিন্তু একই ভুল বারবার করা এড়িয়ে চলা সম্ভব।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

যদি পারিশ্রমিকের চিন্তা না করতে হতো, কোন ধরনের সিনেমা বা সিরিজ করতেন?

তৌসিফ মাহবুব : এমন সিনেমা বা সিরিজ করতে চাই, যেখানে চরিত্রটা শুধু গল্পের অংশ হয়ে থাকবে না; বরং দর্শককে কিছু ভাবাবে, হয়তো অস্বস্তিতে ফেলবে, আবার কখনো নিজের সঙ্গে মিল খুঁজে পেতে বাধ্য করবে। আর এমন কিছু চরিত্র আছে, যেগুলো হয়তো বাণিজ্যিকভাবে খুব সহজ বা নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়, কিন্তু একজন অভিনেতা হিসেবে আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে। সুযোগ পেলে এই ধরনের কাজে ঝুঁকি নিতেই বেশি আগ্রহী হব।

প্রথম আলো :

দীর্ঘ বিরতি পর আবার ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’–এ ফিরলেন। কখনো কী মনে হয়, ধারাবাহিকের নেহাল চরিত্রের মধ্যে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে?

তৌসিফ মাহবুব : আটকে গেলেই–বা ক্ষতি কী? নেহাল তো আমারই সৃষ্টি, আবার সেই জায়গা থেকে ভাবলে যেভাবে একটা নেহাল তৈরি করতে পেরেছি, আমি চাইব আরেকটা ডক্টর হুমায়ূন বা আরও অনেক চরিত্রকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে, অভিনেতা হিসেবে এর চেয়ে প্রাপ্তি কী আছে বলেন?