সত্য ঘটনার বাস্তব রূপ

ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ী নাটকের দৃশ্য
ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ী নাটকের দৃশ্য

তারাভানের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয় ২০০৫ সালের শেষ সময়ে। সাভারের পলাশবাড়ীতে যখন স্পেকট্রাম কারখানা ভবনটি ধসে পড়ে, তারপর যখন আমাদের মাথা ভোঁ ভোঁ করতে থাকে এবং ক্ষোভে, রাগে, হতাশায় আমরা তড়পাতে থাকি, ঠিক তখন এক নাট্যকার তাঁর করোটির জ্বালা-যন্ত্রণার ভাষারূপ দেন। 
সেই রূপায়ণে সাভারের পলাশবাড়ীর অসহায় গার্মেন্টস কর্মী তারাভানের জীবনচিত্র ফুটে ওঠে। তখন নাট্যকারকে অনুরোধ করি তাঁর যন্ত্রণার ভাষারূপটি থিয়েটারওয়ালায় ছাপবার অনুমতি দেওয়ার জন্য। তখন তিনি তা পাঠকের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্বটা আমাকে দেন। যদিও জানি, এর চূড়ান্ত প্রকাশ মঞ্চেই পাব। মঞ্চই এর ভাষা প্রকাশের আসল পাটাতন। সেই থেকে অপেক্ষায় থাকি আর নির্দেশকও আমাদের অপেক্ষায় রাখেন, এসব জ্বালা-যন্ত্রণার মঞ্চভাষা দেখার জন্য।
অতঃপর অপেক্ষা শেষ হয়, ৩০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে আমরা বসে পড়ি আজাদ আবুল কালামের রচনা ও নির্দেশনায় প্রাচ্যনাটের ৩০তম প্রযোজনা ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ী দেখার জন্য।
নাটকে আমরা সমান্তরালভাবে এক ঘটনার দুই ধরনের চিত্রকল্প দেখতে পাই। বহুতল কারখানার নিচে চাপা পড়া শ্রমিকদের কষ্ট-যন্ত্রণা, তারাভান হয় সেই কষ্ট প্রকাশের প্রতিনিধি। অন্যদিকে প্রজেক্টরে দেখতে পাই সরেজমিনে দেখে যাওয়া ভিনদেশি আউটসোর্সিং ব্যক্তিত্ব মি. ওয়েস্টের প্রজেক্ট কমপ্লিশন প্রতিবেদন পাঠ। একদিকে মঞ্চে চলে তারাভানের স্মৃতিচক্র, স্বপ্নচক্র আর জীবনচক্রের বেদনাবিধুর রোমন্থন, অন্যদিকে মি. ওয়েস্টের প্রতিবেদনে ভেসে ওঠে এই ধ্বংসলীলার পরিসংখ্যানগত সচিত্র ক্ষয়ক্ষতি।
তারাভান রংপুরের পলাশবাড়ী থেকে সাভারের পলাশবাড়ীর এই কারখানায়, আজ রাতের পালায় ডিউটির কাল পর্যন্ত তার হৃদয়ে সঞ্চয় করা স্বপ্নমুষ্টির কথা বলে। সেই বলার মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি, এই একটা রাতের পর কতজনের কত রকমের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার অপেক্ষাতেই থেকে যাবে চিরকাল। কাল ভোরেই কত না আলোকচ্ছটা পড়তে পারত তাদের জীবনে। কেউ কাল ছুটিতে বাড়ি যাবে বলে আনন্দচিত্তে কাজ করছিল, কেউ ভোরে সন্তানের বাবা হবে বলে উৎসাহে শ্রম-ঘাম বিলিয়ে দিচ্ছিল, কাল হলুদ বরণ কন্যা সেজে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে বলে লাজুক লাজুক শিহরণে নাইট শিফট করে যাচ্ছিল কেউ কেউ। একটাই তো রাত, রাত পোহালেই ভোরের আলো, স্বপ্নের সঙ্গে মোলাকাত।
কিন্তু তারাভানরা এই একটা রাত আর পার করতে পারে না। জলাভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অনুমোদনহীন নয়তলা ভবনটি ধসে পড়ে। খসে পড়ে কিছু মানুষের স্বপ্নযাত্রার সব আয়োজন।
এভাবে যখন মঞ্চে তারাভানের অন্তিম মুহূর্ত ফুটে ওঠে, ঠিক তখন প্রজেক্টরে দেখা যায় মি. ওয়েস্ট তার পলাশবাড়ী ট্র্যাজেডির প্রজেক্ট কমপ্লিশন প্রতিবেদন পাঠ শেষ করে। মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে মি. ওয়েস্টকে এমন একটা ‘জ্বালাময়ী’ প্রতিবেদন পেশ করার জন্য অভিনন্দন জানানো হয়। আমরা বুঝতে পারি, তারাভানদের জীবনদান পরিবারকে নিঃস্ব করে দিলেও তাদের জীবনদানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তৈরি হয় শত শত প্রকল্প, তাদের শবদেহের ওপর দিয়ে চলতে থাকে লাখ লাখ ডলারের কাজকারবার।
কিন্তু প্রাচ্যনাট আমাদের সচেতন করতে প্রয়াস পায়, নাটক শেষে আমরা বাধ্য হই স্পেকট্রাম কারখানার ধ্বংসাবশেষ ও নিহত ব্যক্তিদের রক্ত (ইনস্টলেশন) পায়ে দলিয়ে মিলনায়তন ত্যাগ করতে।
তার পরও তো তারাভানদের হত্যার বিচার হয় না, তাদের বিচারে আমরা উদ্যোগী হই না। সব সয়ে থাকার এক অদ্ভুত নীরবতায় আমরা ওম নেই। এই ওম নেয়া মানুষদের যেন তারাভানরা কখনো ক্ষমা না করে।
মঞ্চ আর নেপথ্যের সবাই বেশ ভালো করেছে। উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে একটু ভুলত্রুটি হয়েই থাকে, তা মঞ্চায়ন হতে হতে কেটে যাবে আশা করি। তবে যেহেতু এটি একটি কাব্য নাটক, সেহেতু সংলাপ ঠিক ঠিকভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য অভিনয়শিল্পীদের সব সময়ই একটু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আর একটা বিষয় লক্ষ রাখতে হবে, আবহসংগীত যেন সংলাপকে গিলে না ফেলে।
২০১৪ সালে বেশ কটি সমৃদ্ধ মঞ্চনাটক আমরা পেয়েছি। ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ী এই তালিকার উজ্জ্বল সদস্য।
প্রাচ্যনাটকে ধন্যবাদ।