default-image

শুনতে সিনেমার গল্পের মতো মনে হলেও সত্যি—জালিয়াতি করে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তা–ও আবার দুই–দুইবার! অসম্ভব কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন ইউরোপ–আমেরিকায় জালিয়াতি করে ‘নাম কুড়ানো’ ভিক্টর লাস্টিগ। ‘কাউন্ট’ ভিক্টর লাস্টিগ নামেও কুখ্যাত ছিলেন তিনি। লাস্টিগের জন্ম ১৮৮০ সালে, অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরিতে (এখনকার চেক রিপাবলিক)। অপরাধ জগতে পা রাখেন তরুণ বয়সেই। জীবনের একটা লম্বা সময় কাটান প্যারিসে। সেখানে পড়াশোনার সময় জুয়া তাঁকে পেয়ে বসে। তাঁর নাম ওঠে তখনকার বিভিন্ন অপরাধ ম্যাগাজিনে।

default-image

১৯২৫ সালে পত্রিকায় একটি লেখা পড়েন ভিক্টর লাস্টিগ। সেখানে জানতে পারেন, আইফেল টাওয়ার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার জোগান দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যয়ভার বহন করার চেয়ে টাওয়ারটি রদ্দি হিসেবে বেচে দেওয়াই ভালো কি না, এমন প্রশ্ন তোলা হয় লেখাটির শেষ দিকে। আর এই শেষ লাইন থেকেই লাস্টিগের মাথায় আইফেল টাওয়ার বেচে দেওয়ার বুদ্ধিটি আসে। আর শুরু করে দেন জাল দলিল-দস্তাবেজ তৈরির অপকর্ম।

default-image

এরপর গোপনে একদল ভাঙারি ব্যবসায়ীকে একটি বিলাসবহুল হোটেলে দাওয়াত করেন লাস্টিগ। ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেকে ফ্রান্সের ডাক ও টেলিগ্রাফমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। বোঝাতে সক্ষম হন যে এই টাওয়ার এখন দেশের জন্য একটা বোঝা এবং এ জন্যই সরকার এটিকে ফেলনা হিসেবে বেচে দিতে চাইছে। লাস্টিগ ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেন, পুরো বিষয়টি গোপন রাখা জরুরি, কেননা এ বিষয়ে জানাজানি হলে বিতর্ক দেখা দেবে। লাস্টিগ আরও বলেন, তিনি নিজে টাওয়ারের ক্রেতা নির্বাচনের দায়িত্বে আছেন।

অবশেষে আন্দ্রে পয়সন নামের এক ফরাসি ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলেন লাস্টিগ। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। পয়সনকে জানান, মন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান নাজুক এবং তিনি সুযোগ–সুবিধাবঞ্চিত। এসব বলে তিনি আদতে পরোক্ষভাবে ঘুষ দাবি করেন। অন্যদিকে পয়সন চাইছিলেন ব্যবসায়ীমহলে নিজের একটা উঁচু অবস্থান তৈরি করতে। তাই তিনি যেভাবেই হোক আইফেল টাওয়ারটি কিনতে চাইছিলেন। কাজেই লাস্টিগকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতেও তাঁর দ্বিধা ছিল না। লাস্টিগ পুরো টাকা পাওয়ার পর পগারপার। প্রায় ৭০ হাজার ফ্র্যাঙ্ক হাতিয়ে নিয়ে স্বদেশে পাড়ি জমান তিনি।

default-image

লাস্টিগ ধরে নিয়েছিলেন, পয়সন লজ্জায় এবং পুলিশের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে কাউকে বিষয়টি জানাবেন না। কেননা ঘুষ দেওয়াও তো অপরাধ। এদিকে খবরের কাগজেও চোখ রাখছিলেন এ বিষয়ে কোনো খবর ছাপা হয় কি না, তা দেখার জন্য। একসময় নিশ্চিত হন, জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হয়নি। লাস্টিগ আবার প্যারিসে ফিরে আসেন এবং আরও একবার আইফেল টাওয়ার বিক্রির নাটক সাজান। আগের মতোই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেন। তবে এবার তাঁর জালিয়াতি ধরা পড়ে যায়। কিন্তু চতুর লাস্টিগ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগেই পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

লাস্টিগের ৪৭টি ছদ্মনাম এবং অসংখ্য পাসপোর্ট ছিল। পাঁচটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। ব্যক্তিত্ব ছিল দারুণ আকর্ষণীয়। তাই একটি গোয়েন্দা সংস্থা লাস্টিগকে ‘তরুণীদের স্বপ্নের পুরুষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। আর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাঁকে চিহ্নিত করেছিল ‘সম্মানিত অভিজাত ব্যক্তি’ হিসেবে! লাস্টিগের আরেকটি বিশ্বখ্যাত জালিয়াতির ঘটনা ‘রোমানিয়ান বক্স’ নামে পরিচিত। এই রোমানিয়ান বক্স দিয়ে নাকি দুনিয়ার যেকোনো টাকার নোট নকল করা যেত!

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ফ্রান্স টুডে ও মেন্টালফ্লস ডটকম

বিজ্ঞাপন
একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন