আমার চেনা ফরীদি ভাই

হুমায়ুন ফরীদি (জন্ম: ২৯ মে ১৯৫২, মৃত্যু: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২)
হুমায়ুন ফরীদি (জন্ম: ২৯ মে ১৯৫২, মৃত্যু: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২)

আমাদের পুরান ঢাকার বাসায় প্রথম টেলিভিশন আসে গত শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিকে। সালটা আমার ঠিক মনে নেই, কিন্তু মনে আছে টেলিভিশনটা ফিলিপস সাদাকালো। সেই সময় আশপাশের কোনো বাসায় টিভি আসেনি, আমিও স্কুলে ভর্তি হইনি। বাসায় যখন টিভি চলত, মহল্লার বিভিন্ন বাসা থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষে ভরে যেত বসার ঘর।
সে সময়ের বিটিভিতে একদিন এক নাটক হচ্ছে, সবাই টুকটাক কথা বলতে বলতে সেই নাটক দেখছে, নাম নিখোঁজ সংবাদ। হঠাৎ পর্দায় এক যুবকের আবির্ভাব। পুরা ঘর কখন যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। কিছু সময়ের জন্য ছোট একটা চরিত্রে দেখা গেল যুবককে। কিন্তু আমার কিশোর মনে গভীরভাবে আঁচড় কেটে গেলেন তিনি। তাঁর নাম জানলাম আরও অনেক পরে, হুমায়ুন ফরীদি।
এরপর থেকে টিভির নাটকগুলোতে ফরীদি ভাইয়ের উপস্থিতি নিয়ে একধরনের ঔৎসুক্য ও আকর্ষণ তৈরি হয় আমার ভেতর। এরপর সন্ধান, অপেক্ষা। একসময় আব্বার কাছে জানলাম তিনি মঞ্চেরও খুব ভালো অভিনেতা। আব্বার সঙ্গেই একে একে কীর্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, মুনতাসীর ফ্যান্টাসি, ধূর্ত উই—এসব মঞ্চনাটকে তাঁর সাবলীল অভিনয় আমার মতো সদ্য কিশোরকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
এরপর দেখলাম ফরীদি ভাইয়ের নির্দেশিত নাটক ভূত। প্রবল আকর্ষণ অনুভব করলাম যেসব মাধ্যমে তিনি কাজ করছেন সেসব কিছুর প্রতি। আশপাশে খেয়াল করে দেখলাম আমার মতো অনেকেরই রোল মডেল হয়ে উঠছেন তিনি। বুঝে গেলাম অনেক বড় শিল্পী তিনি, বড় মানুষ তো বটেই।
তখন আর শুধু মঞ্চে বা টিভিতে ফরীদি ভাইকে দেখে তৃপ্ত হতাম না। মহিলা সমিতিতে তাঁর দলের নাটক থাকলেই চলে আসতাম বিকেল পাঁচটা নাগাদ। তাঁরা পুরানা পল্টন লেনের যেখানে মহড়া করতেন, সেখানেও যাওয়া হতো কী এক টানে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ফরীদি ভাইকে লক্ষ করা হয়েছে দূর থেকে। কী করেন, কেমন করে করেন, কেমন করে কথা বলেন, কার কার সঙ্গে কথা বলেন, কেমন আচরণ করেন—এসব আর কী। তাঁকে দেখার জন্য নানা ছুঁতোয় অপেক্ষাও করা হয়েছে। কখনো কাছে যেতাম না তখন পর্যন্ত, শুধু দূর থেকে দেখতেই ভালো লাগত।
সময় এগোলে ফরীদি ভাইয়ের সঙ্গে একটা দূরবর্তী অবস্থান রেখেই আমারও বয়স বাড়ল। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম, তাঁর কাছাকাছি কোনো এক রাস্তাতেই হাঁটছি আমি, আমরা অনেকেই। তখন চলচ্চিত্রেও তাঁর জয়জয়কার। কত সিনেমার প্রথম শো যে দেখা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। খলনায়ক হাজির হলে দর্শকদের সেই উচ্ছ্বাস যে না দেখেছে, সে বুঝবে না। অদ্ভুত সব সিনেমায় দুঃসাধ্য সব অভিনয়।
সময়ের প্রয়োজনে বাসা বদল করতে হলো, ঈশ্বর দাস লেন থেকে ধানমন্ডি। কী আজব, ফরীদি ভাইয়ের বাসার পাশের রাস্তার এক বাসায় এসে পড়লাম। তাঁর আর আমার মধ্যে দূরত্ব তখন কয়েক শ গজ। তাঁর বাসার ওপর দিয়ে দিনে কতবার যে যাওয়া-আসা হতো। গলিতে গুলতানি মারতে গিয়ে আরেক ভাবে তাঁকে দেখা। তাঁর অজান্তেই। তত দিনে আমিও থিয়েটারের জগতে যুক্ত আর পরিচালনা সহকারী হিসেবে আমার বেশ নাম-যশ হয়েছে। চাইলেই পারতাম দেখা করতে, কথা বলতে, কিন্তু তা-ও কেন জানি মোহভঙ্গের ভয়ে দূর থেকেই ভালো লাগত—সে আলোচনায় না যাই।
কিন্তু এরপর, ফরীদি ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করলাম। গিয়াসউদ্দিন সেলিমের এনেছি সূর্যের হাসি ধারাবাহিকে তিনি অভিনয় করতে এলেন, আমি প্রধান সহকারী। এবার আর চাইলেও দূরে থাকা সম্ভব না, কিন্তু তা-ও আমি একধরনের এড়িয়েই চলতাম। এই কাজ চলার মাঝেই আমার জীবনের প্রথম টিভি অভিনয়ের সুযোগ হারানের নাতজামাই, ফরীদি ভাই করেন হারান; তাঁর সঙ্গে অভিনয়। সময়টা আমার কেমন আজব, ঘোরলাগা। আর তাঁর সঙ্গে আমার শুরু। তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত বাকিটা সময় বেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। আর মোহভঙ্গ হয়নি, বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।