আমাদের শ্রুতি...

একান্ত মনের তাগিদেই সদ্য বিদায়ী শ্রুতি স্টুডিও নিয়ে কয়েক লাইন লিখতে বসলাম। শ্রুতি আমার ও আমার মতো অনেকের কাছে একটি প্রতিষ্ঠান, ঠিকানা, পাঠশালা ও নেশা থেকে পেশা রূপান্তরের মন্ত্রপাঠক।
১৯৭৯ সালের দিকে একদিন আমি বড় মগবাজারে আমার মামার বাড়িতে যাচ্ছিলাম, পথে নির্মাণাধীন একটি অবকাঠামো চোখে পড়ল। কৌতূহলবশত দু-একজনকে প্রশ্ন করেও সন্তোষজনক উত্তর পেলাম না। কয়েক দিন পর ঈপ্সা স্টুডিওতে রেকর্ডিং করতে গিয়ে জানলাম, ওখানে আতা ভাই (খান আতাউর রহমান) একটি স্টুডিও নির্মাণ করছেন, সেটাই আজকের বিদায়ী-যাত্রী ‘শ্রুতি’।
সেই সময় সংগীতশিল্পীদের কর্মক্ষেত্র রেডিও, টেলিভিশন, এফডিসি এবং দু-একটা প্রাইভেট স্টুডিওর মধ্যে সীমিত ছিল। বেঙ্গল স্টুডিও ঈপ্সা ও মুভি টোন ছিল অন্যতম। শ্রুতি স্টুডিওতে কাজ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর একে একে আরও কিছু রেকর্ডিং স্টুডিওর আবির্ভাব ঘটে, উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম আলোচনায় আনা ভালো। যেমন: এলভিস, সিম্ফনি, ডন, অরবিট, অন্তরা, সাসটেইন ও টোন এন্ড টিউন। এর বাইরে কিছু থাকলেও চলচ্চিত্রের গান মূলত এই সব স্টুডিওতে ধারণ করা হতো। এত স্টুডিওর ভিড়ে অবস্থান নিয়েও শ্রুতি স্টুডিও দাপটের সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে গেছে এবং তা এনালগ যুগের সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এর কারণগুলো সম্ভবত বিশাল লাইভ রুম, রিহার্সাল রুম, খোলামেলা পরিবেশ, শিল্পীবান্ধব ব্যবস্থাপনা, আইয়ুবের নিপুণ তদারকি এবং শাহজাহানের চা। বিশেষ করে, শ্রুতি স্টুডিওর সংগীত মিশ্রণ যা, এফডিসির ৩৫ মিমি ম্যাগনেটিক এবং ‘Gamount Kalee’ অপটিক্যাল ক্যামেরার জন্য ভীষণ মানানসই ছিল। শুরু থেকেই শব্দপ্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন এ দেশের কিংবদন্তি শব্দপ্রকৌশলী এ মজিদ খান, যিনি আন্তরিকভাবে আমাদের সঙ্গে রিহার্সালে বসে আগে থেকে গানের ধরন বুঝে নিতেন। সহকারী হিসেবে মঞ্জু ভাইও তাঁর যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমার যত দূর মনে পড়ে, শুরুতে উল্লেখযোগ্য ইক্যুইপমেন্টগুলো ছিল: Tascam M-30 Eight Channel Mixer, Teac A-3340 Tape Deck, Sony TC 500 Tape Deck, Boss DM-100 Digital Delay, Neumann U87 এবং এক জোড়া Studio Monitor, নাম নিশ্চিত নই। পরবর্তীকালে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ইক্যুইপমেন্ট হালনাগাদ করার চেষ্টা হয়েছে। মজিদ ভাই অবসরে গেলে তাঁর সহকারী আবু সাঈদ হাল ধরেন এবং মুহম্মদ সেলিম তাঁর কাজে সহযোগিতা করতে থাকেন। সেলিম পরে অভিশ্রুতি নামে একটি দ্বিতীয় ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সদ্য প্রয়াত আবু সাঈদ ভাই বয়সে আমাদের কিছু বড় হলেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল গভীর বন্ধুত্বের, নিবিড় ভালোবাসার এবং পরস্পর শ্রদ্ধাবোধের। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই মানুষটাকে আমি স্মরণ করে যাব।
সেই সময় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি দিন ঘিরে থাকত শ্রুতি স্টুডিও। কাজ থাকুক আর না থাকুক, একবার ঢুঁ মারতেই হবে, তারপর নির্ভেজাল আড্ডা। গানের সুরের ধারাবাহিকতায় কীভাবে রচনা হচ্ছে ইন্টারলুড, যন্ত্রের ব্যবহার, সেই সঙ্গে তালের পরিবর্তন, কর্ড অ্যারেঞ্জমেন্ট, কাউন্টার পয়েন্ট প্রভৃতি ছিল আমাদের পাঠের বিষয়। একজন সুর স্রস্টার কথা না বলে পারছি না, যাঁর মহড়ার নির্দেশনা মাঝে মাঝে বুঝতে পারতাম না, রেকর্ডিং শেষ হলে বলতাম, ‘ও আচ্ছা! এবার বোঝা গেল।’ আর ‘আমরা’ বলতে সমসাময়িক যাদের কথা বলছি, তাদেরও পরিচিতি দরকার: পিয়ারু খান, শেখ ইশতিয়াক, সেলিম হায়দার, নাদিম আহমেদ, মকসুদ জামিল মিন্টু, আজাদ মিন্টু, লাবু রহমান, ফরিদ আহমেদ, মানাম আহমেদ, আলী আকবর রূপু, শওকত আলী ঈমন প্রমুখ। ভুল করে কারও নাম না নিয়ে থাকলে আমাকে মাফ করবেন। ক্যাসেট যুগের শুরুটাও এই স্টুডিওর হাত ধরে, সেই সময় বন্ধু জাহিদ হোসেন অনেক ব্যস্ত রাখতেন স্টুডিওর শিডিউল খাতা।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলায়, বিষয়টা নতুন করে আলোচনার কোনো অবকাশ নেই এবং তা মেনে নিতেই হয়।
বোধ করি, সব গানকেই সময়ের পরীক্ষা দিয়ে টিকে থাকতে হয়। এই পরিবর্তনে আমরা যা হারিয়েছি তা হলো, শ্রুতির মতো একটি আবেগের জায়গা এবং সেই সঙ্গে পেশাদার রেকর্ডিং স্টুডিওর বিষয় ও প্রয়োজন, দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রতি যন্ত্রীদের আগ্রহ, প্রযুক্তিবিহীন সাবলীল সংগীত এবং একটি স্বাস্থ্যবান অডিও শিল্প। সারা পৃথিবীতেই সংগীতে একটা ‘শিফট’ হয়ে গেছে, এর ঢেউ আমাদের তীরেও লেগেছে। তবে পাশ্চাত্য দেশগুলো এই ‘শিফট’ মাথায় রেখে সংগীতের ব্যবসা এবং শিল্পী স্বার্থ রক্ষায় ক্রমাগত কঠিন নীতিমালা প্রণয়ন করে চলেছে, সে বাহনে আমরা আজও চড়তে পারিনি।
বিদায় শ্রুতি, আবার দেখা হবে...
লেখক: সংগীতশিল্পী