অভিনয়শিল্পীকে পর্দায় অনন্য করতে না পারাটা ডিরেক্টরের দোষ

মেহবুবা মাহনূর চাঁদনীছবি : প্রথম আলো
অনেক দিন ধরেই অভিনয়ে অনিয়মিত চাঁদনী। সম্প্রতি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও খণ্ডনাটকে কাজ করলেন তিনি। এসব নিয়েই গত শনিবার বিকেলে কথা হলো তাঁর সঙ্গে।

প্রশ্ন :

বহুদিন পর নতুন নাটকে অভিনয় করলেন।

আমি তো অভিনয় কমিয়েই দিয়েছি। নাটকে অভিনয় করি না, করতে খুব একটা ভালোও লাগে না। যেসব পরিচালক আমাকে তাঁদের গল্পে প্রয়োজন মনে করেন, আমারও গল্প পড়ে ভালো লাগে, তাঁদের সঙ্গেই কাজ করি। নিজে থেকে কাউকে বলি না, অভিনয় করতে চাই। আমি আমার মতো করেই জীবনকে যাপন করছি।

মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী
ছবি : সংগৃহীত

প্রশ্ন :

নিজেকে এভাবে গুটিয়ে নেওয়ার কারণ কী?

আমি সব সময় কম কাজই করতাম। একটা সময় আস্তে আস্তে সরে এসেছি। আমি সময়ের সঙ্গে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। জোর করে অভিনয়ে থাকার জন্য যেনতেন চরিত্রে কাজ করব, তা তো হতে পারে না। অবশ্য আমার সমবয়সী অনেকেই এখনো অভিনয় করেন। অনেকে এ-ও মনে করেন, পর্দায় আমাকে থাকতেই হবে। আমি বাপু ওসবের মধ্যে নেই। পুরো নাটকে আমি নেই, কিন্তু একটা দৃশ্যে অভিনয় করব, যদি সেটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়। পুরো গল্পে কোনো ঘটনা নেই, আমার চেহারাই শুধু যাবে, এমন গল্পে আমি মোটেও কাজ করতে চাই না। এসব কারণে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। বাসায় থাকি, নাচ নিয়ে নানা ধরনের কাজ করছি।

প্রশ্ন :

আপনাদের সময়ের অনেকে তো মা-ভাবি চরিত্রেও অভিনয় করছেন।

মায়ের চরিত্রে আমি কিন্তু অনেক আগেই অভিনয় করেছি, যখন আমাদের অনেক সিনিয়র সাহস করতে পারতেন না। ১০ বছর আগে ‘রসগোল্লা’ নামের সেই নাটকে আমার সহশিল্পী ছিলেন জয়রাজ। চরিত্রের জন্য সেই নাটকে আমার ১৫ বছরের একটা মেয়ে ছিল, ৭ বছরের ছেলেও ছিল। চরিত্রের জন্য ভাবি, বউ, বুয়া, চাকর—সব হতে রাজি আছি, যদি সেই চরিত্রের গুরুত্ব থাকে।

প্রশ্ন :

আপনাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকে অভিনয়, পরিচালনা দুই-ই করছেন। এসব কাজ দেখা হয়?

খুব একটা দেখা হয় না। যদি শুনি কোনো নাটক নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, তখন দেখি। কারণ, এখনকার স্টাইল, নির্মাণ, গল্প একই ধরনের হয়। কিছুদিন আগে অভিনয়জগতের এক মুরব্বির সঙ্গে কথা হলো, তিনি জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবে নাটক দেখেন। ৪০০ নাটক দেখার কথা ছিল, কিন্তু ৩টার বেশি দেখতে পারেননি। তারপরও নাকি বাধ্য হয়ে ওগুলো দেখতে হয়েছে তাঁকে। তবে নুসরাত ইমরোজ তিশা ও মেহ্‌জাবীনের নাটক মাঝেমধ্যে দেখি। ওরা ভালো করে। তাই আমারও উচিত ওদের প্রশংসা করা। আমাদের সময়ে হয়তো কেউ করেননি। আমি মনে করি, ছোটদের প্রশংসা না করলে তারা কোনো দিন এগোবে না।

মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী

প্রশ্ন :

বলা হয়, আপনাদের সময়ে একে অপরকে প্রশংসা করতেন। আপনার অভিজ্ঞতা কী?

তখন একে অন্যের পেছনে লেগে থাকত। একে এগোতে দেব, ওকে পিছে দমিয়ে রাখব—এ মানসিকতা ছিল বেশি। তবে আমি আমার মতো করে কাজ করে গেছি। কারও সাতেপাঁচে ছিলাম না। অল্প সময়ের মধ্যেই চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পরও আমি সেভাবে ভালো কাজের সুযোগটা পাইনি।

প্রশ্ন :

অভিনেতাদের কারও কাজ আপনার ভালো লাগে না?

ভালো লাগে অনেকের নাটকই, কিন্তু স্টাইল যে ওই একই রকম। এভাবে বলার জন্য সরি। সবাই যদি নিজস্ব স্টাইল তৈরি করতে না পারে, তাহলে বছরের পর বছর কাজ করেও কোনো লাভ নেই। অবশ্য অভিনয়শিল্পীকে পর্দায় অনন্য করতে না পারাটা ডিরেক্টরের দোষ। কারণ, একজন ডিরেক্টরই পর্দায় একজন অভিনয়শিল্পীকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা রাখেন।

মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী

প্রশ্ন :

সমস্যাটা তাহলে কোথায়?

এখনকার বেশির ভাগ নাটকের গল্পে দেখবেন, স্বামী-স্ত্রীর কোলাহল, প্রেমিক-প্রেমিকার বাহাস। টেনেটুনে গল্প বড় করা হচ্ছে। একধরনের নাটক হিট হলেই সবাই সেই ধরন নিয়েই ব্যস্ত। অনুকরণটাই যেন বেশি হচ্ছে। এখানে অভিনয়শিল্পীরও একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে, গল্প পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সবাই পর্দায় থাকার জন্য যেনতেন কাজ করলে ব্যর্থতার দায় তাঁদের নিতে হবে। আমার মনে হয়, অনেকে একধরনের ইনসিকিউরিটি থেকেও বেশি নাটকে অভিনয় করেন। ভাবেন, বেশি বেশি নাটকে অভিনয় না করলে হয়তো হারিয়ে যাবেন, যা পুরোপুরি ভুল। আমাকে (রাইসুল ইসলাম) আসাদ বাবা বলেছেন, ‘মা, বছরে কাজ করার মতো একটা কাজ করবা। বস্তা পচা ১০টা কিংবা ১০০টা নাটকে অভিনয় করে কোনো লাভ নেই।’

মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী
ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন :

কিন্তু অভিনয়কে যাঁরা পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তাঁদের তো আয়-রোজগারের বিষয়টাও খেয়াল রাখতে হয়।

মানলাম অভিনয়টাই পেশা। তাই বলে কি সব সময় একই ধরনের গল্পেই কাজ করে যাব! দর্শককে কেন একঘেয়েমিতে ভোগাব! আমার তো মনে হয়, যাঁরা অভিনয় করেন, তাঁরা যদি নিজেদের কাজগুলো দেখেন, তাঁরাও নিশ্চিত একঘেয়েমিতে ভুগবেন। ভিন্নধর্মী গল্পে কাজ না করলে তো হাজারটা কাজ করার পরও কাউকে বলার মতো কোনো কাজ খুঁজে পাবেন না তাঁরা। ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করলে নিজেকে যেমন প্রমাণ করা যায়, তেমনি দর্শকের কাছেও নিজেকে অনন্য করে তোলা যায়। এখন তো এ-ও দেখা যায়, যিনি বা যাঁরা গ্রামের চরিত্রে অভিনয় করেন, তাঁরা শুধু ওটাই করছেন। আবার যিনি শহুরে গল্পের নাটকে অভিনয় করছেন, তিনি শহুরে গল্প নিয়েই ব্যস্ত আছেন। এটাও একটা ইনসিকিউরিটি। কারণ, এ ধরনের অভিনয়শিল্পীর আত্মবিশ্বাস কম বলে মনে হয়। সবাই এত টাকা খরচ করে নাটক বানাচ্ছেন, ব্যবসায়িক লাভের সঙ্গে গুডউইলের কথাটাও ভাবা উচিত। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করলেই হয়। চারপাশে কী অসাধারণ সব গল্প। এটাকে সস্তা বানালে একটা সময় আমরা নিজেরাই নিজেদের পিছিয়ে নিয়ে যাব।

প্রশ্ন :

নতুন কাজের খবর বলুন।

‘লেডি টিচার দিচ্ছি নিচ্ছি’ নাটকের শুটিং শেষ করলাম। এ সপ্তাহে করলাম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অসমাপ্ত চা’-এর কাজ। সামনে টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য নাচের অনুষ্ঠান করব।

প্রশ্ন :

বলছিলেন, কাজ কম করছেন, বাসায় সময় দিচ্ছেন। কীভাবে সময় কাটছে?

ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম চালু করেছি। ওটার জন্য সময় দিচ্ছি। নাচি। পরিবারে সময় দিই। আমার মা বই পড়েন, আমি শুনি; এটাও আরেকটা কাজ। পড়ায় আমি আবার ফাঁকিবাজ, তাই শুনতে খুব পছন্দ করি।

মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী
ছবি : প্রথম আলো

প্রশ্ন :

জীবন নিয়ে কোনো অনুতাপ আছে?

একদমই নেই। কারণ, পেশাগত ও ব্যক্তিজীবন কখনোই এক করিনি। এখন কেউ যদি মিলিয়ে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করে, তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। এসবকে আমি কোনো দিনই পাত্তা দিইনি। কপালে যা লেখা ছিল, তা-ই হয়েছে। আমি সবকিছু নিয়ে সব সময় সন্তুষ্ট।

প্রশ্ন :

নতুন করে সংসার শুরুর কোনো পরিকল্পনা আছে?

২০১৮ সালে ডিভোর্স হয়েছে। ভবিষ্যৎ কী, তা তো জানি না। কপালে যা লেখা আছে, তা-ই হবে। এখন মায়ের সঙ্গে আছি। পরিবার থেকে আমাকে যদি বিয়ে দেয়, তাহলে করব। আমি নিজে থেকে কিছুই ভাবছি না।