ফাঁকা শহরে জমেনি ছবির বাজার

ছবি দেখতে গিয়ে চট্টগ্রামে সিনে কমপ্লেক্সে সেলফি তুলছেন দর্শকেরা। ছবি: প্রথম আলো
ছবি দেখতে গিয়ে চট্টগ্রামে সিনে কমপ্লেক্সে সেলফি তুলছেন দর্শকেরা। ছবি: প্রথম আলো

এবার ঈদে দেশজুড়ে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পেয়েছে চারটি চলচ্চিত্র। বছরজুড়ে দর্শকখরা কাটিয়ে এই উৎসবের সময়টায় আশায় বুক বাঁধেন হলমালিকেরা। ঈদের ছবিগুলো সেই আশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে, তা জানতেই দেশের বিভিন্ন শহরের প্রেক্ষাগৃহে ঢুঁ মেরেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। ধারাবাহিকভাবে সেই চিত্রই তুলে ধরা হচ্ছে। আজ থাকছে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও যশোরের প্রেক্ষাগৃহে ঈদের ছবির ব্যবসার খবর।

ঢাকা
ফাঁকা শহরে জমেনি ছবির বাজার
মাসুম আলী, ঢাকা
নানা দিক থেকে ‘ডিসি’, ‘রিয়ার’ হাঁকডাক। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অভিসার হলের সামনের খোলা জায়গাটায় পায়চারি করছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক খায়রুল কবির। মন ভার। ভাই, কেমন যাচ্ছে-প্রশ্নটা শুনে অনিচ্ছুক হাসি দিয়ে বললেন, ‘না রে ভাই, যেমন ভেবেছিলাম, তেমন না। যাঁরা ছবি দেখার, তাঁরা সব গ্রামে চলে গেছে। ফিরলে জমতে পারে।’ অভিসারে চলছে ক্যাপ্টেন খান ছবিটি।

অভিসার থেকে মধুমিতা হাঁটার দূরত্ব। এখানেও টুকটাক দর্শকের উপস্থিতি দেখা যায়। এখানে চলছে মনে রেখো ছবিটি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম বলেন, ঈদের ছবির ব্যবসা মোটামুটি।

এবার ঈদে ছবি মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। শেষ পর্যন্ত মূলধারার চারটি ছবি মুক্তি পেয়েছে। ছবিগুলো হচ্ছে শাকিব খান ও বুবলী অভিনীত ক্যাপ্টেন খান, সায়মন সাদিক ও মাহিয়া মাহির জান্নাত, রোশান-ববির বেপরোয়া এবং মাহি ও কলকাতার বনি সেনগুপ্তর মনে রেখো। ঈদের আগে শেষ কার্যদিবসে মাতাল ও বেপরোয়া সেন্সর ছাড়পত্র পেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মাতাল ছবিটি মুক্তি দেওয়া হয়নি। আর কলকাতার রাজা চন্দ পরিচালিত বেপরোয়া নিয়ে অন্য পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রযোজক আবদুল আজিজ। ঈদে ঢাকার বাইরের একটি হলে মুক্তি পেলেও পরে ঘটা করে এই ছবি মুক্তি দেবেন তাঁরা।

বুধবার থেকে গতকাল শুক্রবার-ঈদের তিন দিন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সিনেমা হলে ঘুরে মনে হয়েছে, ফাঁকা ঢাকায় ঠিক যথাযথ জমেনি ঈদের ছবির বাজার। ব্যবসা মোটামুটি।
ঢাকা ছাড়েনি এমন লোকও অনেক ছিল। কোরবানির ব্যস্ততা শেষ করে অনেকেই অভ্যাসবশত সিনেমা হলে বিনোদন খুঁজে নিয়েছে। শ্যামলীতে চলছে ক্যাপ্টেন খান। প্রতিষ্ঠানটির হাউস ম্যানেজার আহসানুল্লাহ জানান, বুধবার সন্ধ্যার প্রদর্শনী প্রায় হাউসফুল ছিল। বৃহস্পতিবার দর্শক বেড়েছে। সেদিন বিকেলে নিউমার্কেটের বলাকা হলের সামনে ছোট আকারের ভিড় দেখা যায়। সমাগতদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। কয়েকজনকে দেখা গেল মনে রেখোর পোস্টারের সঙ্গে সেলফি তুলছেন। তাঁরা সবাই মাহির ভক্ত। কলকাতার বনির সঙ্গে কেমন অভিনয় করলেন মাহি, সেটাই তাঁদের আগ্রহের বিষয়।

জান্নাত ঢাকার তিনটি হলে চলছে-পুরান ঢাকার আজাদ, মালিবাগের পদ্মা ও কেরানীগঞ্জের নিউ গুলশান মিনি। পদ্মা হলের দায়িত্বে থাকা এন ইসলাম জানালেন, ফাঁকা ঢাকা হিসেবে ছবিটি বেশ ভালোই যাচ্ছে। দর্শকসংখ্যা হাউসফুল না হলেও কাছাকাছি গেছে। তাঁর ভাষায়, ব্যতিক্রম গল্পের ছবিটায় বেশ বিনোদন আছে। আগামী সপ্তাহে চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে।

কেরানীগঞ্জে পাশাপাশি দুটি হল নিউ গুলশান ও নিউ গুলশান মিনি। আকারে বড় হলটিতে চলছে ক্যাপ্টেন খান। অন্যটিতে জান্নাত। হলের চেয়ারম্যান আমির হামজা বলেন, দুটিই মোটামুটি চলছে। তাঁর মতে, যারা হলে এসে ছবি দেখে, তারা ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছে। তাই এখনো সেই অর্থে জমেনি।

ঢাকার বেশির ভাগ সিনেমা হলে চলছে ক্যাপ্টেন খান ছবিটি। বড় বাজেটের ছবি। পরিচালক ওয়াজেদ আলী বলেন, ছবিটি নিয়ে দারুণ আশাবাদী তিনি। পরের অবস্থানে আছে একই পরিচালকের ছবি মনে রেখো।
প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিঞা আলাউদ্দিন ঢাকাতেই চার দশকের বেশি সময় চলচ্চিত্র ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ঈদুল আজহায় ঢাকায় ছবির বাজার জমতে সময় লাগে। এই ঈদে তুলনামূলকভাবে বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়ে। প্রথম কয়েক দিন কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে ব্যস্ততা থাকে। আশা করা যায়, ছবির ব্যবসা আগামী সপ্তাহে ভালোর দিকে যাবে।

চট্টগ্রাম
সিনে কমপ্লেক্সে ভিড়
সুজন ঘোষ, চট্টগ্রাম
প্রেক্ষাগৃহের সামনে দর্শকের কোনো জটলা নেই। ভেতরে প্রায় সব আসন ফাঁকা। গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটায় এ দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আলমাস সিনেমা হলে। বিপরীত চিত্র দেখা যায় চট্টগ্রামের নতুন ও একমাত্র সিনে কমপ্লেক্স সিলভার স্ক্রিনে। কমপ্লেক্সের দুটি মিলনায়তনই ছিল দর্শকভর্তি।

আলমাসে মনে রেখো ছবিটি প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতিদিন তিনটি শো চলছে। তবে একটিতেও হল পূর্ণ হয়নি। গতকাল বিকেলে টিকিট বিক্রি হয় মাত্র ১০০। প্রেক্ষাগৃহে আসন রয়েছে ৯৬৭ টি।
গত ৪০ বছরে ঈদের সময় এ ধরনের অভিজ্ঞতা আর কখনো হয়নি বলে জানান আলমাস সিনেমা হলের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল আউয়াল। বললেন, তিন দিন যে পরিমাণ টিকিট বিক্রি হয়েছে, তা দিয়ে খরচ তুলতে অনেক কষ্ট হবে।

গত আগস্টে চট্টগ্রামের ষোলশহরে চালু হয় সিনে কমপ্লেক্স। ঈদের ছুটিতে সিনেমা দেখতে এখানে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ঈদের পরদিন থেকে দুটি মিলনায়তনের প্রতিটি প্রদর্শনীতে প্রায় সব আসন পূর্ণ ছিল। এই সিনে কমপ্লেক্সের টাইটেনিয়াম হলে হলিউডের মিশন ইমপসিবল ফল আউট ও দ্য স্পাই হু ডাম্পড মি-এর প্রদর্শনী চলছে। প্লাটিনাম হলে চলছে বাংলা ছবি স্বপ্নজাল ও আয়নাবাজি। বিক্রয় নির্বাহী আয়েশা মজুমদার বলেন, ঈদের ছুটিতে দর্শকদের ভালো সাড়া পাওয়া গেছে।

বন্ধুদের নিয়ে মিশন ইমপসিবল দেখতে এসেছিলেন চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম। সিনেমা দেখে বের হয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের সিনেমা হলগুলোর পরিবেশের কারণে সেখানে যেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু এই হলের পরিবেশ মুগ্ধ করার মতো।

যশোর
মণিহারে দর্শকের ভিড়
মনিরুল ইসলাম, যশোর
দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী যশোরের মণিহার প্রেক্ষাগৃহে ঈদের ছবি মনে রেখো দেখতে দর্শকের বেশ সমাগম ঘটছে। ঈদের দিন থেকেই প্রতিদিন সন্ধ্যার শোতে প্রেক্ষাগৃহ দর্শকে ঠাসা থাকছে।
শুক্রবার দুপুরের শোতে দর্শক সাধারণত একটু কম হয়। কিন্তু গতকাল প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের শোতে দর্শক সমাগম একেবারে কম ছিল না। ছবি দেখতে প্রেক্ষাগৃহের সামনে তরুণ-তরুণীরা ভিড় করছেন। প্রেক্ষাগৃহের সামনে প্রকাশ্যে কয়েকজন কালোবাজারে টিকিট বিক্রি করছেন। দর্শকেরা প্রেক্ষাগৃহের সামনে গেলেই তাঁরা টিকিট নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন। ১০০ টাকার টিকিট তাঁরা ১১০ টাকায় বিক্রি করছেন। তারপরও দর্শকদের তেমন অভিযোগ নেই। লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করেছেন।

যশোরের ঝিকরগাছা থেকে আশিকুল হক এসেছেন ছবি উপভোগ করতে। বলেন, ‘কী ছবি চলছে, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। পরিবার নিয়ে ছবি উপভোগ করার পরিবেশ এখনো মণিহারে আছে। আমরা মাঝেমধ্যেই চলে আসি।’
১ হাজার ৪১০টি আসনের এই প্রেক্ষাগৃহ ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রেক্ষাগৃহ সূত্র বলে, ঈদ-পূজা উপলক্ষে যে ছবি চলে, তাতে সারা বছরের খরচের অনেকটা পুষিয়ে যায়। প্রেক্ষাগৃহ কমপ্লেক্সে আবাসিক হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার ও দোকানঘর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি রোজগার হওয়ায় মণিহার কখনো লোকসানে পড়েনি।

মণিহারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম বলেন, ঈদের দিন ও পরদিনের চারটি শো হাউসফুল ছিল। তৃতীয় দিন থেকে দর্শক কিছুটা কমেছে। এমনিতেই রমজানের ঈদের তুলনায় কোরবানির ঈদে দর্শক কম হয়।