আমার বাবা আবদুল্লাহ আল-মামুন

১২ জুলাই ছিল বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি আবদুল্লাহ আল–মামুনের জন্মদিন । প্রথম আলোর জন্য তাঁকে নিয়ে লিখেছেন তাঁর মেয়ে দিবা নার্গিস
আবদুল্লাহ আল-মামুনকে এ দেশের মানুষ নানারূপে চেনেন, কিন্তু আমাদের ভাইবোনদের কাছে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পিতা। আমার জীবনে দেখা অবিস্মরণীয় একটি চরিত্র আমার বাবা। ‘একই অঙ্গে বহুরূপ’ প্রবাদ ব্যাকটি তাঁর জন্য প্রযোজ্য। থিয়েটারে একাধারে তিনি নাট্যকার, পরিচালক আবার মঞ্চে শক্তিমান অভিনেতা। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও বেশি বৈ কম নয়। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য প্রাপ্ত পুরস্কারগুলো তাঁর মুনশিয়ানার পরিচয়ই বহন করে। আমার নিজের যতটুকু অভিনয়জ্ঞান, সবটাই আমার বাবার কাছেই শেখা।
হাজারো মানুষের সামনে অভিনয় করতে যাঁর কোনো সংকোচ ছিল না, অন্য সময়ে তাঁকে পাওয়া যেত স্বল্পালাপী এবং ভালো শ্রোতা হিসেবে। আমাদের চারজনের সঙ্গে বাবা হয়ে যেতেন আমাদেরই বয়সী। একসঙ্গে বাইরে খেতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, নানা রকম খেলার সঙ্গী ছিলেন আমাদের বাবা। আমার বাবা শীতের সময় কখনো কখনো ব্যাডমিন্টন খেলতেন আমাদের সঙ্গে, খেলতেন বাঁ হাত দিয়ে। লেখা ছাড়া অন্য অনেক কাজেই তিনি বাঁ হাত ব্যবহার করতেন। আমার বাবার লেখার সময়টা বাড়িতে দেখা হতো প্রার্থনার সময়ের মতো করে। পুরো বাড়িতে একটা শান্ত, ধীর পরিবেশ নিশ্চিত করতেন আমার মা। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমার মনে হয়, বাবার সেই সময়ের মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক এবং চলচ্চিত্র দর্শক বেশি মনে রেখেছেন ।
সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, যাঁর মানবিক দিক ছিল অসাধারণ। সরকারি চাকুরে হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বাড়ির অসংখ্য অতিথির আতিথিয়েতায় তিনি কখনো কোনো কার্পণ্য করেননি। তাঁর পাশে এসব সামাজিক কর্মকাণ্ডে মাকেও দেখেছি একই মানসিকতার অধিকারিণী হিসেবে। একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়েও আমার বাবা সাধারণভাবেই জীবন যাপন করেছেন আর আমাদেরও শিখিয়েছেন সরলভাবে সহজ হয়ে থাকতে।
বাবা একজন নিভৃতচারী ছিলেন, তাই তাঁর জন্মদিন ১২ জুলাই নিভৃতে চলে গেল। তাঁর খুব কাছের প্রিয়জনেরা কি মনে রেখেছেন তাঁকে? তাঁর সবচেয়ে ভালোবাসার যাঁরা ছিলেন, তাঁর শিল্পীরা কি দিনটি ভুলে গেছেন? কর্মব্যস্ত জীবনে হয়তো ভুলে যেতেও পারেন অনেকে, কিন্তু কেউ কেউ নিশ্চয় মনে করেছেন ওই দিন আমার বাবাকে।
আমরা তাঁকে আমাদের ভেতরে লালন করব আমরণ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আগামী প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাও আমাদের সবারই দায়িত্ব।