স্বজন–সহকর্মীদের চোখের জলে কাদেরের বিদায়

শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আবদুল কাদেরের শেষ শ্রদ্ধাসাবিনা ইয়াসমিন

চেন্নাই ও ঢাকার হাসপাতালে দুই সপ্তাহের চিকিৎসা শেষে আজ শনিবার দুপুরের পর আবদুল কাদের ‘এসেছিলেন’ সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। এর আগে যতবারই তিনি এসেছিলেন, তাঁকে সবাই ঘিরে ধরতেন। হাসিমুখে ভক্তদের আবদার মেটাতেন। ছবি তুলতেন, দিতেন অটোগ্রাফও। আজ ছিল না সেই সুযোগ। সাদা কফিনে মোড়ানো আবদুল কাদের নিথর শুয়েছিলেন। তাঁকে ঘিরে রেখেছিল সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার চোখ। একপাশে স্বজনেরা যেমন কাঁদছেন, তেমনি কাদেরের শেষ আগমন কাঁদাচ্ছিল উপস্থিত সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।
মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের অভিনয়শিল্পী ত্রপা মজুমদার কান্নার জন্য ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না।

ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘আবদুল কাদের খুবই ভালো ও অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন
সাবিনা ইয়াসমিন

তারপরও স্মৃতিচারণা করতে এসে ত্রপা বললেন, ‘বিটিভিতে একবার আবদুল্লাহ আল মামুন কাকার একটি নাটকে আমি, মা (ফেরদৌসী মজুমদার) ও কাদের কাকা অভিনয় করছিলাম। ওই নাটকের একটি দৃশ্য ছিল, আমার মরদেহ খাটিয়ায় পড়ে আছে। কাদের কাকা বলে উঠলেন, তিনি এ দৃশ্যে অভিনয় করতে পারবেন না। “ত্রপা আমার সামনে খাটিয়ায় শুয়ে আছে, এ দৃশ্যে অভিনয় করা আমার পক্ষে করা সম্ভব না।” তখন মামুন কাকা ধমক দিয়ে বললেন, “আরে এটা তো অভিনয়।” মা বললেন, “আমিও তো অভিনয় করছি।” সেই কাদের কাকা আমার সামনে খাটিয়ায় শুয়ে আছেন, এ কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।’

কথাগুলো বলেই কেঁদে উঠলেন ত্রপা।
মঞ্চ ও টেলিভিশনের এই অভিনয়শিল্পীকে শেষবিদায় জানাতে স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনিরা ছাড়াও আজ বিকেলে শিল্পকলায় ছুটে এসেছিলেন দীর্ঘদিনের শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সাদা কফিনে মোড়ানো আবদুল কাদেরকে যখন মরদেহ বহনকারী গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছিল, পরিবারের সবার চোখ তখন ছলছল করছিল।

মঞ্চ ও টেলিভিশনের এই অভিনয়শিল্পীকে শেষবিদায় জানাতে এসেছিলেন দীর্ঘদিনের শুভাকাঙ্ক্ষীরা
সাবিনা ইয়াসমিন

কাদেরের স্ত্রীর পাশে বসা ছিলেন নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে তাঁদের পরিচয় উল্লেখ করে বরেণ্য এই নাট্যজন বললেন, ‘কাদের আমার চেয়ে এক বছরের ছোট ছিল। আন্তহল নাট্য উৎসব করতে গিয়ে আমাদের পরিচয়। বয়সে ছোট হলেও কাদের আমার দীর্ঘদিনের একজন ভালো বন্ধু। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করত এবং সু–অভিনেতাও ছিলে। সাবলীল অভিনয় দিয়েই নিজেকে চিনিয়েছে।’
ঝুনা চৌধুরীর আহ্বানে একটা সময় আবদুল কাদেরকে নিয়ে কথা বলেন রামেন্দু মজুমদার। তিনি বললেন, ‘মঞ্চের অভিনেতা এবং সংগঠক হিসেবে আবদুল কাদের ছিলেন অপরিহার্য। দীর্ঘদিন তিনি থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি তাঁর ওপর অনেক নির্ভর করতাম। তাঁর মতো ধীমান অভিনেতা আমি খুব কম দেখেছি। তিনি নিজে আনন্দে থাকতেন, অন্যকেও আনন্দে রাখতেন।’ একসঙ্গে আবদুল কাদের ও ফেরদৌসী মজুমদার অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে বিদায় জানাতে ছুটে আসেন এই অভিনয়শিল্পী।

ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘আবদুল কাদের খুবই ভালো ও অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন। পুরো নাটক তাঁর মুখস্থ থাকত। নাটকের সংলাপের বাইরে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সংলাপ বলতেন। অসম্ভব রসবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর এসব সুখস্মৃতি নিয়েই থাকতে চাই।’
দাদার মৃত্যুতে নাতনি সিমরীন লুবাবা তার একজন বন্ধুকে হারিয়েছে বলে জানাল। লুবাবা বলল, দাদা অফিস থেকে ফিরলে দরজায় দৌড়ে যেত লুবাবা। দাদার হাতের ব্যাগটা নিয়ে রাখত সে। তারপর পরিবারের সবাই একসঙ্গে চা খেত। দাদার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক গল্প শুনত লুবাবা। শেষবার দাদার সঙ্গে মালয়েশিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিল। সেবার অনেক মজা করেছিল সে। সেসব স্মৃতি স্মরণ করে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছিল লুবাবা। পাশ থেকে লুবাবার ভাই মনে করিয়ে দেয়, দাদা তাদের মানুষের মতো মানুষ হতে বলেছেন।

অভিনেতা আবদুল কাদের।
ছবি:সংগৃহীত

সবার সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছা ছিল কাদেরের, এমন কথা বলেই কেঁদে ফেললেন এই অভিনয়শিল্পীর স্ত্রী খাইরুনন্নেসা। প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিকভাবে আবদুল কাদেরের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, পথনাটক পরিষদ, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, সুবচন নাট্য সংসদ, সময় নাট্যদল, থিয়েটার ও ঢাকা থিয়েটার।
এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আবদুল কাদেরের শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানিকতা। শিল্পকলা একাডেমি থেকে এই অভিনয়শিল্পীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে।