কিচ্ছু হারাইনি, বরং সব পেয়েছি

ইরফানকে নিয়ে আজ কোনো পারিবারিক বিবৃতি দেওয়া আমার সাজে না। কারণ, পুরো বিশ্বের মানুষ ওকে হারিয়ে ব্যক্তিগতভাবে শোকে কাতর। আমি তো একা হয়ে যাইনি। কারণ, আমার প্রিয়জন হারানোর নিঃস্ব অনুভূতির সাগরে এসে মিলেছে সহস্র মানুষের হাহাকার। তাই আমি আজ সবাইকে আশ্বস্ত করে বলতে চাই, আমি কিচ্ছু হারাইনি। বরং সব পেয়েছি।
এক মাত্রার ভালোবাসায় বিশ্বাস ছিল না ইরফানের। ও বলত, ভালোবাসা জাদুকরি। ভালোবাসার মানুষ কাছে থাকুক বা না থাকুক, ভালোবাসতে কোনো বাধা নেই। অনেক দূর থেকেও ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসা যায়। ইরফান সবকিছু একেবারে নিখুঁত চাইত। আমি তাই ৩৫ বছর ধরে আটপৌরে জীবন কাকে বলে জানিনি। ও সবকিছুর ভেতর একটা সুর, ছন্দ খুঁজে পেত। হোক সেটা কর্কশ কোনো শব্দ বা বাজে আওয়াজ। আমিও তাই সেই ছন্দে মিলিয়ে নাচতে, গাইতে শিখে গিয়েছিলাম।
মজার ব্যাপার হলো, আমাদের জীবনটাই হয়ে গিয়েছিল অভিনয়ের এক মাস্টারক্লাস। তাই যখন ইরফানের ক্যানসার ধরা পড়ল, ও যেন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর চরিত্র পেল। আর আমি ওর সঙ্গীর। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনকে মনে হতে লাগল নতুন নতুন চিত্রনাট্য।
ও ‘পারফেকশনিস্ট’। আমরা তাই কোনো ‘ডিটেইলস’ ছাড়িনি। সুস্থ হওয়ার জন্য, আবার জীবনে ফেরার জন্য নিখুঁতভাবে সব করেছি। জীবনের এই আড়াই বছরের নাট্যমঞ্চে অসংখ্য অসাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে। সেই তালিকার কেবল শুরু আছে, শেষ নেই। সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, বিশেষ করে চিকিৎসকদের প্রতি।
এই কঠিন সময়কে আমি আমাদের জীবনের একটা বিশেষ অধ্যায় বলব, যেখানে বিস্ময়, সৌন্দর্য, ব্যথা, যন্ত্রণা, আশা—সবই ছিল। এই অধ্যায়ের একেবারেই নিজস্ব শুরু, নাটকীয়তা আর চূড়ান্ত পর্বও ছিল। আমরা ৩৫ বছর একে অপরের সঙ্গী হয়ে জীবনের একই রাস্তায় হেঁটেছি। আর আজ আমি সিনেমার মতো দেখতে পাই, আমার ছোট্ট পরিবার একটা নৌকায় করে ভেসে যাচ্ছে। আয়ান আর বাবিলের হাতে বইঠা। ওদের বাবাকে ঠিক দেখা যাচ্ছে না। তবে অনুভব করা যাচ্ছে যে ওদের বাবা আছে। ঝড়ের মধ্যে আমাদের সন্তানেরা ওদের বাবার দেখানো পথে ধরে এগোচ্ছে। কিন্তু জীবন আর সিনেমার যে একটা বড় পার্থক্য আছে, জীবনে ‘রিটেক’ হয় না।
বাবিল আর আয়ানকে আমি বলেছি, ওরা ওদের বাবার কাছ থেকে যা শিখেছে, তা এক লাইনে লিখে দিতে। বাবিল লিখেছে, ‘অনিশ্চয়তার উদ্দাম নৃত্যে আত্মসমর্পণ করো আর নিজের ভাগ্যের ওপর ভরসা রাখো।’ আর আয়ান লিখেছে, ‘মন তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো।’
শিগগিরই ইরফান যেখানে ঘুমিয়ে আছে, সেই মাটিতে ওর প্রিয় একটা হাসনাহেনা ফুলের গাছ লাগাব। তারপর আমাদের চোখের জল প্রতি রাতে হাসনাহেনা ফুল হয়ে ফুটবে। আর সেই ফুলের সৌরভ পৌঁছে যাবে সেই সব মানুষের কাছে, যাঁরা ইরফানকে ভালোবাসে। উঁহু, আমি তাঁদের ভক্ত বলি না। আমি বলি, আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য।
সুতপা শিকদার: ইরফান খানের স্ত্রী, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক
অনুবাদ: জিনাত শারমিন